যুদ্ধ-রেশ আছড়ে পড়ল ব-দ্বীপ উপকূলেও! অবশ্য এখানে মারণাস্ত্রের ব্যবহার নেই। আছে কথাস্ত্র, প্রতিপক্ষ ঘায়েলের অশোভন অঙ্গভঙ্গি-অস্ত্র। জিনিসটা অনেকটাই বোমাসদৃশ-ফুটবল! রসগোল্লার বৃহদাকার সংস্করণ বোধকরি ফুটবল, যেটা পায়ে পায়ে চলে। এখানেও রসের কোনো ঘাটতি নেই। উত্তেজনাটুকু বাড়তি।

সব যুদ্ধেরই অন্তত দুইটা পক্ষ থাকে। মোরশেদ আলমের পরিবারেও তাই। তিনি ও তার স্ত্রী দুজনেই কঠিন ফুটবল বিশ্লেষক। বিশ্বকাপ ফুটবলে তিনি ব্রাজিল সমর্থক, তাহমিনা আর্জেন্টিনার। আর্জেন্টিনার ফুটবল দল তাহমিনার যতটা প্রিয়, এরচেয়ে বেশি পছন্দ খেলোয়াড়গুলো। তার ধারণা, পৃথিবীর আর কোনো দেশের পুরুষ এতটা রূপবান নয়। অবশ্য এটা গোপন হিসাব-নিকাশ, গুপ্ত প্রণয়।

অন্যদিকে প্রণয়ের ক্ষেত্রে মোরশেদের পছন্দ একেবারেই ‘দেশীয়’। কলেজজীবনে সহপাঠিনী রেশমাকে পছন্দ করতেন। বুক ফেটেছে মুখ ফোটেনি। যদি ফাউল, রং সাইড বা টাইব্রেকার হয়ে যায়! প্রণয়িনীর পছন্দের রং নিরেট হলুদ। প্রায়ই রেশমা হলুদরঙা থ্রিপিস পরে কলেজে আসত। সঙ্গে হলুদ টিপ গুঁজত কপালে, চুলে বাঁধত হলুদ ফিতা। সব মিলিয়ে হলুদ কাঁচাসোনায় মোড়ানো আস্ত রেশমা!

বর্তমানে তাহমিনা অকাতরে আর্জেন্টিনা, মোরশেদ অনবরত ব্রাজিলের বন্দনা-নামতা পড়তে থাকুন। আমরা বরং বেটাইম মেশিনে চড়ে অতীত প্রদক্ষিণ করে আসি।

কলেজ হোস্টেলে মহিলা দল ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। সিদ্ধান্ত হলো, ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টা হিসাবে ফুটবলের বদলে খেলা হবে জাম্বুরা দিয়ে। নির্দিষ্ট দিনে খেলা শুরু হলো। কোন তেজস্বী ছাত্রী এমন জোরে লাথি হাঁকাল, গোলপোস্ট পেরিয়ে জাম্বুরা ফেটে ‘চিত্তিছান’। মাঠের চারপাশে অন্যরা যখন গোওওওল বলে হর্ষধ্বনি দিচ্ছে তখন রেশমাসহ খেলোয়াড়দের কেউ কেউ রসিয়ে রসিয়ে জাম্বুরা খাচ্ছে। যেই উপস্থিত হলো সেখানে, সবার হাতেই ধরিয়ে দেওয়া হলো জাম্বুরার লালাভ কোয়া।

ফুটবলহীনতায় চটজলদি একজনকে গাছে তুলে দিয়ে দশাসই আরেকটা জাম্বুরা পাড়া হলো। এবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল। এ জাম্বুরাটায়ও ফাটল ধরল। গোলদাতা রেশমাই বণ্টন করল এবার। মনের আনন্দে সবাই খেলা শেষ করলেও পরদিন যে বাকি অংশটুকুও দেখতে হবে এমন প্রস্তুতি ছিল না কারোই।

পরদিন সকালে হারু পার্টির ফুটবল বিশ্লেষকরা স্মারকলিপি দিল অধ্যক্ষ বরাবর। ফলাফল বাতিল করতে হবে। খেলার মধ্যে ফুটবল কেউ খায় নাকি? তাও আবার বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের বঞ্চিত করে!

অধ্যক্ষ যুক্ত দেখালেন, ফুটবল কই, ওরা জাম্বুরা খেয়েছে। জাম্বুরা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

দলনেত্রী সাজেদা পালটা যুক্তি দেখাল, জাম্বুরা হলেও ওটাকে ফুটবল হিসাবেই খেলেছিলাম। বিশ্বকাপ বা দেশকাপের কোথাও কি এমন ঘটনা ঘটে-খেলার মাঝখানে খেলোয়াড়রা ফুটবলটাকেই ভাগ করে খেয়ে ফেলে!

সাজেদা বলল, খেলাটা বাতিল করুন। নইলে আমরা ফিফা চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগপত্র পাঠাব!

অনেক জল-কাদা ঘোলা করার পর অধ্যক্ষ সিদ্ধান্ত দিলেন এটাকে বাতিল করে আরেকটা ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। এটা হবে ছেলে বনাম মেয়ে। এদিকে ফাইনাল পরীক্ষাও এগিয়ে এসেছে। বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নারী-পুরুষ ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হলো এক মহৎলগ্নে। রেশমা পেল গোলকিপারের দায়িত্ব। অন্যদের সঙ্গে সাযুজ্য না রেখে যথারীতি রেশমার পরনে হলুদ জার্সি। মোরশেদ পুলকিত রেশমার কাছাকাছি আসার মওকা পেয়ে।

না চাইতেই বল গড়াগড়ি খেতে লাগল পায়ের কাছে। কী যে উত্তেজনা ভেতরে-বাইরে। লাথি দিলেই গোল হয়ে যাবে এমন একটা গোল মিস করে মোরশেদ দৌড়ে গেল গোলপোস্ট পেরিয়ে ভেতরে। স্ট্রাইকাররা বল ছুড়ে দিল বিপরীত দিকে। দিশাহীনের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইল মোরশেদ। আসার সময় একটু ছোঁয়া লেগেছিল রেশমার। দাঁড়িয়ে থেকেই অলৌকিকভাবে রবীন্দ্রসংগীত শুনছিল মোরশেদ-একটুকু ছোঁয়া লাগে...।

সেই খেলায় তিন গোলে জয়লাভ করেছে ছাত্রপক্ষ। আপত্তি জানিয়েছে ছাত্রীরা। তাদের যুক্তি- গোলপোস্টের পেছনে দাঁড়িয়ে মোরশেদ এমন কিছু পুঁতে দিয়েছে বা কালা-মন্ত্র পাঠ করেছে যাতে বলগুলো হুদাহুদিই গোলপোস্ট ভেদ করে ওখানটায় এসে আশ্রয় নেয়। যাকে বলে চুম্বকাকর্ষণ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ রেশমা। পারলে সে মোরশেদের থোতামোতা ছিঁড়ে দেয়!

অধ্যক্ষ এবারও ফলাফল চূড়ান্ত করতে পারলেন না। চারদিকে বিশ্লেষক ফুটবলারণ্য। নানা জ্ঞানীর নানা মত।

কলেজ থেকে বিদায়ের দিনে দুরুদুরু বক্ষে মোরশেদ রেশমাকে বলল, ‘তোমাকে আমার ভালো লাগে।’

ঝালমিশ্রিত জবাব এলো, ‘আমারও অনেককে ভালো লাগে। তাই বলে সেটা কাউকে বলতে গেছি!’

‘অনেককে!’

‘হ্যাঁ, কোনো সমস্যা?’

‘সমস্যা হবে কেন? বিরাট সম্ভাবনার ক্ষেত্র!’

এতই সম্ভাবনার ছিল সেটা, মোরশেদ রেশমার নামে লুডু টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছিল। তারপর সাপলুডুর সেই সাপের ছোবল খেয়ে মই হয়ে একেবারে প্রপাত ধরণীতল!

বর্তমানে ফিরে আসি। মোরশেদ-তাহমিনার সংসার সরগরম তর্কে-বিতর্কে।

ফুটবলে কে জিতবে?

ব্রাজিল নাকি আর্জেন্টিনা!

তাহমিনা যে পার্লারে সাজতে যায় সেখানকার বিউটিশিয়ান বলেছে আর্জেন্টিনার নাম।

মোরশেদ যেখান থেকে বাকিতে চাল-ডাল কেনেন দোকানদার বলেছে-ব্রাজিল।

অন্য দলগুলো?

এই দুই দলের বাইরে অন্য কোনো দল নেই, দেশ নেই, আর

কিছুই নেই...।