ঘরের এক কোণে ধুলো জমতে শুরু করেছে একটি সাইকেলে। প্রায় এক বছর ধরে সেটিতে আর কেউ চড়ে না। আলমারির ওপরে একটি প্যাকেটে ভাঁজ করে রাখা কয়েক সেট জামাকাপড়। সেগুলোও আর কোনোদিন পরা হবে না। টেবিলের পাশে পড়ে আছে একটি গিটার, দেওয়ালে সাজানো স্কুল থেকে পাওয়া পুরস্কারের স্মারক, পাশেই ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট। মোবাইল ফোনটির গ্যালারিতেও রয়ে গেছে পাহাড়, নদী আর পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া এক কিশোরের হাসিমাখা ছবি। এসবই এখন উক্যছাইং মারমা এরিকসনের স্মৃতি।

২০২৫ সালের ২১ জুলাই ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় প্রাণ হারায় ওই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র এরিকসন। ২১ জুলাই সেই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। কিন্তু বাবা উসাইমং মারমা ও তার পরিবারের কাছে সময় যেন সেদিনই থেমে গিয়েছিল। এরিকসনের স্মৃতি যেন এখনো তাদের চারপাশে ঘিরে আছে।

সোমবার (২০ জুলাই) জাগো নিউজের সঙ্গে সন্তান হারানোর সেই রাত, বিচার না পাওয়ার হতাশা, নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ, অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আর ছেলেকে ঘিরে প্রতিদিনের স্মৃতির কথা তুলে ধরেন উসাইমং মারমা। কথা বলতে বলতে কয়েকবার থেমে যান। কখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, কখনো নীরব হয়ে থাকেন।

আরও পড়ুন

কষ্টগুলো নীল জলে ভাসিয়ে দিলাম, বললো মাইলস্টোনের শিশুরা

‘আমি কোনোভাবে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু ওর মা পারে না। এখনো সপ্তাহে চার-পাঁচদিন শুধু কান্না করে। ছেলের কোনো জিনিস চোখে পড়লেই ভেঙে পড়ে’—একমাত্র সন্তানকে হারানোর দুঃসহ সময়গুলোর কথা এভাবেই বলছিলেন উসাইমং মারমা।

রাত দেড়টার সেই ফোনকল

দুর্ঘটনার সময় এরিকসন ঢাকায় একটি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করত। উসাইমং মারমা বলেন, ‘সেদিন গভীর রাত। আনুমানিক রাত দেড়টার দিকে প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষিকার ফোন পাই। ম্যাডাম ফোন করে জানালেন, আমার ছেলে দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। তখনো জানতাম না কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে।’

সেই রাতেই বুকভরা আতঙ্ক নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন তিনি। বলেন, ‘ছেলে ঘটনাস্থলে মারা যায়নি। তাকে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকরা চেষ্টা করেছিলেন তাকে বাঁচানোর। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সেদিন রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় এরিকসন।’

jagonews24ছবিতে উক্যছাইং মারমা এরিকসন

রাঙ্গামাটির পাহাড়ে ঘুমিয়ে আছে এরিকসন

উসাইমং মারমা জানান, তার ছেলেকে সমাহিত করা হয়েছে রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলার তিন নম্বর বাঙ্গাল হালিয়া ইউনিয়নের খ্যাংদং পাড়ার কেন্দ্রীয় শ্মশানে। দূর পাহাড়ের সেই কবরেই এখন ঘুমিয়ে আছে তাদের বুকের মানিক। কিন্তু বাবা-মায়ের কাছে সে এখনো যেন বেঁচে আছে ঘরে থাকা তার ব্যবহারের প্রতিটি জিনিসে।

ছেলের জিনিসগুলো যেমন ছিল, তেমনই আছে

এরিকসনের ব্যবহৃত কোনো জিনিসই সরিয়ে ফেলতে পারেননি তারা। ছেলের জামাকাপড়গুলো একটি প্যাকেটে ভাঁজ করে রেখে দিয়েছেন। ঘরের একপাশে এখনো রাখা আছে তার সাইকেল। গিটার, ব্যাডমিন্টন, স্কুল থেকে পাওয়া পুরস্কার—সবই ঠিকঠাক আগের জায়গায়। এরিকসনই শুধু নেই।

জাগো নিউজকে ছেলের বেশ কয়েকটি ছবিও পাঠিয়েছেন বাবা উসাইমং মারমা। সেখানে রয়েছে গিটার হাতে ছেলে এরিকসন, স্কুলে পাওয়া পুরস্কার, খেলাধুলার সরঞ্জাম এবং পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার নানান মুহূর্ত। ‘এগুলোই এখন আমাদের কাছে ছেলের স্মৃতি। এগুলো দেখেই দিন কাটে’—বলছিলেন পুত্রহারা এই শোকাতুর বাবা।

আরও পড়ুন

তদন্ত প্রতিবেদন / মাইলস্টোনে বিমান বিধ্বস্তের কারণ ‘পাইলটের উড্ডয়ন ত্রুটি’

মায়ের মন এখনো ডুকরে কাঁদে

এক বছর হতে চললেও একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি উক্যছাইং মারমা এরিকসনের মা। উসাইমং মারমার ভাষ্য, তিনি নিজে কোনোভাবে কষ্ট চেপে রাখতে পারলেও তার স্ত্রীর পক্ষে সেই বেদনা চেপে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

উসাইমং মারমা বলেন, ‘আমি পুরুষ মানুষ, কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিই। কিন্তু ওর মা পারে না। এখনো সপ্তাহে চার থেকে পাঁচদিন শুধু কান্নাকাটি করে। এক বছর হতে চলল, তবুও ও ছেলেকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলে থাকতে পারেনি।’

jagonews24এরিকসনের শখের গিটার ও ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট

তিনি জানান, ছেলেকে ঘিরে প্রতিটি স্মৃতিই আজ তার স্ত্রীর কাছে গভীর যন্ত্রণার। এরিকসন কী খেতে ভালোবাসতো, কোথায় যেতে পছন্দ করতো কিংবা কী কী করতো—এসব কথা মনে পড়লেই তার মা ভেঙে পড়ে। ডুকরে কাঁদে। ঘরের কোনো জিনিসে ছেলের স্মৃতি খুঁজে পেলেই তার চোখ ভিজে ওঠে।

একমাত্র সন্তানকে হারানোর পর ছেলের ব্যবহৃত জিনিসগুলোও আগের মতোই যত্ন করে রেখে দিয়েছেন তারা। এরিকসনের ব্যবহৃত সাইকেলটি এখনো ঘরের এক কোণে রাখা আছে। জামাকাপড় একটি প্যাকেটে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। এসব স্মৃতিচিহ্ন সরিয়ে ফেলার সাহস আজও পাননি তারা।

আরও পড়ুন

স্মৃতির শোক ভুলে সবুজের ছায়ায় নতুন জীবনের পথে মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীরা

‘ছেলের সাইকেল আর জামাকাপড়গুলো যেমন ছিল তেমনভাবেই রেখে দিয়েছি। এগুলোই এখন আমাদের কাছে ওর শেষ স্মৃতি। কিন্তু এগুলো দেখলেই ওর মা ভেঙে পড়ে। শুধু কান্না করে’—বলছিলেন উসাইমং মারমা।

এক বছর পেরিয়ে গেলেও এই পরিবারের কাছে সময় যেন থমকে আছে সেই ২১ জুলাইয়ের দুপুরেই। প্রতিটি স্মৃতি যেন প্রতিদিন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—যে ছেলেটি একদিন এই ঘর আলো করে রেখেছিল, সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

মেলেনি কোনো আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ

ছেলের মৃত্যুর পর কোনো আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ পাননি বলেও দাবি করেন উসাইমং মারমা।
কষ্টভরা কণ্ঠে বলেন, ছেলের শ্মশানে নেওয়ার সাদা কাপড়ের টাকাও দেয়নি কেউ। অথচ দুর্ঘটনার পর একটি বিশেষ বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং ছেলের কবর বাঁধাই করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেসবের কিছুই হয়নি আজও।

jagonews24এরিকসনের বাবা উসাইমং মারমা

মাইলস্টোল স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এরিকসনের বাবা। আক্ষেপ করে বলেন, স্কুল যদি আমাদের পাশে দাঁড়াতো, তাহলে হয়তো বিচার পাওয়া বা অন্তত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার একটা সুযোগ হতো। কিন্তু সেখান থেকেও কোনো সহযোগিতা পাইনি।

এক বছর পরও শেষ হয়নি অপেক্ষা

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পেরিয়ে গেছে। দেশের মানুষের কাছে এটি হয়তো একটি বড় দুর্ঘটনা। কিন্তু উসাইমং মারমার পরিবারের কাছে এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা।

এরিকসন যে ঘরটিতে থাকতো সেখানে এখনো নতুন কিছু রাখা হয়নি। তার ব্যবহার করা প্রতিটি জিনিস যেন প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—এই ঘরে একসময় একজন ছিল, যে স্কুলে যেতো, খেলাধুলা করতো, গিটার বাজাতো, স্বপ্ন দেখতো। আজ সে নেই। কিন্তু তার স্মৃতিগুলো এখনো নিঃশব্দে নিশ্বাস ফেলে ঘরের প্রতিটি কোণে।

আরও পড়ুন

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

উচ্চ আদালতে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই

মাইলস্টোনে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিক্ষার্থীসহ বহু হতাহতের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে গত ৭ মে আদালতে মামলার আবেদন করেছিলেন এরিকসনের বাবা উসাইমং মারমা। পরে আবেদনটি খারিজ করে দেন আদালত।

যদিও ভুক্তভোগী পরিবারের আইনজীবী উচ্চ আদালতে আবেদনের কথা জানিয়েছিলেন, তবে মামলার বাদী উসাইমং মারমা বলেন, এখনই উচ্চ আদালতে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, মামলা করার পর থেকেই আমি এলাকায় থাকতে পারছি না। বিভিন্ন ধরনের নজরদারির মধ্যে আছি। আইনি প্রক্রিয়া আরও এগোলে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। আগামীতে পরিস্থিতি দেখে আমরা এগোতে পারি। তবে এখনই উচ্চ আদালতে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

‘বিচার চাওয়ার আগে এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া—পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হওয়া’—যোগ করেন সন্তানহারা এই বাবা।

সেদিন যা ঘটেছিল

২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুর ১টা ১৮ মিনিট। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে চলছিল নিয়মিত ক্লাস। ঠিক সেই সময় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্কুল ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিকট বিস্ফোরণ, আগুন, ধোঁয়া আর আর্তচিৎকারে পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়। মুহূর্তেই যা পরিণত হয় এক বিভীষিকায়।

ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৬ জনের প্রাণহানি হয়। আহত হন ১৭২ জনেরও বেশি। হতাহতদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবক। দগ্ধ ও আহত অনেকেই এখনো শারীরিক যন্ত্রণা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও মানসিক ট্রমা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।

একসঙ্গে নিভে যায় বহু পরিবারের আলো

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো ৩৬ জনের অধিকাংশই ছিল কোমলমতি শিক্ষার্থী। কেউ ঘটনাস্থলে, কেউবা হাসপাতালে নিভে যায় জীবনের দীপ। উক্যছাইং মারমা এরিকসনও তাদেরই একজন।
তার মতো আরও অনেক শিশুর অসমাপ্ত স্বপ্ন থেমে যায় সেদিনের দুর্ঘটনায়।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে যারা সন্তান হারিয়েছেন সেইসব বাবা-মা এখনো অপেক্ষা করছেন—কেউ বিচারের, কেউ প্রতিশ্রুত সহায়তার, কেউবা শুধু এমন একটি উত্তর পাওয়ার, যা হয়তো তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জবাব দিতে পারে—‘আমার সন্তান কেন আর ফিরে এলো না?’

এমডিএএ/এমকেআর/ এমএফএ