সকালে ঘুম থেকে উঠেই অনেকের মন খারাপ হয়। শুরুতেই অকারণে উদ্বেগ, অস্থিরতা কিংবা নানা দুশ্চিন্তা মাথায় ভিড় করে। অথচ রাতের ঘুমও হয়তো মোটামুটি ভালোই হয়েছে। এমন পরিস্থিতিকে অনেকেই সাধারণ ঘটনা বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোনও দায়ী থাকতে পারে। সেটি হলো কর্টিসল, যা ‘স্ট্রেস হরমোন’ নামেও পরিচিত।

কর্টিসল অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত একটি হরমোন। এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, বিপাকক্রিয়া সচল রাখা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখা এবং শরীরকে দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে কর্টিসলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে এই হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে উদ্বেগ, অস্থিরতা, মন খারাপ, ক্লান্তি এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার দেখা দিতে পারে।

সকালে কেন কর্টিসল সবচেয়ে বেশি থাকে?

চিকিৎসকদের মতে, কর্টিসলের মাত্রা সারাদিন এক রকম থাকে না। সাধারণত ভোর থেকে সকাল ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। এটি শরীরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে এবং নতুন দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত করে। অন্যদিকে মধ্যরাতের দিকে কর্টিসলের মাত্রা সবচেয়ে কম থাকে, যাতে শরীর বিশ্রাম নিতে পারে।

সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন জীবনযাপনের কিছু ভুল অভ্যাসের কারণে এই স্বাভাবিক মাত্রা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে যায়।

jagoসকালের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে কর্টিসল

সকালের কিছু অভ্যাসই বাড়িয়ে দিচ্ছে কর্টিসল

বর্তমানে অনেকেই ওজন কমানোর জন্য কার্বোহাইড্রেট খাওয়া কমিয়ে দেন। কেউ আবার সকালের নাস্তা বাদ দিয়ে শুধু এক কাপ কফি খেয়েই দিন শুরু করেন। আবার অনেকে ফলেও প্রাকৃতিক চিনি রয়েছে ভেবে তা খাওয়া কমিয়ে দেন।

পুষ্টিবিদদের মতে, এসব অভ্যাস শরীরের জন্য ভালো নয়। দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকলে শরীরে গ্লুকোজের ঘাটতি তৈরি হয়। তখন মস্তিষ্ক শরীরকে সতর্ক সংকেত পাঠায় এবং কর্টিসলের নিঃসরণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরির ঝুঁকি বাড়ে। এর ফলে শরীরে অতিরিক্ত চর্বিও জমতে শুরু করতে পারে।

কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মানেই কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়। বরং রাতের খাবারে পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট রাখা প্রয়োজন। এতে শরীরে সেরোটোনিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে, যা ভালো ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া মৌসুমি ফলে থাকা ফ্রুক্টোজ শরীরে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়ে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়। তাই অতিরিক্ত স্বাস্থ্যসচেতন হতে গিয়ে ফল বা শর্করা পুরোপুরি বাদ দেওয়া ঠিক নয়।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সকালের নাস্তা বাদ দিলে শরীর দীর্ঘ সময় শক্তির অভাবে থাকে। এতে কর্টিসলের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। তাই সকালে পুষ্টিকর নাস্তা করা জরুরি। ওটস, ডিম, ফল, দই, বাদাম কিংবা সম্পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার দিন শুরু করার জন্য ভালো বিকল্প হতে পারে।

কর্টিসল নিয়ন্ত্রণে রাখবেন যেভাবে-

পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন

প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা বা ঘুমানোর আগে দীর্ঘক্ষণ মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখলে কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

নিয়মিত শরীরচর্চা করুন

ভোরে হাঁটা, হালকা ব্যায়াম কিংবা খোলা বাতাসে কিছু সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত শরীরচর্চা হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ও ধ্যান করুন

ইয়োগা, মেডিটেশন কিংবা গভীর শ্বাস নেওয়ার ব্যায়াম স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ধ্যান করলে কর্টিসলের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

আরও পড়ুন

লাল নাকি সাদা ভাত, কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর

পুষ্টিকর নাস্তা করুন

সকালে শুধু কফি নয়, বরং ডিম, ওটস, দই, বাদাম, ফল কিংবা সম্পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার দিয়ে দিন শুরু করুন। এতে রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় কর্টিসল নিঃসরণ কমবে।

আরও পড়ুন

প্রতিদিন সকালে ওটস খাওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো

হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন

দিনের শুরুতেই নেতিবাচক খবর বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে না গিয়ে এমন কিছু করুন যা আপনার মন ভালো রাখে। প্রিয় গান শোনা, বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা কিংবা প্রকৃতির মাঝে কিছু সময় কাটানোও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

সূত্র: মায়ো ক্লিনিক, ওয়েবএমডি

এসএকেওয়াই