- ১০ বছরেও শেষ হয়নি ফ্লাইওভার
- জ্যাম লাগলে ৫ ঘণ্টার পথ গড়ায় ১০ ঘণ্টায়
- এক ফ্লাইওভারে ভুগছে ১০ জেলার মানুষ
ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলের পথে যাত্রা এখন অনেকটাই স্বস্তির। ছয় লেনের মহাসড়ক ধরে দ্রুতগতিতে ছুটে চলে যানবাহন। কিন্তু সেই গতি থমকে যায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ চার রাস্তার মোড়ে। নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার, সংকুচিত সড়ক, ডাইভারশন, ধুলাবালি আর দীর্ঘ যানজট—সব মিলিয়ে উত্তরাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের সবচেয়ে বড় ‘বটলনেক’ এখন গোবিন্দগঞ্জ। ঈদ, দীর্ঘ ছুটি কিংবা উৎসবের সময়ে এখানে ৫-৬ ঘণ্টার যাত্রা গড়ায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের এ অংশ দিয়ে প্রতিদিন উত্তরাঞ্চলের ১০ জেলার হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। গোবিন্দগঞ্জ চাররাস্তার মোড়ে ঢাকা, রংপুর, দিনাজপুর ও মহিমাগঞ্জমুখী সড়ক মিলিত হওয়ায় এখানে যানবাহনের চাপ অন্য যেকোনো অংশের তুলনায় বেশি। সেই চাপ কমাতে প্রায় এক দশক আগে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কিন্তু কাজ এখনও শেষ হয়নি।

এক দশকেও শেষ হয়নি ফ্লাইওভার
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ যানজট নিরসনে ২০১৬ সালে দক্ষিণ এশীয় উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাসেক-২) প্রকল্পের আওতায় গোবিন্দগঞ্জে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। পরে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ১৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গোবিন্দগঞ্জ ফ্লাইওভারের কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং একাধিক জটিলতা একসঙ্গে কাজ করেছে। শুরুতেই অ্যাপ্রোচ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণে বাধার মুখে পড়ে প্রকল্পটি। ফ্লাইওভারের দুই পাশে ছিল শতাধিক দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, মালিকানা যাচাই, মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পন্ন করতেই কয়েক বছর লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে জমি বুঝে না পাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করতে পারেনি। এরপর প্রকল্পের নকশায় একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়।
আরও পড়ুন
যে কারণে পদ্মা সেতুর পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছে না ২১ জেলার মানুষ
সংশ্লিষ্টরা জানান, শুরুতে প্রস্তাবিত নকশা পরবর্তীতে যানবাহনের চাপ, ভবিষ্যৎ ট্রাফিক প্রবাহ, নিরাপত্তা এবং চারমুখী সংযোগ সড়কের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধন করা হয়। ফলে নতুন করে কিছু কারিগরি অনুমোদন এবং নির্মাণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়।

চলমান মহাসড়কে কাজ, বাড়ছে সময়
বর্তমানে ফ্লাইওভারের মূল কাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। পিলার, গার্ডার ও ডেক স্ল্যাব নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে সওজ। এখন চলছে অ্যাপ্রোচ রোডের মাটি ভরাট, সাব-বেজ ও বেজ কোর্স নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, গার্ডরেল, মিডিয়ান, সড়কবাতি স্থাপন এবং চূড়ান্ত কার্পেটিংয়ের কাজ।
তবে প্রকৌশলীদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ হলো বিদ্যমান মহাসড়কের সঙ্গে ফ্লাইওভারের সংযোগ স্থাপন। কারণ এ কাজের সময় ট্রাফিক ডাইভারশন, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হয়।
(সাসেক)-২ প্রকল্পের কর্মকর্তা আব্দুল কাদের বলেন, গোবিন্দগঞ্জের চার রাস্তার মোড় দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক সংযোগস্থল। ঢাকা, রংপুর, দিনাজপুর ও মহিমাগঞ্জমুখী সড়কের যানবাহন একই পয়েন্ট ব্যবহার করায় নির্মাণকাজের সময় পুরো এলাকা কার্যত একটি চলমান ট্রাফিক জোনে পরিণত হয়। অন্য অনেক প্রকল্পের মতো এখানে সড়ক বন্ধ করে কাজ করার সুযোগ ছিল না। প্রতিদিন হাজার হাজার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পণ্যবাহী যান চলাচল অব্যাহত রেখেই পিলার নির্মাণ, গার্ডার স্থাপন এবং ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনা করতে হয়েছে।
আরও পড়ুন
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক / ঈদযাত্রায় ‘যন্ত্রণার’ কারণ হতে পারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অংশ
গাইবান্ধা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়াস কুমার সেন বলেন, গোবিন্দগঞ্জ অংশে মহাসড়ক পুরোপুরি বন্ধ করার সুযোগ নেই। উত্তরাঞ্চলের প্রধান করিডোর হওয়ায় যানচলাচল সচল রেখেই কাজ করতে হচ্ছে। ফলে সময় বেশি লাগলেও কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণ ও নকশাগত জটিলতা অনেক আগেই কেটে গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাজের গতি প্রত্যাশিত ছিল না। আর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের একটি ফ্লাইওভার শেষ করতে যদি প্রায় এক দশক সময় লাগে, তাহলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

বাড়ছে দুর্ভোগ
স্থানীয় পরিবহন মালিক ও চালকদের মতে, যানজটের কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, সময় নষ্ট এবং ট্রিপ সংখ্যা কমে যাওয়ার আর্থিক প্রভাবও পড়ছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাক ও দূরপাল্লার বাসগুলোকে প্রায়ই নির্ধারিত সময়সূচির বাইরে চলাচল করতে হচ্ছে।
ঢাকাগামী বাসচালক আবদুস সাত্তার বলেন, মহাসড়কের বেশিরভাগ অংশ এখন অনেক উন্নত। কিন্তু গোবিন্দগঞ্জে এলেই গাড়ির গতি কমিয়ে আনতে হয়। কোনো কোনো সময় কয়েকশ মিটার পথ পার হতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত লেগে যায়। ঈদ বা বড় ছুটির সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
আরও পড়ুন
উত্তরের মহাসড়ক / উন্নত যোগাযোগে বিপন্ন পরিবেশ
এ রুটে চলাচলকারী যাত্রী ব্যাংক কর্মকর্তা নিলয় আহম্মেদ বলেন, নির্মাণাধীন অংশে মহাসড়কের প্রস্থ কমে যাওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও ডাইভারশন দিয়ে যানবাহন চলাচল করায় ভারী যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অতিরিক্ত ধুলাবালির কারণে দিনের বেলাতেও দৃশ্যমানতা কমে যায়। বর্ষাকালে আবার কাদামাটি ও খানাখন্দের কারণে চলাচল দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
শুধু পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই নন, একইভাবে দুর্ভোগের শিকার ব্যবসায়ীরাও। গোবিন্দগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক বলেন, ফ্লাইওভারের কাজ শুরুর পর থেকে বাজার এলাকার ব্যবসা আগের মতো নেই। ধুলাবালি, যানজট আর খোঁড়াখুঁড়ির কারণে অনেক ক্রেতাই বাজারে ঢুকতে চান না। আগে দূরপাল্লার যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা বাজারে থামতেন, কেনাকাটা করতেন। এখন অধিকাংশ মানুষ যত দ্রুত সম্ভব এলাকা পার হওয়ার চেষ্টা করেন।
আরও পড়ুন
শেরপুরে সড়ক-সেতুর অভাবে দুর্ভোগে ৫০ হাজার মানুষ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক বছরে নির্মাণাধীন অংশে ছোট-বড় অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে রাতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা না থাকলে এবং বিপরীতমুখী যানবাহন একসঙ্গে ডাইভারশনে উঠলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক সময় বিকল যানবাহন বা সড়কের ওপর নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকলেও দ্রুত অপসারণ করা সম্ভব হয় না, ফলে যানজট কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

অসমাপ্ত অবকাঠামোই পুরো করিডোরের বাধা
সাসেক-২ প্রকল্পের অতিরিক্ত পরিচালক অলিউর রহমান বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ ও জমি বুঝে পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এ কারণেই কাজ পিছিয়েছে। তবে বর্তমানে মূল কাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে। বাকি সংযোগ ও সমাপ্তির কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ডিসেম্বরের মধ্যে ফ্লাইওভার চালুর লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি।
তিনি বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত প্রায় ১৯০ কিলোমিটার মহাসড়ককে চার লেন থেকে উভয় পাশে সার্ভিস লেনসহ ছয় লেনে উন্নীত করা হয়েছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়িত এই প্রকল্প উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোর যোগাযোগ আরও দ্রুত ও নিরাপদ করার লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
উন্নয়নে ‘সমন্বয়হীনতার’ মাশুল গুনছে বান্দরবান পৌরবাসী
এ কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের আওতায় সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা ফ্লাইওভার, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী ফ্লাইওভার, একাধিক সেতু, আন্ডারপাস, ওভারপাস এবং সড়ক নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জকে দেশের অন্যতম বড় সড়ক সংযোগ কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে উত্তরবঙ্গ, রাজশাহী ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী যানবাহনের জন্য পৃথক চলাচল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল পুরোপুরি পেতে হলে গোবিন্দগঞ্জ ফ্লাইওভার চালু হওয়া জরুরি। কারণ একটি মাত্র অসমাপ্ত অবকাঠামো পুরো করিডোরের গতি ও সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই মহাসড়কের বাকি অংশ যখন চালু হয়েছে, তখন প্রায় এক দশক ধরে নির্মাণাধীন গোবিন্দগঞ্জ ফ্লাইওভারের দুর্ভোগের শেষ কবে হবে? তিনি বলেন বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সময় বারবার বাড়ানো উচিত নয়।
এল.বি/কেএইচকে/জেআইএম








