নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। তবে রজতজয়ন্তীর আয়োজন শিক্ষার্থীশূন্য ও অনাড়ম্বর হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, বাজেট ও বিভিন্ন বাস্তব সীমাবদ্ধতার কারণে বড় পরিসরে আয়োজন সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বুধবার (৮ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হোসেন উদ্দিন শেখর ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. সোহেল হাসান জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন, বেলুন উড্ডয়ন এবং শান্তির প্রতীক পায়রা অবমুক্ত করে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবস-২০২৬ উপলক্ষে প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে একটি আনন্দ র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে প্রশাসনিক ভবন চত্বরে কেক কাটা ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়। র্যালিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশ নিলেও শিক্ষার্থীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল না।
বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের টেনিস কোর্ট প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপ-উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. সোহেল হাসানের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক হোসেন উদ্দিন শেখর।
সভায় উপাচার্য বলেন, “নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকার পরও আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম গতিশীল করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও অ্যাওয়ার্ড প্রদানের ব্যবস্থা করেছি। প্রথমবারের মতো ডিনস কমপ্লেক্স চালু করেছি। সেই সঙ্গে গবেষণাগার সমৃদ্ধিকরণ ও মেডিকেল সেন্টার সংস্কার করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে ২০ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছি। আরো ৪৭ জন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আপগ্রেডেশন সম্পন্ন করা হয়েছে। সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।” তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সবার সহযোগিতাও কামনা করেন।
সভাপতির বক্তব্যে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. সোহেল হাসান বলেন, “যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অপরিসীম চেষ্টায় এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের অবদানকে আমি গভীরভাবে স্মরণ করছি। আমি প্রত্যাশা করছি, একদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে তৈরি হবে। সেজন্য আমাদের সবাইকে বিভেদ ভুলে একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন মানবিকী অনুষদের ডিন সুকান্ত বিশ্বাস, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শাহজাহান, কৃষি অনুষদের ডিন ড. জিলহাস আহমেদ জুয়েল এবং রেজিস্ট্রার মো. এনামউজ্জামান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রশাসনিক ভবন ও প্রধান ফটকে আলোকসজ্জা করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে বিশেষ কোনো খাবারের আয়োজন ছিল না।
এদিকে আয়োজনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ না থাকা এবং সীমিত পরিসরের অনুষ্ঠান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরাফাত আলম। তিনি বলেন, “অনেক অনেক অপ্রাপ্তি আছে, অনেক অনেক অভিযোগে পূর্ণ আমার নিজের ক্যাম্পাসের প্রতি। কখনো কখনো অভিমান করে বসি। দিনশেষে আমাদের ঠিকানা এই চারণভূমিটাই। একেই আমি পরিচয় করিয়ে দেব আপন ঠিকানা হিসেবে। শত অভিমান, অপ্রাপ্তি, ভালো লাগা, অর্জন—সব মিলিয়ে দিনশেষে আমার ক্যাম্পাসই আমার পরিচয়। ক্যাম্পাসের ২৫ বছর পূর্তি রজতজয়ন্তীতে ব্যাপক সাড়া জাগানো আয়োজন থাকবে, সবাই অংশীদার হবে—এটা স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কতটা ধারণ করেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে যখন এমন একটি দিনের আয়োজনগুলোর দিকে লক্ষ করি। বিশেষ দিনগুলোতে বিশেষ আয়োজন না থাকলে এই রজতজয়ন্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান হতাশাজনক।”
শিক্ষার্থীদের সমালোচনার বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক হোসেন উদ্দিন শেখর বলেন, “আরো বড় পরিসরে অনুষ্ঠান করার ইচ্ছা ছিল। আমাদের পরিকল্পনা ছিল এই এলাকার এমপি এবং শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করার। তবে সংসদীয় অধিবেশন শুরু হওয়া, বাজেটের সীমাবদ্ধতা, প্রতিকূল আবহাওয়া, রাস্তার নির্মাণকাজ চলমান থাকা এবং ভর্তি কার্যক্রমের ব্যস্ততার কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে আমরা আশা করছি, নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি বড় কেন্দ্রীয় নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারব এবং সেখানে মাননীয় এমপি ও শিক্ষামন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন।”
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালের ৮ জুলাই বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাস হয়। নানা জটিলতায় কার্যক্রম শুরু হতে সময় লাগলেও ২০১১–১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) রাখে।








