স্কোরশিটে তার নাম নেই। গোলও করেননি। তবু ম্যাচের গল্প শুরু হয়েছে তাকে দিয়েই, শেষও হয়েছে তাকে ঘিরে।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলটি এসেছে লিওনেল মেসির কর্নার থেকে। নিখুঁত ডেলিভারিতে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড। পরিসংখ্যান বলবে এটি একটি অ্যাসিস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু মাঠে যারা ম্যাচটি দেখেছেন, তারা জানেন, এটি ছিল আরও বড় কিছু। এটি ছিল একজন ফুটবল শিল্পীর ছোঁয়া, যিনি এখনও ম্যাচের গতি, ছন্দ আর ফলাফল বদলে দিতে পারেন।

ম্যাচের আগের দিন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছিলেন, ‘মেসিকে যারা এই বয়সেও নিয়ে সন্দেহ করে, তারা তাকে চেনে না। সে যতদিন খেলবে, ততদিন বিশ্বের সেরাদের একজনই থাকবে। সে একটা মেশিন।’ স্কালোনির এই বক্তব্য শুধু আবেগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণের ফল।

একদিন পর মাঠে সেই কথারই প্রমাণ দিলেন মেসি। এখন আর তাকে প্রতি ম্যাচে হ্যাটট্রিক করতে হয় না। প্রতি আক্রমণে পাঁচজনকে কাটিয়ে গোল করতে হয় না। তার ফুটবল বদলেছে। কিন্তু প্রভাব কমেনি। বরং বেড়েছে। কখন গতি কমাতে হবে, কখন খেলা ঘুরিয়ে দিতে হবে, কখন একটি পাস বা একটি সেট পিস পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

স্কালোনি পুরো দলটাকেই এমনভাবে গড়ে তুলেছেন, যাতে মেসি নিজের সেরাটা দিতে পারেন। তবে মেসি শুধু স্বাধীনতাই নেন না, প্রয়োজনে দলের জন্য রক্ষণেও পরিশ্রম করেন। স্কালোনির ভাষায়, ‘দল যখন বল ছাড়া লড়ছিল, তখনও মেসির প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট ছিল।’

বিশ্বের সেরা হওয়ার সংজ্ঞা এখন শুধু গোল বা অ্যাসিস্টে আটকে নেই। বিশ্বের সেরা সেই, যার উপস্থিতি প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা বদলে দেয়। যার দিকে দুই কিংবা তিনজন ডিফেন্ডারকে নজর রাখতে হয়। যার একটি স্পর্শ ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। আজকের মেসি ঠিক সেই ফুটবলার।

একসময় তিনি ছিলেন বিস্ফোরক ড্রিবলারের প্রতীক। এখন তিনি ফুটবল বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ প্রতীক। বয়স তার গতি কিছুটা কমিয়েছে, কিন্তু খেলার পাঠ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মুহূর্ত তৈরি করার দক্ষতা এবং নেতৃত্বকে আরও পরিণত করেছে।

আর্জেন্টিনার এই দলটিও যেন সেই দর্শনের প্রতিচ্ছবি। সবাই দৌড়ায়, সবাই লড়ে, আর ঠিক সময়ে মেসি সেই একটি স্পর্শ দেন, যেটি ইতিহাসের দিকে আরেকটি পদক্ষেপ হয়ে থাকে।

তাই হয়তো স্কোরশিটে গোলদাতাদের নাম বদলায়, ম্যাচসেরার পুরস্কারও অন্য কারও হাতে যায়। কিন্তু ম্যাচের আসল গল্প লিখে যান একজনই। লিওনেল মেসি। গোল না করেও, আলোটা এখনও তারই।