সংকট চরমে
এমনিতেই দেশে গ্যাসের ঘাটতি দিনে মোটামুটি এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নতুন করে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে বাসাবাড়িতে রান্নার চুলা যেমন অচল হয়েছে, তেমনি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও চলছে যানবাহনের দীর্ঘ অপেক্ষা। প্রভাব পড়েছে অনেক শিল্পকারখানায়ও।
পরিস্থিতির উন্নতি কখন হবে, তা গতকাল বৃহস্পতিবারও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা। এলএনজি সরবরাহে নিয়োজিত ভাসমান টার্মিনালটি মেরামতে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
গত মঙ্গলবার এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে আগুন ধরে যাওয়ার কারণে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন হচ্ছে বলে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে উল্লেখ করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির একজন কর্মকর্তা গতকাল বিকেলে আজকের পত্রিকাকে জানান, সন্ধ্যা পর্যন্ত মেরামতের অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আনার চেষ্টা করছে। তাঁরা আসার পর মেরামতের অগ্রগতি বলা যাবে।
গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলোর তিতাস গ্যাস অধিভুক্ত এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস-সংকট। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মধুবাজার, আদাবর, বনশ্রীসহ বেশ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা গ্যাসের অভাবে রান্না করতে না পারার কথা জানিয়েছেন।
দেশে দৈনিক ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও এত দিন সব উৎস মিলিয়ে ২৭০০ থেকে ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা চলছিল। কিন্তু উপকূলের ভাসমান টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর সরবরাহ ২২৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে সব শ্রেণির গ্রাহকের মধ্যে।
বেশ কয়েক দিন ধরে বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা সহনশীল পর্যায়ে রয়েছে। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন তথা লোডশেডিং নিয়ে তেমন সংকট দেখা যায়নি। কিন্তু ঢাকার অধিকাংশ আবাসিক এলাকার গ্রাহকেরা গ্যাসের অভাবে দিনের বেলায় রান্না করতে না পারার কথা জানিয়েছেন। অনেক জায়গায় গভীর রাতেও চুলায় গ্যাস মেলেনি। একইভাবে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস না থাকায় দিনের বেলায় স্টেশনের সামনে অটোরিকশাসহ শত শত সিএনজিচালিত গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর বেশ কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, অনেক পাম্পেই ‘গ্যাস নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। কোথাও কোথাও গ্যাসের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের চালকেরা। আবার দু-একটি পাম্পে গ্যাস থাকলেও চাপ কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণমতো ভরতে সময় লাগছে। ফলে সেখানে তৈরি হয়েছে গাড়ির দীর্ঘ সারি।
হাজিপাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক সিরাজুল ইসলাম মৃধা জানান, রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত গ্যাসের কম হলেও চাপ থাকে। কিন্তু দিনের বেলায় একেবারেই
এরপর পৃষ্ঠা ৭ কলাম ৬
চাপ থাকে না। ফলে কমপ্রেসর মেশিনগুলো অলস পড়ে থাকে। গ্যাসের চাপ ৫ পিএসআইয়ের নিচে নামলে আর সিএনজি পাওয়া যায় না। কিন্তু এখন চাপ শূন্যের কোটায় নেমে গেছে। সূচি অনুযায়ী সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে। এখন দিনে-রাতে অধিকাংশ সময়জুড়েই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ।
ঢাকা জেলা সিএনজি অটোরিকশাচালক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি একেবারেই ভালো না। সিএনজির অভাবে গাড়িগুলো ফিলিং স্টেশনে দিনে রাতে লাইন ধরে পড়ে থাকে। এতে দিনের জমা খরচও তোলা যাচ্ছে না।
চালকদের অভিযোগ, গ্যাসের অভাবে তাঁরা গাড়ি চালাতে ও যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করেও গ্যাস মিলছে না। দৈনিক জমা পরিশোধ ও সংসারের খরচ চালানো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তাঁরা।
গ্যাস-সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘১০-১২ দিন আগেও গ্যাসের অবস্থা মোটামুটি ভালো ছিল। কিন্তু এখন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, ময়মনসিংহসহ সর্বত্র খুব খারাপ অবস্থা। গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। মনে হয়, গ্যাস অন্য কোনো দিকে ডাইভার্ট (সরানো) হচ্ছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এলএনজি টার্মিনাল নষ্ট হওয়ার কথা বলছে।’
পেট্রোবাংলার দৈনিক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বুধবার তিতাসের বিতরণ এলাকায় ১২৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। সেখানে এক দিন আগেও ১৪২২ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হয়েছিল। একই হারে বাখরাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল, সুন্দরবন ও কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ এলাকায়ও সরবরাহ কমেছে।








