ইসরায়েলি গণহত্যা, ধর্ষণ, নৃশংসতা আর চরম ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে গাজা উপত্যকা এখন এক 'উন্মুক্ত কারাগার'। ২ লাখ ২৩ হাজার টনেরও বেশি বিস্ফোরকের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত গাজায় যুদ্ধ শুরুর হাজারতম দিন পূর্ণ হলো গতকাল। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) গাজা সরকারের মিডিয়া অফিস থেকে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে যুদ্ধের এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপত্যকার ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সেই বিবৃতিতে গাজা সরকার জানিয়েছে, দীর্ঘ এই হামলায় এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২১ হাজার ৫০০ জনের বেশি শিশু এবং ১২ হাজার ৫০০ জনের বেশি নারী রয়েছেন। হামলার জেরে ৫৮ হাজার ৮০০-এর বেশি শিশু এতিম হয়েছে এবং আরও ৯ হাজার ৫০০ জন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জনে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে ৪৩৩ জন সাংবাদিক রয়েছেন। শারীরিক অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন ৫ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ, যার ১৮ শতাংশই শিশু। যুদ্ধের ভয়াবহতায় ১ হাজার ৫০০ জন পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১ হাজার ২০০ জন মানুষ তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। সেই সাথে সংক্রামক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২১ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ৭১ হাজার ৩৩৮ জন ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। ধ্বংসযজ্ঞের এই বিবরণীর পাশাপাশি ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো যৌন হেনস্থা ও ধর্ষণের এক লোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এ। পুলিৎজার বিজয়ী কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ এক দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষের সরাসরি সাক্ষ্য তুলে ধরেছেন। তারা প্রত্যেকেই ইসরায়েলি সেনা, কারারক্ষী ও জিজ্ঞাসাবাদকারীদের দ্বারা ব্যাপক যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। এই নির্মমতা নিয়ে কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ লিখেছেন, "মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আমাদের ভিন্নমত থাকলেও ধর্ষণের নিন্দায় আমাদের এক হওয়া উচিত। ইসরায়েলি নেতারা ধর্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন বলে কোনো প্রমাণ না থাকলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এমন একটি ‘নিরাপত্তা কাঠামো’ তৈরি করেছে যার মাধ্যমে যৌন সহিংসতা ইসরায়েলের ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’-এর অংশে পরিণত হয়েছে।" গাজা সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে উপত্যকার ১ হাজার ৪৭টি মসজিদ সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে এবং ২১০টি মসজিদ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় ৩টি গির্জাও রেহাই পায়নি এবং ৩১২ জন ইমাম, খতিব ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নিহত হয়েছেন। স্বাস্থ্য খাতেও চালানো হয়েছে ব্যাপক তাণ্ডব; ৩৮টি হাসপাতাল, ৯৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১৯৭টি অ্যাম্বুলেন্স, ৮৪টি জরুরি সেবা যান এবং ১৬টি সিভিল ডিফেন্স কেন্দ্র ধ্বংস বা অচল হয়ে পড়েছে। আর্থিক ক্ষতির প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, গাজায় প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে শুধু আবাসন খাতেই ক্ষতি ৩৪ বিলিয়ন ডলার। ইসরায়েলি বাহিনী ৩ লাখ ৩৫ হাজার ভবন ও আবাসিক ইউনিট সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং আরও ৭ লাখ ৩৭ হাজার ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযান ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গাজা সরকারের অভিযোগ, এরপরেও ইসরায়েল ৩৫০০ বারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও প্রতিদিন বোমাবর্ষণ, কঠোর অবরোধ এবং খাদ্য ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে ইসরায়েল ক্রমাগত আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে চলেছে।
রাজনীতি
হাজারতম দিন: এক ধ্বংসস্তূপ ও ‘উন্মুক্ত কারাগার’ গাজা

শেয়ার করুন







