বর্তমানে বাংলাদেশের হালাল পণ্য রপ্তানি আয় বছরে মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সম্ভবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। কারণ ২০২৫ সালে এমন পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা ছিল ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।

শনিবার (১৮ জুলাই) বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) উদ্যোগে সংগঠনের বোর্ড রুমে আয়োজিত ‘হালাল ফর এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন’ শীর্ষক কর্মশালায় এ তথ্য জানানো হয়।

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস-চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ হাসান আরিফ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইইউবিএটি বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মোমিনুল ইসলাম। নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) প্রাক্তন সভাপতি শাব্বির এ. খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম।

বিসিআই সভাপতি অনুষ্ঠানের শুরুতে বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবসা ক্ষেত্রে নানা সমস্যা বিদ্যমান থাকলেও আমাদের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ এবং বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমি ও ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। তার জন্য স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও রপ্তানি বৃদ্ধিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে ৪৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে বিশ্বের ৫৫তম বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ এবং তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। এককভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকনির্ভর এবং মোট রপ্তানির প্রায় ৮২ শতাংশ এ-সংক্রান্ত পণ্য। সরকার রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য এ বছরের বাজেটে কতিপয় খাতকে চিহ্নিত করে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, এটা প্রশংসার যোগ্য। রপ্তানি বাজারকে সম্প্রসারণের জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণে অত্যধিক জোর দিতে হবে এবং নতুন পণ্য ও নতুন বাজারের সন্ধানে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

হালাল পণ্য প্রসঙ্গে আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ উল্লেখ করেন, একক পণ্য হিসেবে তৈরি পোশাক ৩৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করে। অন্যদিকে হালাল পণ্য রপ্তানি হলো মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু হালাল পণ্যের সম্ভবনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উজ্জ্বল। বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এ দেশের প্রায় ৯১ শতাংশ মানুষ মুসলিম। হালাল পণ্যের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক চাহিদা ছিল ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালে হবে ৯ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার, গড় প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ। বর্তমানে ২ বিলিয়ন মুসলিমসহ অন্য ধর্মের বিশ্বাসীরাও আস্থা, স্বাস্থ্য বিধি, নৈতিকতা ও গুণগত মানের জন্য হালাল পণ্যের দিকে ঝুকছে। বাস্তবতা হলো, সারা বিশ্বে হালাল পণ্যের চাহিদা মাত্র ২০ শতাংশ এখন বাজারে আসতে পেরেছে। তাই এ খাতের সম্ভাবনাগুলো এখনো ভালোভাবে বিদ্যমান রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘একক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসাবে আমাদের একটা হালাল ব্র্যান্ডিং দরকার। ইন্দোনেশিয়ায় পর বাংলাদেশে ১২৫ বিলিয়ন ডলারের হালাল পণ্যের স্থানীয় চাহিদা তৈরি হতে পারে এবং ইন্দোনেশিয়া স্থানীয় বাজারে হালাল পণ্য বাধ্যতামূলক করে বিশাল একটি স্থানীয় চাহিদা তৈরি করেছে। বর্তমানে ইসলামি ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই আলাদাভাবে হালাল পণ্যের সনদ দিয়ে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করছে। এতে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত হালাল পণ্যের সনদ চাহিদা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই আসছে। মালয়েশিয়া হালাল অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে তাদের দেশে হালাল পণ্যের রপ্তানি ও আমদানি বাজারকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে।’

আরও পড়ুন

অভিযোগ ব্যবসায়ীদের / বিএসটিআই থেকে হালাল সনদ নিতে গেলে গাড়ি-টাকা ঘুস চাওয়া হয়

অনুষ্ঠানে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস-চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, শুধু কৃষিভিত্তিক ও খাদ্যদ্রব্য নয়, হালালের অনেক ধরন ও সুযোগ রয়েছে এবং এগুলো বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে। তিনি জানান, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে যোগাযোগের অভাব ও সমন্বয়হীনতা একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে কাজ করছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

কর্মশালায় অংশ নেন এফবিসিসিআইয়ের প্রাক্তন সভাপতি মীর নাসির হোসেন, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের (বিএবি) মহাপরিচালক মোহা. আমিনুল ইসলাম, অ্যাসোসিয়েশন অব টেস্টিং ল্যাব বাংলাদেশের সভাপতি মো. আহাশান হাবিব, বিসিআই পরিচালক জিয়া হায়দার মিঠু, বেঙ্গল মিটের হেড অব এক্সপোর্ট এ কে এম সায়াদুল হক, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের প্রাক্তন পরিচালক মো. খালেদ আবু নাসের, বাংলা কেমিক্যালের সিইও এম এস সিদ্দিকীসহ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি।

কর্মশালা থেকে বাংলাদেশের হালাল পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের জন্য কিছু সুপারিশ উঠে আসে। এগুলো হলো-

  • মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে হালাল হাব হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা সৃষ্টি।
  • হালাল পণ্যের কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ের জন্যে একটি একক হালাল কর্তৃপক্ষ বা হালাল বোর্ড স্থাপন।
  • উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায়ে সব ক্ষেত্রে শরিয়া, স্বাস্থ্যবিধি ও নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলা।
  • সক্ষমতা ও সুযোগ অনুযায়ী প্রযোজ্য বাজারে প্রবেশ।
  • আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ল্যাব টেস্ট সম্পন্ন করা এবং পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনে বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত ল্যাব স্থাপন করার সুযোগ দান।
  • অন্যান্য দেশ, যারা হালাল কার্যক্রমে সফল হয়েছে- মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক কার্যক্রম নেওয়া।
  • প্রয়োজন সঠিক নীতি-সাহসী পদক্ষেপ, সরকারি ও বেসরকারি খাতের একসঙ্গে কাজ করা এবং গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কাজে লাগানো।
  • হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে প্রতি স্তরের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি পরস্পরের সক্ষমতাকে শেয়ার করা।

একিউএফ/