নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের কোচিং সেমিনারে একটি ভিডিও নিয়মিত দেখানো হয়। গোলপোস্টের পেছন থেকে ধারণ করা সেই ভিডিওতে দেখা যায়, ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর শুটিং অনুশীলন করছে। ২০টি শটের বেশিরভাগই লক্ষ্যভ্রষ্ট। ভিডিও থামিয়ে উপস্থিত কোচদের প্রশ্ন করা হয়, এই ছেলেটির কি একদিন নরওয়ের জাতীয় দলে খেলার সামর্থ্য আছে? প্রায় সবাই উত্তর দেন, না।
নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের দীর্ঘদিনের প্লেয়ার ডেভেলপমেন্ট প্রধান হাকন গ্রটল্যান্ড বলেন, ‘ভিডিও দেখে সবাই মনে করে, সে খুবই সাধারণ মানের একজন স্ট্রাইকার।’
তবে ছোট করে কাটা সোনালি চুল হয়তো একটা ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কারণ লক্ষ্যভ্রষ্ট সেই কিশোরই আজ নরওয়ের সবচেয়ে বড় তারকা, বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্টার ফরোয়ার্ড এবং ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড।
গ্রটল্যান্ডের বিশ্বাস, সেই ব্যর্থতার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল হলান্ডের সাফল্যের বীজ, ‘হয়তো এ কারণেই সে আজ সেরা হয়েছে। সে সবচেয়ে বেশি মিস করেছে, তারপর আরও বেশি অনুশীলন করেছে। ভিডিওতে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট দেখা যায়। সেখানে শুধু আর্লিং, একজন কোচ আর গোলরক্ষক ছিল। দলের বাকি সবাই তখন বাসে করে হোটেলে ফিরে গেছে। কিন্তু আর্লিং থেকে গিয়েছিল। কারণ সে আরও ভালো হতে চেয়েছিল।’
এখন সেই হলান্ডই ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। শেষ ষোলোয় ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নরওয়েকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয় উপহার দিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সাত গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তার ওপরে আছেন শুধু লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে।
গত এক মাস যেন হলান্ডের বিশ্বজয়ের মাস। প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা বুন্দেসলিগায় তার গোলের গল্প নতুন নয়। কিন্তু ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলা নরওয়েকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি নিজের তারকাখ্যাতিকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বিশ্বকাপ তাকে নতুন করে চিনিয়েছে আমেরিকান দর্শকদের কাছে। একই সঙ্গে বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীও যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন হলান্ডকে।
তবে শুধু গোল করার ক্ষমতার জন্য নয়
এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সবচেয়ে সহজ-সরল এবং সবচেয়ে আপন করে নেওয়া তারকাদের একজন হয়ে উঠেছেন হলান্ড। মাঠে যেমন নির্মম গোলদাতা, মাঠের বাইরে ঠিক ততটাই হাসিখুশি, আত্মবিদ্রূপে স্বচ্ছন্দ এবং সতীর্থদের প্রাণভোমরা।
ব্রাজিলকে হারানোর পর সমর্থকদের ঢোল বাজিয়ে উদযাপনের নেতৃত্ব দেন তিনি। এরপর নিজের ইউটিউব চ্যানেলে মজার ছলে জবাব দেন ইংল্যান্ড কিংবদন্তি ওয়েইন রুনিকে। বিবিসিতে বিশ্লেষক হিসেবে রুনি বলেছিলেন, নরওয়ে যদি কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে, তাহলে তিনি লিভারপুলের মার্সি নদীতে নৌকা বাইবেন।
হেসে হলান্ড বলেন, ‘ওয়েইনি বয়, তোমার সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছি। এখন আমি শুধু সেটাই দেখতে চাই।’
ইংল্যান্ডের বাইরে অবশ্য অনেকেই চাইছেন, এই বিশ্বকাপে হলান্ডের যাত্রা আরও দীর্ঘ হোক। ফ্রান্স ও সেনেগালের মতো কঠিন প্রতিপক্ষ থাকা গ্রুপ থেকে পরের পর্বে ওঠাই ছিল নরওয়ের প্রাথমিক লক্ষ্য। এখন তারা শেষ চারে ওঠার স্বপ্ন দেখছে, আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় কারিগর হলান্ড।
নরওয়েজিয়ান স্কুল অব স্পোর্ট সায়েন্সের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক গেইর ইয়র্দেট মনে করেন, হলান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ব্যক্তিত্বের দুই বিপরীত দিকের অসাধারণ মিশ্রণ।
ইয়র্দেটের ভাষায়, ‘সতীর্থ হোক কিংবা প্রতিপক্ষ, সবার প্রতিই তার আন্তরিকতা, সংক্রামক হাসি আর উষ্ণ আলিঙ্গন মানুষকে আকৃষ্ট করে। ছোটবেলা থেকেই সবাই তার আশেপাশে থাকতে চাইত।’
গ্রটল্যান্ডও একই অভিজ্ঞতার কথা শোনান, ‘নরওয়ে তাকে নিয়ে গর্বিত। সবসময় বড় একটা হাসি আর ইতিবাচক শক্তি নিয়ে থাকে সে। সতীর্থদের স্বস্তি দিতে পারে। জাতীয় দলে যে পারস্পরিক বন্ধন দেখা যায়, সেখানে হলান্ডের অবদান অসাধারণ।’
২০২৬ সালের নরওয়ে যেন নিজের পরিচয় খুঁজে পেয়েছে ভাইকিং ঐতিহ্যে। বিশ্বকাপের আগে যোদ্ধার বেশে দলীয় ফটোশুট, জয়ের পর খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সমর্থকদের একসঙ্গে বৈঠা চালানোর প্রতীকী উদযাপন, সবকিছুতেই যেন সবচেয়ে মানানসই মুখ হলান্ড। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার এই স্ট্রাইকার প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার ক্যালোরির খাবার খান। তার খাদ্যতালিকায় থাকে গরুর হৃদপিণ্ড, কলিজা ও কাঁচা দুধ। সেরা দিনে শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেন তিনি।
কিন্তু তার শুরুর গল্পটা ছিল একেবারেই ভিন্ন
ছোটবেলায় নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পে সুযোগ পেলেও তিনি কখনোই সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন না।
২০১৪ সালের জুনে স্টাভেঞ্জারে অনুষ্ঠিত একটি ক্যাম্পে ২০০০ সালে জন্ম নেওয়া সেরা ৩০ ফুটবলারের একজন ছিলেন হলান্ড। ক্যাম্প শেষে কোচদের বলা হয়, এমন একজনের নাম লিখতে, যিনি একদিন নরওয়ের সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন। একজন কোচও হলান্ডের নাম লেখেননি। তার কিছুদিন পরই বদলে যায় সবকিছু।
হলান্ডের বড় ভাই আস্তর পরে জানান, মাত্র এক বছরে তার উচ্চতা বেড়েছিল ২০ সেন্টিমিটার, ওজন বেড়েছিল ২০ কেজি। "হঠাৎ করেই দেখলাম, আমরা দুজন একই উচ্চতার হয়ে গেছি", ২০২২ সালে প্রকাশিত তথ্যচিত্র Haaland: The Big Decision-এ বলেছিলেন তিনি।
এখন হলান্ড তার বাবা, সাবেক নরওয়ে আন্তর্জাতিক আলফি হলান্ডের চেয়েও লম্বা। তবে এই দেরিতে শারীরিক বিকাশের গল্পই নরওয়ের তরুণ ফুটবলারদের কাছে বড় অনুপ্রেরণা। যদিও আত্মবিশ্বাসের অভাব তার কোনো দিনই ছিল না।
সাবেক নরওয়ে অধিনায়ক এবং বর্তমান সহকারী কোচ ব্রেডে হ্যাঙ্গেলান্ড স্মরণ করেন, ১৪ বছর বয়সেই হলান্ড তাকে বলেছিল, একদিন সে বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার হবে।
‘সেখানে থাকা অধিকাংশ ১৪ বছরের ছেলে আমার চোখের দিকেও তাকাতে পারত না। কিন্তু হলান্ড ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।’
দীর্ঘদিনের বন্ধু মার্টিন ওডেগার্ডও তার সেই আত্মবিশ্বাসের সাক্ষী। Haaland: The Big Decision তথ্যচিত্রে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘তুমি অনেক বদলে গেছ। আগে তুমি একটু বেশি দুষ্টু ছিলে। গত কয়েক বছরে অনেক পরিণত হয়েছ।’
ওডেগার্ডের কাছে অবশ্য শুরু থেকেই পরিষ্কার ছিল, হলান্ড একদিন বিশ্বের সেরাদের একজন হবে। পরিসংখ্যানও সেই কথাই বলছে।
মোলদে, রেড বুল সালজবুর্গ, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড ও ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ৩৬৪ ম্যাচে ২৯৭ গোল করেছেন তিনি। নরওয়ের জার্সিতেও তার রেকর্ড অবিশ্বাস্য। টানা ১৪ আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করেছেন হলান্ড। মোট ৫৪ ম্যাচে তার গোল ৬২টি।
গ্রটল্যান্ড বলেন, ‘১৪ বছর বয়সে আমরা আরও অনেক স্ট্রাইকারকে বেশি সম্ভাবনাময় মনে করতাম। কয়েক বছর পর দেখা গেল, সেরাদের সেরা হয়ে উঠেছে হলান্ড।’
তিনি যোগ করেন, ‘তখন সে খুব লম্বা ছিল না। বরং ছোটদের একজন ছিল। তাই তাকে বুদ্ধি খাটিয়ে দৌড়াতে হতো, ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করতে হতো এবং ডিফেন্ডারদের আগে পৌঁছাতে হতো। পরে সে হয়ে উঠেছে এক বুদ্ধিমান দৈত্য। শুরু থেকেই যদি তার এই শারীরিক সামর্থ্য থাকত, তাহলে হয়তো এত বড় ফুটবলার হতো না। ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথম গোলটিতে তার মুভমেন্ট আর টাইমিং দেখুন। সেই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অসাধারণ শারীরিক শক্তির সমন্বয়ই তাকে অনন্য করে তুলেছে।’
বিশ্বকাপে গোলের বন্যা যেমন তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে, তেমনি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডও সেই জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করেছে।
গত সেপ্টেম্বরে তিনি ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন। সেখানে মাঠের বাইরের সহজ-সরল, হাস্যরসাত্মক জীবনের নানা মুহূর্ত তুলে ধরেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকদের প্রতিও আলাদা নজর রয়েছে তার। শেষ ৩২-এ আইভরি কোস্টকে হারানোর পর ডালাসের একটি ওয়েস্টার্ন স্টোরে গিয়ে কাউবয়ের পোশাক পরেন। নিজের স্টেটসন টুপিতে লেখেন ‘EH9’। টি-শার্টে ছিল লেখা, “Y’all can kiss my Dallas.”
রুনিকে নিয়ে করা ঠাট্টা কিংবা এক মার্কিন ভক্তের সঙ্গে ছবি তোলার সময় নিজেকে দলের ‘সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার’ পরিচয় দেওয়া, সবই তার সহজ-সরল রসবোধের অংশ।
ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটেও একই ছবি। নিজের চেহারার তুলনা করেন কখনো শ্রেকের সঙ্গে, কখনো জাপানি অ্যানিমের চরিত্র মাজিন বুর সঙ্গে। এই আত্মবিদ্রূপই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
গত এক মাসে ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারী বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ। বিশ্লেষণ সংস্থা সোশ্যাল ব্লেডের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করার পরের ২৪ ঘণ্টাতেই যুক্ত হয়েছে ৫০ লাখ নতুন অনুসারী। তার ইউটিউব চ্যানেলেও নতুন সাবস্ক্রাইবার বেড়েছে প্রায় ৯ লাখ।
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আগে সাংবাদিকদের হলান্ড বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপে খেলা, বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে সবচেয়ে বড় মঞ্চে নামা, এটা সত্যিই বিশেষ অনুভূতি।’
এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে শুধু নরওয়ের নয়, পুরো বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আকর্ষণের নাম আর্লিং হলান্ড। গোল, ব্যক্তিত্ব, পরিশ্রম আর সহজাত আন্তরিকতার অনন্য মিশেলে তিনি নিজেকে শুধু একজন সুপারস্টার হিসেবে নয়, বরং ফুটবলের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোর একজন হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন।








