আজ ৭০ বছরে পা রাখলেন হলিউডের অভিনেতা টম হ্যাংকস। ছয় দশকের জীবনে তিনি শুধু অস্কারজয়ী অভিনেতা নন; বরং বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত তারকাদের একজন। তাঁকে বলা হয় ‘হলিউডের সবচেয়ে ভালো মানুষ, বিশ্বস্ত মানুষ।’ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত এই অভিনেতার সেরা হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটা সহজ ছিল না। ক্যারিয়ারের উত্থানের সেই গল্প জেনে নিতে পারেন।

একাকিত্বে বেড়ে ওঠা
১৯৫৬ সালের ৯ জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ার কনকর্ড শহরে জন্ম টম হ্যাংকসের। তাঁর বয়স যখন মাত্র চার, তখনই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর শৈশব কেটেছে এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে ঘুরে। কখনো বাবার সঙ্গে, কখনো মায়ের সঙ্গে, কখনো আবার সৎবাবা-মায়ের সংসারে। এই অস্থির শৈশব তাঁকে একাকী করে তুলেছিল। বহু পরে এক সাক্ষাৎকারে হ্যাংকস বলেছিলেন, ‘আমার ছোটবেলার সেই একাকিত্বই মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে যেমন শিখিয়েছে, তেমনি গল্পের জগতে ডুব দিতে শিখিয়েছিল। এটাই হয়তো আরও শিখিয়েছে চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়া।’

টম হ্যাংকস

অভিনয়ের প্রেমে
একাকিত্বের কারণে স্কুল ও পড়াশোনার সময়টা ভালো কাটেনি। টম হ্যাংকস স্কুলজীবনে খুব বেশি জনপ্রিয় ছিলেন না। বন্ধুদের সঙ্গেও তেমন মিশতেন না। এর মধ্যেই ভাবনা আসে, সময় কাটানোর জন্য কলেজে গিয়ে নাট্যচর্চা করলে কেমন হয়? ব্যস, নাটকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলেন। তখনো কি জানতেন, এই অভিনয়ই তাঁর জীবন বদলে দিতে যাচ্ছে। থিয়েটার করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, অভিনয় করতে তাঁর ভালো লাগে। সময় দিতে থাকেন, ভাবেন, অভিনয় করলে মন্দ হয় না। এই একটি সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় নাট্যচর্চার পর তিনি যোগ দেন ওহাইওর গ্রেট লেকস থিয়েটার ফেস্টিভ্যালে। সেখানে সামান্য বেতনে কাজ করতেন, কিন্তু অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে ধরে রেখেছিল। তিনি এই নিয়ে বলেছিলেন, ‘ছোটবেলায় আমি যা খুশি তা করার মতো অবিশ্বাস্য স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। যখন আমি জুনিয়র হাইস্কুলে পড়ি, তত দিনে আমি নিজের ইচ্ছেমতো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতাম। এক মুক্ত জীবনই আমাকে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছে।’

কমেডি অভিনেতা দিয়ে শুরুটা
হয়তো অনেকেই বিশ্বাস করবেন না, টম হ্যাংকস কমেডি অভিনয় করতেন। কিন্তু আশির দশকের শুরুতে টেলিভিশন সিরিজ ‘বোসম বাড্ডিস’-এ তাঁকে কমেডি চরিত্রে দেখা যায়। এই সিরিজ তাঁকে কমেডি অভিনেতা হিসেবে বেশ পরিচিতিও এনে দেয়। কিন্তু তখনো কেউ ভাবেননি, এই অভিনেতাই একদিন হলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী তারকা হবেন, হবেন সর্বজনের ভালোবাসার পাত্র। তিনি দাপিয়ে বেড়াবেন থ্রিলার, যুদ্ধের গল্পসহ বহুমাত্রিক চরিত্রে। ১৯৮৪ সালে ‘স্প্ল্যাশ’ সিনেমা তাঁকে প্রথম বড় সাফল্য এনে দেয়। এরপর ‘বিগ’ তাঁকে প্রথম অস্কার মনোনয়ন দিলে হলিউডে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

টম হ্যাংকস

টার্নিং পয়েন্ট
টম হ্যাংকস তখন একের পর এক অভিনয় করে প্রশংসা পাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি কী তখনো আন্তর্জাতিক তারকা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন? এটুকু বলা যায়, তখনো তাঁর অভিনয়প্রতিভা বিশ্বের সিনেমাপ্রেমীরা জানেন না। এর মধ্যেই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৯৯৩ সালে ‘ফিলাডেলফিয়া’ সিনেমার মাধ্যমে। এইডসে আক্রান্ত এক আইনজীবীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের মুগ্ধ করে এবং তিনি প্রথম অস্কার জেতেন। সিনেমাটি নিয়ে যখন তুমুল আলোচিত এই অভিনেতা। ঠিক পরের বছরই নাম লেখান ‘ফরেস্ট গাম্প’ নামের কালজয়ী সিনেমায়। এখনো যেন দর্শকের কানে বাজে ‘রান ফরেস্ট রান’ সেই সংলাপ, যা গল্পে ফরেস্টের জীবন বদলে দিয়েছিল। মূলত সরল মনের এক মানুষের জীবনযাত্রার গল্প নিয়ে নির্মিত এই সিনেমা তাঁকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে। এই ছবির জন্য দ্বিতীয়বারের মতো অস্কার জেতেন তিনি। উল্লেখ্য, এই ‘ফরেস্ট গাম্প’ সিনেমাটি ভারতেও রিমেক হয়েছিল। সেই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন আমির খান। ২০২২ সালে সেই ‘লাল সিং চাড্ডা’ বিশ্বজুড়ে মুক্তি পায়।

একের পর এক ক্ল্যাসিক
তিনি যেন ক্ল্যাসিক সিনেমার রাজপুত্র। এখনো বিশ্বের ক্ল্যাসিক সিনেমার তালিকা করলে ওপরের দিকেই থাকে এই অভিনেতার ছবিগুলোর নাম। তাঁর অভিনীত ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’, ‘দ্য গ্রিন মাইল’, ‘কাস্ট অ্যাওয়ে’, ‘রোড টু পারডিশন’, ‘ক্যাপ্টেন ফিলিপস’সহ অনেক সিনেমার কথা বলা যায়। সিনেমাবোদ্ধাদের কাছে তিনি যেমন আলোচিত, তেমন শিশু-কিশোরদের কাছে তিনি চিরকাল পরিচিত থাকবেন ‘টয় স্টোরি’র উডি চরিত্রের কণ্ঠশিল্পী হিসেবে। প্রায় তিন দশক এই চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।

সফলতাই নয়, ছিল ব্যর্থতাও
জীবন কখনোই সরলরৈখিকভাবে চলে না। তবে টম হ্যাংকস মনে করতেন, ‘ঘাত–প্রতিঘাত জীবনকে আরও বেশি দৃঢ়চেতা করে। জীবনকে আরও শক্তি দেয়, শিখিয়ে দেয়, জীবনকে আলাদা করে দেয়।’ সেই কারণেই কি হলিউডে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও দেখেছেন টম হ্যাংকস। তিনি আশির দশকে তখন একাকিত্বে ভুগতেন। আর চাইতেন, অভিনয় নিয়ে শুটিং সেটে ব্যস্ত থাকতে। কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুতে বহু অডিশনে একের পর এক বাদ পড়েছেন। এ ছাড়া সুযোগ পেলেও সিনেমা বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর সংগ্রামী ক্যারিয়ারে সফলতা এলেও পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে প্রকাশ করেন, তিনি টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

জীবন নিয়ে উপলব্ধি
জীবন নিয়ে তাঁর চিন্তাচেতনা নানা সময়ে উঠে এসেছে সাক্ষাৎকারে। সেসব উক্তির মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। পরিশ্রম নিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘কাজ কঠিন না হলে সবাই করতে পারত। কঠিন বলেই কোনো কাজ মহান হয়ে ওঠে।’ আর একাকী থাকলে এটাই ভাবেন, ‘এই সময়টাও কেটে যাবে, লাইফ গোজ অন।’ যে কারণে তিনি কখনোই হতাশ হতেন না। এ ছাড়া অভিনয়ে সব সময় তিনি চরিত্রাভিনেতা হয়ে উঠেছেন। কখনোই নিজেকে নায়ক মনে করেননি। এই নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘নায়ক সে-ই, যে স্বেচ্ছায় অজানার পথে হাঁটে।’

টম হ্যাংকস বনাম আমির খান, শাহরুখ, অনিল থেকে কীভাবে এল ‘লাল সিং চাড্ডা’
টম হ্যাংকস ও আমির খান

কেন টম হ্যাংকস আলাদা
হলিউডে বড় তারকার অভাব নেই। কিন্তু টম হ্যাংকস আলাদা হয়েছেন তাঁর অভিনয়ের পরিসর, সাধারণ মানুষের চরিত্রকে অসাধারণভাবে তুলে ধরার ক্ষমতা এবং ব্যক্তিত্বের জন্য। তিনি কখনো সুপারহিরো হননি, কিন্তু সাধারণ মানুষের নায়ক হয়ে উঠেছেন। ভক্তরা মনে করেন, ৭০ বছরে দাঁড়িয়েও তিনি এখনো সক্রিয়, কাজ করে যাচ্ছেন নতুন নতুন চলচ্চিত্রে। তাঁর জীবন হয়তো একটি কথাতেই সংক্ষেপে বলা যায়—সাফল্য প্রতিভা থেকে আসে, কিন্তু কিংবদন্তি হয়ে ওঠে ধৈর্য, পরিশ্রম আর সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকার মাধ্যমে। যে গুণগুলো টম হ্যাংকসের মধ্যে ছিল।

ব্যক্তিগত জীবন
তাঁর মধ্যে নেই তারকাসুলভ আচরণ। তাঁকে বলা হয় ‘হলিউডের সেরা বিশ্বস্ত মানুষ।’ তিনি খুবই সাধারণ জীবন যাপন করেন। ব্যক্তিজীবনে এই জনপ্রিয় অভিনেতা ১৯৮৮ সালে অভিনেত্রী ও সংগীতশিল্পী রিটা উইলসনকে বিয়ে করেন। তাঁদের দাম্পত্য জীবন হলিউডের সবচেয়ে স্থায়ী সম্পর্কগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে অভিনেতা কলিন হ্যাংকস ইতিমধ্যেই অভিনয়ে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। ছেলেরও পছন্দের অভিনেতা বাবা।

টম হ্যাংকস

এই অভিনেতা কত সম্পদের মালিক
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, টম হ্যাংকসের সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৪০ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এই আয় বেশির ভাগ সিনেমার লভ্যাংশ থেকে এসেছে। তিনি ‘ফরেস্ট গাম’ সিনেমার পরে পারিশ্রমিকের বদলে লাভের অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে কয়েক কোটি ডলার অতিরিক্ত আয় এনে দেয়।
সূত্র: আইএমডিবি, পিপলস ম্যাগাজিন, সিবিএসনিউজ