দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর পেছনে টিকাদানের ঘাটতিকে প্রধান কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, কেবল টিকার অভাবই নয়, দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর দুর্বলতাও এই মৃত্যুর মিছিলের জন্য সমানভাবে দায়ী। হামে প্রাণ হারানো ৩৪টি শিশুর চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের ৭১ শতাংশেরই শেষ মুহূর্তে জীবন রক্ষাকারী আইসিইউ সুবিধা মেলেনি। যথাযথ চিকিৎসার খোঁজে ৮২ শতাংশ শিশুকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হেলথে’ প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড ইমিউনিটি গ্যাপস : হেলথ-সিস্টেম কনস্ট্রেইন্টস অ্যান্ড মিজলস মর্টালিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণা প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সংকট, জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসার অভাব, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে বারবার স্থানান্তর, রেফারেলে বিলম্ব, অক্সিজেন ও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণ হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
গবেষণাটি করেছেন বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) সায়েন্টিস্ট ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন। গবেষকের মতে, বিশ্বের সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবের তুলনায় বাংলাদেশের মৃত্যুর হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি। উদাহরণ হিসাবে ইউরোপ অঞ্চলের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৪ সালে সেখানে ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি হাম রোগী শনাক্ত হলেও মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ৩৮ জনের। এই পার্থক্য কেবল টিকাদানের হার দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। এর মধ্যে রয়েছে ১০০ শতাংশ শিশুর আইসিইউ বা পেডিয়াট্রিক আইসিইউ প্রয়োজন হয়েছিল, ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পিআইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি অথবা শয্যা ফাঁকা ছিল না, ৮২ শতাংশ শিশুকে দুই বা তার বেশি হাসপাতালে ঘুরতে হয়েছে, ২৯ শতাংশ শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা থেকে ঢাকায় পাঠাতে হয়েছে আর ৬৫ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার ব্যয় বহনে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে; কেউ গয়না বিক্রি করেছেন, কেউ ঋণ নিয়েছেন। এ ছাড়া ৩৮ শতাংশ ক্ষেত্রে রেফারেলে অন্তত একদিনের বিলম্ব হয়েছে, ২১ শতাংশ ঘটনায় রোগ শনাক্তে বিলম্ব বা ভুল রোগ নির্ণয়ের তথ্য পাওয়া গেছে, ১৫ শতাংশ শিশু আইসিইউতে পৌঁছানোর আগেই অথবা হাসপাতালে স্থানান্তরের পথে মারা গেছে। এর বাইরে জেলা পর্যায়েও নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা।
গবেষণায় বলা হয়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ২২ জেলায় সরকারি আইসিইউ সুবিধা নেই। সরকারি খাতের মোট ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যার ৫৫ শতাংশই ঢাকার ২২টি হাসপাতালে কেন্দ্রীভূত। ফলে মফস্বলের গুরুতর অসুস্থ শিশুদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারকে কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় আসতে হয়েছে। এই দীর্ঘ চিকিৎসা পথে অনেক শিশুর অবস্থার অবনতি হয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে তিন মৃত্যু : এদিকে শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম সন্দেহভাজন তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা ৭০২ এবং গত ১৫ মার্চ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা এক লাখ ১০ হাজার ৬০১ জন। ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৮৪ জন, গত ১৫ মার্চ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৩ হাজার ৪১০ জন।








