হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনার পর এবার ইরানে পাল্টা ‘শক্তিশালী’ বিমান ও নৌ হামলা শুরু করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার তারা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ৬০টিরও বেশি ছোট নৌকাসহ অন্তত ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তবে ইরান এই হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে এবং এর বিরুদ্ধে ‘দৃঢ় পদক্ষেপ’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাকে গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘তেহরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অত্যন্ত দৃঢ় ও নিষ্পত্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন বিমানবাহিনী কিশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং সিরিক অঞ্চলে বোমাবর্ষণ করেছে। এসব এলাকায় বোমার স্প্লিন্টারের আঘাতে বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

তবে হরমুজ প্রণালিতে যে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার জেরে এই মার্কিন প্রতিক্রিয়া, সেই হামলার দায় ইরান এখন পর্যন্ত সরাসরি স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ৬০টি ছোট নৌকার পাশাপাশি তারা ইরানের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সামরিক কমান্ড সেন্টারকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তুগুলোর অবস্থান বা অঞ্চলের নাম প্রকাশ করেনি সেন্টকম।

হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরে সেন্টকম জানায়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিরীহ মানুষদের দ্বারা পরিচালিত বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য ইরানকে কঠোর মূল্য দিতেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এর আগে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছিল যে, এই ধরনের উসকানিমূলক আচরণের পরিণতি ভালো হবে না।

হামলা শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় (ট্রেজারি বিভাগ) ইরানের ওপর থেকে সাময়িকভাবে তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের যে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল করে দেয়। গত মাসে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে ইরানকে এই অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক পদক্ষেপকে ‘দুরভিসন্ধি, অসংগতি এবং অবিশ্বস্ততার’ প্রমাণ বলে আখ্যা দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা আরও যোগ করেছে যে, নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে তেহরান যেকোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।

হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার হওয়া ট্যাংকারগুলোর বিষয়ে কাতার ও সৌদি আরব পৃথকভাবে ইরানের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছে। দেশ দুটি জানিয়েছে, প্রণালি অতিক্রম করার সময় তাদের দুটি পৃথক জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারী জানান, হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী আন্তর্জাতিক রুটে যাতায়াতকারী কাতারি মালিকানাধীন জাহাজ ‘আল-রেকাইয়াত’-এ পরিকল্পিত হামলার জন্য সম্পূর্ণভাবে ইরান দায়ী।

সৌদি আরব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় তাদের ‘ওয়াদিয়ান’ নামক একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালায়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই কাতারের এই অভিযোগকে ‘সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণের পরিপন্থী’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, যেসব বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় না করে বা তাদের ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ রেখে রুট ব্যবহার করে, তারা মূলত নিজেদের দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে ফেলে। এ ধরনের আচরণ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইরানের আন্তরিক প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, গত সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত স্থান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আগুন লেগে যায়।

পরদিন মঙ্গলবারও পৃথক দুটি ঘটনা ঘটে। একটি ট্যাংকার প্রণালি পার হওয়ার সময় আক্রান্ত হলেও সেটি সফলভাবে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অন্য আরেকটি ট্যাংকার সামান্য কাঠামোগত ক্ষতির শিকার হলেও বড় কোনো দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পায়।

চলমান এই চরম উত্তেজনার মধ্যেও মার্কিন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এখনো ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে ‘সদাশয়তার’ সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক।

উল্লেখ্য, গত মাসেই দীর্ঘ আলোচনার পর মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা একটি ১৪-দফা সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছিলেন। যার মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা এবং "সব ফ্রন্টে" সংঘাতের অবসান ঘটানো।

এই চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালির দুই প্রতিবেশী দেশ ইরান ও ওমানকে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সঙ্গে এই নৌপথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনায় বসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ইতিপূর্বে ইরান এই প্রণালিতে নিজের একক সার্বভৌমত্ব দাবি করে ‘পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ নামক একটি স্বশাসিত সংস্থা গঠন করেছিল, যা ওই অঞ্চল দিয়ে যাতায়াতকারী বিদেশি জাহাজের ওপর নজরদারি চালাত।

ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, নতুন চুক্তির আওতায় এই জলপথটি মূলত ওমানের সঙ্গে যৌথ ব্যবস্থাপনায় ইরানই পরিচালনা করবে এবং যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে নির্দিষ্ট হারে ‘সার্ভিস ফি’ আদায় করারও পরিকল্পনা ছিল তেহরানের। তবে সাম্প্রতিক এই হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় সেই চুক্তি ও সমঝোতা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।