লাইফ’স বিগেস্ট ফেইলর ইজ নট মিটিং ইয়োর ওউন পটেনশিয়াল—এ কথার নির্মম সত্য হয়তো সবচেয়ে গভীরভাবে বোঝে সেই মানুষ, যে জানে সে কতটা দিতে পারত; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিতে পারেনি। চেষ্টা ছিল, ত্যাগ ছিল, নিষ্ঠা ছিল; শুধু শেষ মুহূর্তে ভাগ্য আর পাশে দাঁড়ায়নি।

ফুটবলও অনেক সময় মানুষের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের হার যেন শুধুই একটি ম্যাচের ফল নয়। এটি ছিল বহু কোটি সমর্থকের আরেকটি দীর্ঘশ্বাস। শেষ পর্যন্ত নরওয়ে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। ম্যাচটিতে শেষার্ধে জোড়া গোল করে ইতিহাস গড়েন আর্লিং হলান্ড। আর যোগ করা সময়ে নেইমারের পেনাল্টি গোল কেবল ব্যবধানই কমাতে পেরেছে। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ব্রাজিল ১৯৯০ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিল।

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২–১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল। খেলা শেষে হতাশ ব্রাজিলের তারকারা

ব্রাজিল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ‘হেক্সা’—ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে ২০০২ সালের পর থেকে। ২৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই অপেক্ষার শেষ হলো না; বরং আরও দীর্ঘ হলো। কিন্তু সবচেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপার হলো, এই দলটিকে সম্ভাবনাহীন বলা যায় না। নেইমার, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ব্রুনো গিমারাইশ, মারকুইনিওস—নামের পাশে প্রতিভার কোনো ঘাটতি ছিল না। কোচ হিসেবে ছিলেন কার্লো আনচেলত্তির মতো অভিজ্ঞ একজন কৌশলী। তবু ফুটবল আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রতিভা সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। অনেক সময় ভাগ্য, মুহূর্তের সিদ্ধান্ত এবং প্রতিপক্ষের নিষ্ঠুর কার্যকারিতাই সবকিছু বদলে দেয়।

মজার বিষয়, নরওয়ে বরাবরই ব্রাজিলের জন্য এক অদ্ভুত প্রতিপক্ষ। বিশ্বকাপে কিংবা আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্রাজিল কখনোই নরওয়ের বিপক্ষে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এই ম্যাচের আগেও তাদের মুখোমুখি লড়াইয়ে নরওয়ে ছিল অপরাজিত। ইতিহাসের সেই মানসিক চাপও যেন আবার ফিরে এল এই ম্যাচে।

একটি অসমাপ্ত স্বপ্নের নাম নেইমার
নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল

জীবনের সঙ্গে এখানেই যেন ফুটবলের মিল। কিছু মানুষ থাকে, যারা প্রতিদিন নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে রাখে। কঠোর পরিশ্রম করে, নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কেবল ফলাফলটাই মনে রাখে। প্রচেষ্টা নয়, সংগ্রাম নয়—শুধু জয় অথবা পরাজয়। ব্রাজিল কিংবা কিংবদন্তি ফুটবলার নেইমার জুনিয়র যেন সেই গল্পেরই এক বিশাল সংস্করণ।

হেক্সার স্বপ্ন ছিল বাস্তব। সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু বাস্তবতা আর সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক নির্মম সন্ধ্যা। যেখানে কয়েকটি মুহূর্ত, কয়েকটি ভুল এবং একজন হলান্ড পুরো গল্পটাই বদলে দিলেন।

হয়তো এ কারণেই জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কখনো কখনো হার নয়; বরং নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার পূর্ণ প্রকাশ ঘটাতে না পারা। সবাই হেরে যায় না; কিন্তু জীবন কাউকে কাউকে এমনভাবে হারিয়ে দেয়, যেখানে পরাজয়ের স্কোরলাইন শুধু মাঠেই লেখা থাকে না। লেখা থাকে অপেক্ষার ইতিহাসে, অপূর্ণ স্বপ্নের পাতায়, আর লক্ষ-কোটি সমর্থকের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে। ব্রাজিলের হেক্সা-স্বপ্ন আজও শেষ হয়নি। শুধু প্রতীক্ষার ক্যালেন্ডারে যোগ হলো আরও চারটি বছর।

তরুণ লেখক, কুড়িগ্রাম