২০১৬ সালের ১ জুলাই, দিনটি ছিল শুক্রবার। দিনের আলো নিভতেই গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার ৭৯ নম্বর রোডের রেস্তোরাঁ ‘হোলি আর্টিসান বেকারি’ রূপ নিয়েছিল এক বিভীষিকাময় রক্তাক্ত উপাখ্যানে।

রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে রেস্তোরাঁটিতে সশস্ত্র হামলা চালায় জঙ্গিরা, যা স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো দেশ। সেই রাতের হামলায় ২০ জন নিরীহ মানুষের নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার ঘটনাটি ঘটে।

আজ প্রায় এক দশক পর, সেই ভয়াবহ স্মৃতি যখন মানুষের মনে এখনো দগদগে, ঠিক তখনই জনমনে নতুন প্রশ্ন—দেশে আবারও জঙ্গি তৎপরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কি না?

গত কয়েক মাস আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার আশঙ্কা জানিয়ে সতর্কতামূলক চিঠি পাঠানোর পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও দীর্ঘদিন বড় ধরনের কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি, তবুও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, দেশে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। উগ্রবাদী কিছু সংগঠন নীরবে পুনর্গঠিত হয়ে অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা ছোট ছোট সেল গঠন এবং লো-প্রোফাইল কার্যক্রমের মাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সিটিটিসি মোট ১৫২ জনকে গ্রেফতার করেছে। এরমধ্যে মাত্র ১১ জনের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বাকি ১৪১ জনই প্রচলিত অপরাধী।—ডিএমপির তথ্য

বিশেষ করে কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাধিক বিস্ফোরণ এবং পরে জঙ্গি সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ১৭ জনের গ্রেফতারের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আবারও সতর্ক অবস্থানে নিয়ে আসে। এছাড়া আন্তর্জাতিক একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে দেশীয় কয়েকজনের সম্পৃক্ততার লিংক এবং দেশীয় জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র তৎপরতাও এসময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তদন্তে শুধু স্থানীয় নেটওয়ার্ক নয়, বরং পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে কিছু ব্যক্তির পরোক্ষ যোগাযোগ বা অনলাইন লিংকের তথ্যও উঠে এসেছে।

জঙ্গি দমনে বিশেষায়িত ইউনিটের বর্তমান সক্ষমতা ও চ্যালেঞ্জ

বর্তমান নিরাপত্তা সতর্কতার মুখে উগ্রবাদ দমনে গড়ে ওঠা বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। পুলিশের জঙ্গিবিরোধী দুই বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) ভূমিকা এখন বিভিন্ন মহলে সমালোচিত।

অভিযোগ রয়েছে, উগ্রবাদ মোকাবিলার জন্য তৈরি এ দুটি ইউনিট বর্তমানে মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী, রাজনৈতিক মামলার আসামি এবং প্রচলিত অপরাধ দমনের কাজেই বেশি ব্যস্ত সময় পার করছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সিটিটিসি মোট ১৫২ জনকে গ্রেফতার করেছে। এরমধ্যে মাত্র ১১ জনের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বাকি ১৪১ জনই মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিসহ বিভিন্ন প্রচলিত অপরাধে অভিযুক্ত।

একইভাবে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) ৫০ থেকে ৬০ জনকে গ্রেফতার করলেও তাদের অধিকাংশই প্রচলিত অপরাধী। জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বড় কোনো অভিযান বা তৎপরতা এ ইউনিটের পক্ষ থেকে চোখে পড়ছে না।

আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা / দেশে জঙ্গি আছে, সরকার এটাকে শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যখন জঙ্গি হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছে, তখন এই বিশেষায়িত ইউনিটগুলো কেন প্রচলিত অপরাধ দমনে ব্যস্ত?

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়, দেশে জঙ্গিবাদ পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভিন্ন এবং অনেক ঘটনায় অতীতের তুলনায় ভিন্ন ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। এরপর থেকেই সিটিটিসি ও এটিইউর জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে কিছুটা শিথিলতা দেখা যায়। পরবর্তীসময়ে ইউনিট দুটি মূলত প্রচলিত অপরাধ দমনের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। যার মধ্যে মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট অভিযান বেশি দেখা যায়।

তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, আগে সিটিটিসিতে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ বিষয়ে দক্ষ এবং দীর্ঘদিন কাজ করা বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হতো। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ইউনিটটিকে অনেকটাই ‘ডাম্পিং পোস্টিং’-এ পরিণত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অনেককে বিভিন্ন ইউনিটে বদলি করা হয়েছে।

আবার কেউ কেউ জুলাই-আগস্টের হত্যা মামলার আসামি হওয়ায় আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে বর্তমানে সিটিটিসিতে জঙ্গিবাদ নিয়ে গভীরভাবে কাজ করার মতো অভিজ্ঞ কর্মকর্তার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যারা বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন, তারা চেষ্টা করলেও জঙ্গিবাদ-সংক্রান্ত অপরাধের ধরন অন্যসব অপরাধের চেয়ে ভিন্ন হওয়ায় বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে তাদের সময় লাগছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইউনিটটির জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছিল। আগের অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তার বদলি ও বিভিন্ন কারণে ইউনিটটিতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এখন আবার নতুন করে টিম গঠন ও কার্যক্রমকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে। তবে পুরো সক্ষমতা ফিরে পেতে কিছুটা সময় লাগবে।

একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে এটিইউতেও। ৫ আগস্টের পর কিছু কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে কাজ করার উদ্যোগ নিলেও বিভিন্ন ধরনের চাপ ও বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এটিইউর একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তীসময়ে ইউনিটটি জঙ্গিবিরোধী কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছিল। তবে ওইসব অভিযানের পর বিভিন্ন ধরনের চাপ ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। একপর্যায়ে অনেক কর্মকর্তা নিজেদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান পরিচালনায় অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেন। ফলে পরে ইউনিটটির তৎপরতা মূলত প্রচলিত অপরাধ দমন কার্যক্রমের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

অতীতে জঙ্গি দমনে কাজ করা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, অতীতে দেশের জঙ্গিবিরোধী বিশেষায়িত ইউনিটগুলো সফলভাবেই একাধিক বড় অভিযান পরিচালনা করেছে এবং উগ্রবাদ দমনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জঙ্গিবাদকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। জঙ্গিদের অনেককে ঢালাওভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, বিষয়টিকে ইগনোর করা হয়েছে। ফলে তারা আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।—অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক

তার ভাষ্য—তখন গোয়েন্দা নজরদারি, অনলাইন মনিটরিং, তথ্য বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের অভিযান নিয়মিত ছিল। কিন্তু এখন সেই ধারাবাহিকতা অনেকটাই কমে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশে যদি আবার উগ্রবাদী তৎপরতার শঙ্কা তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর মূল ফোকাসও সেদিকেই থাকা উচিত।

এ বিষয়ে গত ২৫ এপ্রিল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি ইউনিটের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, আমরা কাজ করছি, ইনশাআল্লাহ আমরা এটি ফেস করতে পারবো। দেশে জঙ্গি বা উগ্রবাদী আছে কি নেই, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করার মতো অবস্থায় এখনই যাওয়া সম্ভব নয় এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও নজরদারি চলমান রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ

নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ কখনো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিল না; বরং ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও আড়ালে বিভিন্ন সময়ে তাদের তৎপরতা চলমান ছিল। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে এবং বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর কার্যক্রমে শিথিলতা তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে এ হুমকি আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, দেশে উগ্রবাদ নতুন করে তৈরি হয়নি, বরং বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সক্রিয় ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রম ছিল। তারা তখন অন্য ফর্মে কাজ করেছে এবং নিজেদের অনেক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নও করতে পেরেছে। তবে এখন রাজনৈতিক সরকার আসায় সেই উদ্দেশ্যগুলো আগের মতো সহজে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী / অতীতে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জঙ্গিবাদ শব্দটি ব্যবহার করা হতো

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জঙ্গিবাদকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। জঙ্গিদের অনেককে ঢালাওভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, বিষয়টিকে ইগনোর করা হয়েছে। ফলে তারা আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

‘অন্যসব অপরাধ মোকাবিলার জন্য পুলিশের সাধারণ ইউনিট তো আছেই। বিশেষায়িত ইউনিটগুলো গঠন করা হয়েছে বিশেষ ধরনের হুমকি মোকাবিলার জন্য। তারা যদি সেই কাজই না করে, তাহলে বুঝতে হবে রাষ্ট্র বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না কিংবা অস্বীকার করছে। সিটিটিসি ও এটিইউ যদি সক্রিয়ভাবে উগ্রবাদ দমনে কাজ না করে, তাহলে ভবিষ্যতে এর দৃশ্যমান প্রভাব দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে দেখা যেতে পারে’—যোগ করেন ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক।

এক দশক আগের সেই বিভীষিকাময় রাত

প্রায় এক দশক আগে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় ‘হোলি আর্টিসান বেকারি’তে সশস্ত্র হামলা চালায় জঙ্গিরা। সেই রাতে ২০ জন নিরীহ মানুষ নির্মমভাবে প্রাণ হারান জঙ্গিদের হাতে। রাতভর চলা সেই জিম্মি পরিস্থিতির অবসান ঘটে পরদিন সকালে, সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে। ওই অভিযানে হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জন জিম্মিকে।

হামলার দায় স্বীকার করে ওই রাতেই বিবৃতি দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। তৎকালীন সরকার আইএসের এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছিল, দেশীয় জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি এই হামলার জন্য দায়ী।

জঙ্গি হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ইতালির নাগরিক ছিলেন নয়জন, জাপানের সাতজন, ভারতের একজন ও বাংলাদেশি তিনজন। সেই রাতে জিম্মিদের মুক্ত করতে অভিযান চালাতে গিয়ে জঙ্গিদের বোমা হামলায় নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। ভয়াবহ এই জঙ্গি হামলায় সেই রাতে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল পুরো দেশ।

নৃশংস সেই হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় করা মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় দুটি ধাপ পেরিয়েছে। এ মামলায় বিচারিক আদালতের পর হাইকোর্টে রায় হয়েছে। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেছেন দণ্ডিত আসামিরা, যা শুনানির অপেক্ষায়।

যা ঘটেছিল সেই রাতে

বিভীষিকাময় সেই রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই সময়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, সাংবাদিকতায় পড়াশোনার তাগিদে সংবাদ দেখা ও শোনার আগ্রহ ছিল অনেক। ওইদিন রাত প্রায় ৯টা ছুঁইছুঁই, তখন টিভির স্ক্রলে লেখা ভেসে এলো—গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা হয়েছে। দেশি-বিদেশি অনেক মানুষ সেখানে আটকা পড়েছে। অনেক গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। হাতে ছিল ওয়ালটনের একটি স্মার্ট মোবাইল, বিষয়টি বিস্তারিত দেখতে ভিজিট করি গুলশানের ঘটনাস্থলে। কিন্তু তখনো জঙ্গি হামলার ঘটনার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, তখন দেখি মিরপুর-১ নম্বরের সি ব্লকের আকবর মসজিদের পাশের একটি দোকান থেকে বের হয়ে রাকিব নামের এক যুবক ফোনকল করেন তার বোনের কাছে। আগ্রহ প্রকাশ করে জানতে চাই—‘আপনার কেউ সেখানে আটকা পড়ছে কি না?’ উত্তরা তিনি বলেছিলেন, ওই রেস্তোরাঁর পাশের একটি ভবনে ভাড়া থাকেন তার বড় বোন।

৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইউনিটটির জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছিল। আগের অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তার বদলি ও বিভিন্ন কারণে ইউনিটটিতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এখন আবার নতুন করে টিম গঠন ও কার্যক্রমকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে। তবে পুরো সক্ষমতা ফিরে পেতে কিছুটা সময় লাগবে।—সিটিটিসি কর্মকর্তার ভাষ্য

‘বড় বোনের ভাষ্যে বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনাটা ছিল এরকম—‘আমাকে আমার ড্রাইভার বললেন, আপা আপনি এখন বেরোবেন না, নিচে গোলাগুলি চলছে। তারপর দেখি আমার ড্রয়িং রুমের জানালার কাচ ফেটে গেল। তারপর থেকে অনবরত গুলির শব্দ শুনতে পাই। এরপর আমার মেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। আমরা সবাই কান্নাকাটি শুরু করি। কারণ খুবই আতঙ্কজনক একটা পরিস্থিতি চলছিলো’—বলছিলেন রাকিব।

আরও পড়ুন

দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার

রাত বাড়ার সঙ্গে ঘটনার বিস্তারও আরও বাড়তে থাকে। দেশ থেকে বিদেশ, সবার চোখ তখন হোলি আর্টিসান রেস্তোরাঁর জঙ্গি হামলার দিকে। কতজন জিম্মি করেছে, কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে—এসব প্রশ্ন যেন ওই রাতে সবার মুখে ও মনের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এরমধ্যে খবর এলো জঙ্গিদের গুলিতে পুলিশের দুই সদস্য মারা গেছে। তখন ভয় আরও বাড়তে শুরু করে। তার মানে জঙ্গিদের সংখ্যা অনেক ও তারা অনেক শক্তিশালী।

ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক এক টুইটে লেখেন—‘পুলিশ ইজ সারাউন্ডিং দ্য এরিয়া, গানফায়ার স্টিল অন’।

পরদিন সকালেই কমান্ডো অভিযান

রাতভর হোলি আর্টিসান রেস্তোরাঁ সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখার পর ২ জুলাই সকাল সাড়ে ৭টায় সেনা, নৌ, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ কমান্ডো দল অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে কমান্ডো বাহিনী অভিযান শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করেন। এসময় বাইরে থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।

সকাল সোয়া ৮টায় ওই রেস্তোরাঁ থেকে প্রথম দফায় নারী ও শিশুসহ ছয়জনকে বের করে আনা হয়। ৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা। ৯টা ১৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে।

সকাল ১০টায় চার বিদেশিসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচজনের মরদেহ পাওয়ার তথ্য জানায় পুলিশ। বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে যৌথ অভিযানে জঙ্গিদের ছয়জন নিহত এবং একজন ধরা পড়েছে বলে নিশ্চিত করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

টিটি/এমকেআর/ এমএফএ