একটি পাসপোর্টের জন্য অপেক্ষা কখনও তিন মাস, কখনও ছয় মাস, আবার কারও ক্ষেত্রে তারও বেশি। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা এখন মালয়েশিয়ায় বসবাসরত শত শত বাংলাদেশি প্রবাসীর জন্য শুধু প্রশাসনিক ভোগান্তি নয় এটি তাদের চাকরি, বৈধ অভিবাসন মর্যাদা, আয়-রোজগার এবং পরিবারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থায় পুরোনো মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি), জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মনিবন্ধন এবং কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের তথ্যের মধ্যে সামান্য অমিল থাকলেই আবেদন আটকে যাচ্ছে। এসব আবেদন বাংলাদেশে আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পুনঃযাচাইয়ের জন্য পাঠানো হচ্ছে। ফলে অনেক আবেদনকারীর পাসপোর্ট মাসের পর মাস ঝুলে থাকছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পাসপোর্ট হাতে না পাওয়ায় অনেক প্রবাসীর ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা নবায়ন আটকে যাচ্ছে। এতে তারা কোনো দোষ না করেও অনিয়মিত অভিবাসীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ সরকার ধাপে ধাপে এমআরপি কার্যক্রম বন্ধ করে ই-পাসপোর্ট চালু করে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার প্রবাসী ই-পাসপোর্টের আবেদন করছেন। যাদের এনআইডি নেই, তাদের জন্মনিবন্ধনের ভিত্তিতে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে।

তবে হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবেদন তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে আটকে যাচ্ছে। অনেক আবেদন আবার ‘মাল্টিপল অ্যাকটিভ’ হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আবেদনকারীদের বয়স, নামের বানান, বাবা-মার নাম, জন্মতারিখ কিংবা স্থায়ী ঠিকানায় সামান্য অমিল থাকলেই আবেদন স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। অতীতে এমআরপি পাসপোর্ট তৈরির সময় যেসব ভুল অজান্তে থেকে গিয়েছিল, এখন সেগুলোই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে আবেদনকারীরা নিজেরাই আগের ভুল সংশোধন করে নতুন তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু নতুন তথ্যের সঙ্গে পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য না মেলায় আবেদন পুনঃযাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশে পাঠাতে হচ্ছে।
হাইকমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংশোধনের জন্য পাঠানো আবেদনগুলোর নিষ্পত্তি অনেক সময় তিন থেকে ছয় মাস, কখনও তারও বেশি সময় নিচ্ছে। অন্যদিকে যাদের তথ্যে কোনো অসঙ্গতি নেই, তারা ২০ দিনের মধ্যেই পাসপোর্ট পাচ্ছেন।
কুয়ালালামপুরের একটি উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক বাংলাদেশি শ্রমিক বলেন, চার মাস আগে আবেদন করেছি। হাইকমিশনে গেলে বলে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশে যোগাযোগ করলে বলে প্রক্রিয়াধীন। মাঝখানে পড়ে আমরা অসহায় হয়ে গেছি। পাসপোর্ট না থাকায় ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন করতে পারছেন না। নিয়োগকর্তাও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারছেন না।
সেলাঙ্গরের এক প্রবাসী বলেন, আগের পাসপোর্টে বাবার নামের বানানে ভুল ছিল। এবার এনআইডি অনুযায়ী ঠিক করেছি। এখন সেই পুরোনো ভুলের কারণেই পাঁচ মাস ধরে নতুন পাসপোর্ট আটকে আছে।
জোহর বাহরুতে কর্মরত এক নির্মাণশ্রমিক বলেন, মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়েও দেশে যেতে পারিনি। টিকিট কেটেও শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি। কারণ নতুন পাসপোর্ট পাইনি।
অন্যদিকে সেরেম্বানে কর্মরত এক প্রবাসী জানান, তার সব তথ্য সঠিক থাকায় মাত্র ২৫ দিনের মধ্যেই তিনি নতুন পাসপোর্ট পেয়েছেন।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনস্যুলার শাখার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, তথ্যগত অসঙ্গতি পাওয়া গেলে আবেদন প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে দ্রুত আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং তথ্য সংশোধনের কাজ বাংলাদেশ থেকেই সম্পন্ন হয়। ফলে কিছু ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগছে।

তিনি বলেন, আবেদন করার আগে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন এবং আগের পাসপোর্টের তথ্য মিলিয়ে নিলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে কাজ করতে হলে পাসপোর্ট, ভিসা এবং ওয়ার্ক পারমিট তিনটিই বৈধ থাকতে হয়।
প্রবাসীরা জানান, নতুন পাসপোর্ট না পাওয়ায় অনেক নিয়োগকর্তা ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের আবেদন করতে পারছেন না। এতে কর্মীরা অনিচ্ছাকৃতভাবে আইনি জটিলতায় পড়ছেন। দীর্ঘসূত্রিতার কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।
এক প্রবাসীর ভাষায়, আমরা কোনো অপরাধ করিনি। সরকারি নিয়ম মেনেই আবেদন করেছি। কিন্তু একটি পাসপোর্টের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিদেশে একজন শ্রমিকের কাছে পাসপোর্ট মানে শুধু একটি বই নয়, তার পরিচয়, বৈধতা এবং জীবিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
মালয়েশিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতাদের মতে, ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থা নিরাপদ ও আধুনিক হলেও বিদেশে থাকা আবেদনকারীদের জন্য আলাদা দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থা না থাকলে সংকট আরও বাড়বে।
একজন কমিউনিটি নেতা বলেন, বিদেশে অবস্থানরত আবেদনকারীদের জন্য বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক ভেরিফিকেশন সেল গঠন করা প্রয়োজন। কারণ একটি পাসপোর্ট আটকে যাওয়া মানে শুধু ভ্রমণে সমস্যা নয়; একজন শ্রমিকের চাকরি, আয় এবং পরিবারের ভবিষ্যৎও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
আরেকজন প্রবাসী সংগঠক বলেন, বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিলম্বের পুরো চাপ বহন করছেন বিদেশে থাকা শ্রমিকরা। অনেক নিয়োগকর্তা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে চান না। এতে চাকরি হারানোর ঘটনাও বাড়ছে।
ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশে থাকা আবেদনকারীদের জন্য পৃথক ও দ্রুত তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মধ্যে রিয়েল-টাইম ডিজিটাল সমন্বয় এবং দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রতিদিন কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনস্যুলার শাখায় ভিড় করছেন অসংখ্য প্রবাসী। সবার মুখে একটাই প্রশ্ন আমার পাসপোর্ট কবে আসবে?
কারও অপেক্ষা দুই মাস, কারও চার মাস, আবার কেউ ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রতীক্ষায়। একটি পাসপোর্টের বিলম্ব তাদের কাছে শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়; এটি প্রবাসজীবনের নিরাপত্তা, বৈধ কর্মসংস্থান এবং পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক কঠিন বাস্তবতা।
প্রবাসীদের প্রত্যাশা, তথ্যগত অসঙ্গতি দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি বিদেশে থাকা আবেদনকারীদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা চালু করা হবে। কারণ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এসব রেমিট্যান্সযোদ্ধার কাছে সময়মতো পাওয়া একটি পাসপোর্ট শুধু ভ্রমণের নথি নয়; এটি তাদের জীবিকা, বৈধতা, মর্যাদা এবং পরিবারের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
এমআরএম








