বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত ধর্ম, বর্ণ, বয়স, পেশা ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধ নীতিমালা-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক একেএম মতিনুর রহমান নীতিমালার পুস্তিকার মোড়ক উন্মোচন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, হাইকোর্টের নীতিমালার আলোকে গত ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত ২৭২তম সিন্ডিকেট সভায় এটি অনুমোদন পায়।

নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, আক্রান্ত, ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগীদের প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া নিরাপদ ও সহজ করা, অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা, বিচারপ্রার্থী বা তার পরিবারের সদস্যদের হয়রানি বা নিগ্রহকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

নীতিমালায় যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের আওতায় শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ও বাইরে অবাঞ্ছিত মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ, কটূক্তি, টিটকারি, চলাফেরার সময় অনুসরণ করে উত্যক্ত করা, চিঠিপত্র বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে হেয় বা উত্যক্ত করার চেষ্টা, যৌন উসকানিমূলক বা বিদ্বেষমূলক কুৎসা রটানো, শ্রেণিকক্ষে অপ্রাসঙ্গিক যৌন বিষয় উত্থাপন করে হয়রানি, যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে চরিত্র হননের চেষ্টা, প্রেমের প্রস্তাবে সম্মতি আদায়ে জোরাজুরি, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণে চাপ বা হুমকি দেওয়া, যৌন কামনা চরিতার্থে কারও শরীরে স্পর্শ করা, ভয়, প্রলোভন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা এবং ধর্ষণের চেষ্টা বা ধর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করে শাস্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে। তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে এবং অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে শিক্ষাকার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হবে।

এছাড়া, অপরাধী শিক্ষার্থী হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী লিখিত সতর্কীকরণ, সেমিস্টার বা শিক্ষাবর্ষের জন্য বহিষ্কার, স্থায়ী বহিষ্কার এবং প্রয়োজন হলে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। অপরাধী শিক্ষক হলে ইনক্রিমেন্ট বন্ধ, অভিযোগকারীকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অবসর বা চাকরিচ্যুতি এবং পুলিশের কাছে হস্তান্তরের বিধানও রয়েছে।

যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক রোকসানা বেগম মিলি বলেন, “নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এই পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া, যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনে বিল বোর্ড আকারে স্থাপনের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন হল ও বিভাগে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।”

পুস্তিকার মোড়ক উন্মোচনকালে উপাচার্য অধ্যাপক একেএম মতিনুর রহমান বলেন, “হাইকোর্ট প্রদত্ত নীতিমালার আলোকে আমাদের এখানে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধকল্পে গঠিত কমিটি আছে এবং সেই কমিটি এই পুস্তিকাটি প্রকাশ করেছেন। আগামী ১ আগস্ট ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশনে তাদের দিয়েই এই পুস্তিকা প্রচারের যাত্রাটা শুরু করব।”

তিনি আরো বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে সতর্ক করার জন্য এ মর্মে বিলবোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে। যিনি কমিটির আহ্বায়ক তাকে ইতোমধ্যেই আমি অনুরোধ করেছি যে, বিভিন্ন বিভাগে একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাতে এটি প্রচার করা হয়। আমি সংশ্লিষ্টদেরকে বলেছি শিক্ষার্থীরা যাতে সহজে রিচ করতে পারে ইমেইল অথবা নাম্বার দেওয়া হবে যাতে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জমা দিতে পারে।”