বিশ্বকাপে আবারো মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। দুই দলের ফুটবলীয় ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত তিনবার ও ইংল্যান্ড একবার বিশ্বকাপ জিতেছে। দুই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরের লড়াই নিয়েও অনেক আলোচনা হচ্ছে। দুই দলের লড়াই শুধু ফুটবলের নয়, ইতিহাস, আবেগ এবং বিতর্কেরও।
বিশ্বকাপ কিংবা প্রীতি ম্যাচ অতীতে অনেকবার মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ১৯৫১ সালে প্রথম দেখা হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা মুখোমুখি হয়েছে ১৪ বার। সেই ইতিহাসে এগিয়ে আছে ইংল্যান্ড — ৬টি জয়, আর্জেন্টিনার ৩টি, আর ৫টি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
বিশ্বকাপে এই দুই দলের দেখা হয়েছে ৫ বার। সেখানে ইংল্যান্ডের জয় ৩টি, আর্জেন্টিনার ১টি, আর একটি ম্যাচ ড্র হলেও টাইব্রেকারে জিতে পরের রাউন্ডে ওঠে আর্জেন্টিনা।
নিচে দুই দলের প্রতিটি ম্যাচের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—
১. ৯ মে ১৯৫১ (প্রীতি ম্যাচ)
ইংল্যান্ড ২-১ আর্জেন্টিনাদুই দলের প্রথম সাক্ষাৎ হয় লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে। ইংল্যান্ড নিজেদের মাঠে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় এবং শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে যায়।
২. ১৪ মে ১৯৫৩ (প্রীতি ম্যাচ)
আর্জেন্টিনা ৩-১ ইংল্যান্ড। বুয়েনস আইরেসে অনুষ্ঠিত ম্যাচে আর্জেন্টিনা প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডকে হারায়। ঘরের মাঠে দারুণ পারফরম্যান্সে ৩-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় আলবিসেলেস্তেরা।
৩. ২ জুন ১৯৬২ (বিশ্বকাপ, গ্রুপ পর্ব)
ইংল্যান্ড ৩-১ আর্জেন্টিনা। চিলি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ড ৩-১ ব্যবধানে জয় পায়। এটি ছিল বিশ্বকাপে দুই দলের প্রথম মুখোমুখি লড়াই।
৪. ২ জুন ১৯৬৪ (প্রীতি ম্যাচ)
আর্জেন্টিনা ১-০ ইংল্যান্ড। বুয়েনস আইরেসে অনুষ্ঠিত ম্যাচে একমাত্র গোলে ইংল্যান্ডকে হারায় আর্জেন্টিনা।
৫. ২৩ জুলাই ১৯৬৬ (বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল)
ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা
এটাই দুই দেশের ফুটবল বৈরিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। জিওফ হার্স্টের গোলে ইংল্যান্ড জয় পেলেও ম্যাচটি ইতিহাসে স্থান পায় আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনের বিতর্কিত বহিষ্কারের জন্য। সে সময় লাল কার্ড চালু না থাকায় রেফারির সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রাত্তিন কয়েক মিনিট মাঠে অবস্থান করেন। মাঠ ছাড়ার সময় ইংল্যান্ডের পতাকা মাড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ র্যামজি আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ‘পশুর দল’ বলে মন্তব্য করেন, যা দুই দেশের বৈরিতাকে আরও তীব্র করে তোলে।
৬. ১৯৭৪ (প্রীতি ম্যাচ)
আর্জেন্টিনা ২-২ ইংল্যান্ডদুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ড্র হয়।
৭. ১৯৭৭ (প্রীতি ম্যাচ)
আর্জেন্টিনা ১-১ ইংল্যান্ড। আরেকটি সমানে সমান লড়াই। দুই দলই একটি করে গোল করে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে।
৮. ১৯৮০ (প্রীতি ম্যাচ)
ইংল্যান্ড ৩-১ আর্জেন্টিনা। ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ইংল্যান্ড সহজ জয় তুলে নেয়।
৯. ২২ জুন ১৯৮৬ (বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল)
আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড
এটি শুধু আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ। ডিয়েগো ম্যারাডোনা মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে করেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুটি গোল।
• প্রথমটি ছিল রেফারির চোখকে ফাঁকি দিয়ে বিতর্কিত সেই হাতের গোল।
• দ্বিতীয়টি ছিল নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে পাঁচজনকে কাটিয়ে করা অবিশ্বাস্য গোল, যেটিকে অনেকেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা গোল বলে মনে করেন।ইংল্যান্ডের হয়ে গ্যারি লিনেকার একটি গোল শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। পরবর্তীতে সেই বিশ্বকাপও জেতে তারা।
১০. ১৯৯১ (প্রীতি ম্যাচ)
ইংল্যান্ড ২-২ আর্জেন্টিনাদুই দলই দুটি করে গোল করে ম্যাচ শেষ করে।
১১. ৩০ জুন ১৯৯৮ (বিশ্বকাপ, শেষ ষোল)
আর্জেন্টিনা ২-২ ইংল্যান্ড(টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডের জয়)
ফ্রান্স বিশ্বকাপের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচ।
• ৬ মিনিটে অ্যালান শিয়ারারের পেনাল্টিতে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড।
• কয়েক মিনিট পর গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার পেনাল্টিতে সমতা ফেরায় আর্জেন্টিনা।
• এরপর মাইকেল ওয়েনের দুর্দান্ত গোল।
• বিরতির আগে হাভিয়ের জানেত্তির অসাধারণ সেট-পিস থেকে সমতা আনে আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে ডেভিড বেকহ্যাম লাল কার্ড দেখেন। অতিরিক্ত সময়েও ফল না বদলালে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেই আর্জেন্টিনা জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে।
১২. ২০০০ (প্রীতি ম্যাচ)
ইংল্যান্ড ০-০ আর্জেন্টিনা। দুই দলের রক্ষণভাগের দৃড়তায় গোলশূন্য ড্র হয় ম্যাচটি।
১৩. ৭ জুন ২০০২ (বিশ্বকাপ, গ্রুপ পর্ব)
ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা। কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টির গোলে জয় পায় ইংল্যান্ড।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে লাল কার্ডের হতাশা কাটিয়ে বেকহ্যামের জন্য এটি ছিল প্রতিশোধের ম্যাচ। অন্যদিকে মার্সেলো বিয়েলসার আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
১৪. ২০০৫ (প্রীতি ম্যাচ)
ইংল্যান্ড ৩-২ আর্জেন্টিনা। সবশেষ দেখায়ও জয় ইংল্যান্ডের। পাঁচ গোলের রোমাঞ্চকর ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে জিতে তারা।
বিশ্বকাপে মুখোমুখি
বছর ফলাফল
১৯৬২- ইংল্যান্ড ৩-১ আর্জেন্টিনা
১৯৬৬ ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা
১৯৮৬ আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড
১৯৯৮ ২-২ (টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয়)
২০০২ ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা
সামগ্রিক পরিসংখ্যান
• মোট ম্যাচ: ১৪
• ইংল্যান্ডের জয়: ৬
• আর্জেন্টিনার জয়: ৩
• ড্র: ৫
২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন অধ্যায়ে পা রাখতে যাচ্ছে। ইংল্যান্ড তাদের পরিসংখ্যানগত আধিপত্য ধরে রাখতে চায়, আর আর্জেন্টিনার লক্ষ্য ১৯৮৬ সালের মতো আরেকটি স্মরণীয় বিশ্বকাপ জয় দিয়ে ইতিহাসে নতুন গল্প লেখা।
আরআর/আইএন








