ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। নাটকীয় এই জয়ের পর উচ্ছ্বসিত আলবিসেলেস্তে শিবির। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ থেকে শুরু করে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও লিয়ান্দ্রো পারেদেস সবাই প্রশংসায় ভাসিয়েছেন দলের পারফরম্যান্স। একই সঙ্গে স্পেনের বিপক্ষে আসন্ন ফাইনালকে কঠিন চ্যালেঞ্জ বলেও সতর্ক করেছেন তারা।

গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ মনে করেন, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের কঠিন পথ পেরিয়েই আর্জেন্টিনা ফাইনালে পৌঁছেছে, ‘গ্রুপ পর্বের পর আমরা যেসব প্রতিপক্ষ পেয়েছিলাম, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তখনই বোঝা যায় বিশ্বকাপ কতটা কঠিন। সেরা দলগুলো না জিতলে পথও কঠিন হয়ে যায়। আজ আমরা এমন একটি দলের মুখোমুখি হয়েছি, যাদের দুই-তিনটি শক্তিশালী একাদশ গড়ার সামর্থ্য আছে। তবু আমরা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছি।’

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেন দিবু। তবে তার মতে, খেলোয়াড়দের কাছে এটি ছিল শুধুই একটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। তিনি আরও বলেন, ‘সমর্থকদের জন্য ম্যাচটি যে বিশেষ ছিল, সেটা আমরা জানতাম। কিন্তু আমাদের কাছে এটি ছিল একটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। আমরা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও যেমন খেলেছিলাম, আজও তেমনই সর্বস্ব দিয়ে খেলেছি।’

ফাইনালের আগে সবাইকে মুহূর্তটি উপভোগ করার আহ্বানও জানান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন গোলরক্ষক, ‘বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা খুব কঠিন, আর জেতা আরও কঠিন। প্রায় অসম্ভব। তাই আগে এই মুহূর্তটা উপভোগ করতে হবে, তারপর ফাইনালের প্রস্তুতি নিতে হবে।’

ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ স্বীকার করেছেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি তাদের কাছেও আবেগের ছিল, ‘মিথ্যা বলব না, আমরা সবাই আর্জেন্টাইন। সমর্থকদের মতো আমরাও এই ম্যাচকে অনুভব করেছি। ম্যাচটির গুরুত্ব জানতাম এবং প্রথম মিনিট থেকেই জয়ের জন্য খেলেছি। কষ্ট করতে হয়েছে, কারণ তারা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরাই আক্রমণ করেছি, নির্ভয়ে খেলেছি এবং জয়ের জন্য লড়েছি।’

ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে নিজের ভাবনা জানিয়েছেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস, ‘আমরা জানতাম এই ম্যাচটি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, আর সেটাই হয়েছে। স্পেন দুর্দান্ত একটি দল। বিশ্বকাপ এমনিতেই কঠিন প্রতিযোগিতা। তাই ফাইনালটাও খুব কঠিন হবে।’

মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার মনে করেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটি ছিল আর্জেন্টিনার অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স, ‘আমার মনে হয় এটি ছিল বিশ্বকাপে আমাদের অন্যতম সেরা ম্যাচ। আমরা রক্ষণে আরও আক্রমণাত্মক ছিলাম, কিছুটা বেশি ঝুঁকি নিয়েছি এবং সফলও হয়েছি। প্রথম গোল হজম করার পরও আমরা দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছি।’

স্পেনকে নিয়েও তিনি বলেন, ‘স্পেন দারুণ একটি দল। আমরা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আমার মনে হয় এটি অসাধারণ একটি ফাইনাল হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, দুই দলই সুন্দর ফুটবল খেলতে চায়।’ লাউতারো মার্তিনেজের ভূয়সী প্রশংসাও করেন ম্যাক অ্যালিস্টার, ‘লাউতারো আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আক্রমণে নয়, রক্ষণেও সে অবদান রাখে। একজন স্ট্রাইকার গোল করেই উজ্জ্বল হয়, আর আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সে সেটাই করেছে।’

সেমিফাইনালে সমতাসূচক দুর্দান্ত গোল করা এনজো ফার্নান্দেজ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, ‘বল জালে যাওয়ার মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে পারবো, এটা অবিশ্বাস্য। কিছুদিন ধরে আমি নিজের ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু ঈশ্বর আমাকে এই মুহূর্তটি দিয়েছেন, যা তার পরিকল্পনারই অংশ।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাঠের বাইরে যারা থাকে, তারাও কষ্টটা অনুভব করে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে আমি বেঞ্চে বসে আবেগে কেঁদেছিলাম। এমন মুহূর্তের অংশ হতে পারা সত্যিই আশীর্বাদের।’ নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে আত্মসমালোচনাও করেন চেলসি মিডফিল্ডার, ‘আমার মনে হয় আজকের পথ চলাটা নিখুঁত ছিল। আমি নিজের ফুটবল নিয়ে খুশি ছিলাম না, ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাই আজ চরিত্র দেখানোটা জরুরি ছিল। আজ আবার সেই তরুণ এনজোকে ফিরে পেয়েছি, যে একদিন জাতীয় দলের হয়ে এমন মঞ্চে খেলার স্বপ্ন দেখত। এই জার্সি পরে খেলতে পারা আমার জন্য বিশাল গর্ব।’

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় জয়ের পর আর্জেন্টিনা শিবিরে এখন আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। তবে খেলোয়াড়দের কণ্ঠে স্পষ্ট — উচ্ছ্বাস থাকলেও লক্ষ্য এখন একটাই, স্পেনকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের করে নেওয়া।

আরআর/আইএন