এক সময় গতি, ড্রিবলিং আর বিস্ফোরক আক্রমণে প্রতিপক্ষকে বিধ্বস্ত করতেন লিওনেল মেসি। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সে এসে তিনি আর সেই আগের মেসি নন; তবু এখনও বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলারদের একজন।
২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক যেন প্রমাণ করে দিয়েছেন, ফুটবলে আধিপত্য ধরে রাখতে সবসময় দ্রুত দৌড়ানোর প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন অসাধারণ মস্তিষ্ক, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং নিখুঁত সময়জ্ঞান।
এবারের বিশ্বকাপে নিজের ষষ্ঠ আসরে খেলছেন মেসি, যা পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও মেক্সিকোর গিয়ের্মো ওচোয়ার সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়েও এগিয়ে রয়েছেন।
তবে এবারের মেসিকে আলাদা করেছে তার খেলার ধরন। আগের মতো নিরন্তর দৌড়ানোর বদলে তিনি ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করছেন বুদ্ধিমত্তা দিয়ে।
পরিসংখ্যান বলছে, এবারের বিশ্বকাপে মেসি মাঠে যে দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, তার ৪৭ শতাংশই হেঁটে, যা টুর্নামেন্টের সব আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এছাড়া প্রতি ৯০ মিনিটে তিনি গড়ে মাত্র ৮.২ কিলোমিটার দৌড়েছেন, যা আর্জেন্টিনার অন্তত ২০ মিনিট খেলা সব আউটফিল্ড ফুটবলারের মধ্যে সবচেয়ে কম।
স্প্রিন্টের সংখ্যাও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। চার বছর আগে যেখানে প্রতি ম্যাচে গড়ে ৫.৩টি স্প্রিন্ট দিতেন, এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২.৭-এ।
তবুও আক্রমণে তার প্রভাব এতটুকুও কমেনি। এবারের বিশ্বকাপে তিনি ৩৩টি শট নিয়েছেন এবং ২১টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন। অর্থাৎ মোট ৫৪টি আক্রমণাত্মক অবদান, যা ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার পর সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের মতে, মেসি আসলে নিজের পতনের সঙ্গে মানিয়ে নেননি, বরং নিজেকে এমনভাবে বদলেছেন যাতে এখনও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই থাকে। গতি কমেছে, কিন্তু বেড়েছে খেলা পড়ার ক্ষমতা, পাসের নিখুঁততা এবং সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকার দক্ষতা।
এ কারণেই গত ১৫টি বিশ্বকাপ ম্যাচে তিনি ১৬ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করেছেন। এই সময়ে কেবল পোল্যান্ডই একমাত্র দল, যারা তাকে গোল বা অ্যাসিস্ট-দুটোর কোনোটিই করতে দেয়নি।
২০০৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার হয়ে অভিষেকের সময় ডান প্রান্তের ড্রিবলার হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন মেসি। এরপর ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্তত পাঁচবার নিজের খেলার ধরন বদলেছেন। সেই বিবর্তনের সর্বশেষ রূপই এখন দেখা যাচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মিয়ামির জার্সিতে-যেখানে কম দৌড়িয়েও তিনি ম্যাচের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হয়ে উঠছেন।
বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্যে আর্জেন্টিনা এখন আরেকটি ইতিহাসের অপেক্ষায়। আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে আগের মতোই রয়েছেন লিওনেল মেসি-যিনি প্রমাণ করে চলেছেন, ফুটবলে গতি নয়, মেধাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
আরআর/এমএমআর








