২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা ও ইউরোর ফাইনাল হয়েছিল একই তারিখে। রাতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেন শিরোপা ঘরে তোলার কয়েকঘণ্টা পর সকালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। পরদিন বাংলাদেশের বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমই দুই চ্যাম্পিয়ন দলের ফিনালিসিমা নিয়ে সংবাদ প্রচার করেছিল। তবে তখনও নিশ্চিত হয়নি, কবে নাগাদ হতে পারে দুই চ্যাম্পিয়ন দলের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ।

পরে ম্যাচটির সূচি নির্ধারিত হয় চলতি বছরের ২৭ মে। দুই দেশের সমর্থকরা ছাড়াও পুরো ফুটবল বিশ্বই দিন-তারিখ মুখস্থ করে রাখলেও সেই ম্যাচ আর মাঠে গড়ায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাতিল হয় ম্যাচ। ভেন্যু ও সূচি বদলানোর চেষ্টা চালায় উয়েফা। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি আর্জেন্টিনা রাজি না হওয়ায়। শেষ পর্যন্ত উয়েফা বাতিল করতে বাধ্য হয় ফিনালিসিমা।

লিওনেল মেসি ও লামিনে ইয়ামালের লড়াই তাই আর দেখা হয়নি। তবে ফিনালিসিমা নামে যে লড়াই দেখতে এতটা দিন মুখিয়ে ছিল ফুটবলভক্তরা, কাকতালীয়ভাবে সেটি এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে, মাত্র আর তিন দিন পরই।

শুধু যে ভক্ত ও সমর্থকরাই মুখিয়ে ছিলেন বিষয়টা এমন নয়। বিশ্বকাপ চলাকালীন স্পষ্ট হওয়া গেছে দুই দলের খেলোয়াড়রাই একে-অপরের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায়। মেসির বিপক্ষেই ফাইনাল খেলতে চাওয়ার কথা আগেই জানিয়েছিলেন লামিনে ইয়ামাল ও পেদ্রি। আখ্যা দেন সেই ফাইনালকে স্বপ্নের ফাইনাল হিসেবেও।

মেসির সাবেক ক্লাব বার্সেলোনার সতীর্থ পেদ্রি বলেন,‘এটা দারুণ এক স্বপ্ন হবে। কারণ এর অর্থ হবে আমরা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছি। সেটি অবশ্যই খুব ভালো একটি ব্যাপার হবে।’

একইভাবে মেসির ভক্ত হিসেবে ফাইনালে জার্সি পাওয়ার স্বপ্নের কথাও জানান ইয়ামাল। স্প্যানিশ এক সংবাদমাধ্যমে ‘র‌্যাপিড ফায়ার’ অনুষ্ঠানে ইয়ামালের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কোন খেলোয়াড়ের সঙ্গে জার্সি বদল করতে চান? ১৮ বছর বয়সী লামিনের উত্তর, ‘মেসি।’ আরেক প্রশ্নে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, স্পেন যদি ফাইনালের টিকিট পায় তাহলে প্রতিপক্ষ হিসেবে কাকে দেখতে চান? স্পেন তারকার উত্তর, ‘আর্জেন্টিনা।’

আরও একধাপ এগিয়ে ফাইনালে বাইসাইকেল গোল করে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দলকে চ্যাম্পিয়ন করার স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন গাভি কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বকাপের ফাইনালে জয়সূচক গোল করার স্বপ্ন দেখি। তবে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো, ফাইনালে একটি নিখুঁত বাইসাইকেল কিকে গোল করা। আশা করি একদিন সেটা সত্যি হবে। আর প্রতিপক্ষ হিসেবে আমি আর্জেন্টিনাকেই চাই, কারণ সেখানে খেলেন লিওনেল মেসি।’

১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে আসা স্পেনের সামনে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। স্প্যানিশদের লক্ষ্য দ্বিতীয় শিরোপা আর আর্জেন্টিনার লক্ষ্য টানা দ্বিতীয় ও সবমিলিয়ে চতুর্থ শিরোপা। দুই দলই রয়েছে দারুণ ছন্দে। বিশেষ করে স্পেনের গোলকিপার এখন পর্যন্ত এই বিশ্বকাপে গোল হজম করেছেন মাত্র একটি। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলে জয়ের ম্যাচে একটি গোল হজম করেন তিনি। ৬৪৯ মিনিট কোনো গোল হজম না করার নতুন রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি বিশ্বকাপে।

অন্যদিকে, স্পেনের জন্য আতঙ্কের নাম হতে যাচ্ছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। চলমান আসরে এখন পর্যন্ত ৮টি গোল করার পাশাপাশি করেছেন ৪টি অ্যাসিস্টও। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে টানা ১৩ ম্যাচে গোল অথবা অ্যাসিস্ট করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন তিনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টও তার নামের পাশে। যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২টি। যার ১০টিই এসেছে নকআউটে।

বরাবরই সব দলের জন্য তিনি বিরাট আতঙ্ক। খুব কাছ থেকে স্প্যানিশ ফুটবলকে চেনা মেসির। তাই তো ফাইনালে উঠেই হুঙ্কার দিয়েছেন তিনি, ‘স্পেন অসাধারণ দল। তাদের দারুণ খেলোয়াড় আছে, খেলার ধরনও দুর্দান্ত। আমি দলটিকে খুব ভালো করেই চিনি। তারা যেভাবে খেলে, সেই ধরনের ফুটবল আমি বহু বছর খেলেছি। বার্সেলোনায় থাকার সময় তাদের অনেক খেলোয়াড়ের বিপক্ষে খেলেছি। তাই এটি অবশ্যই একটি বিশেষ ম্যাচ, কারণ এটি বিশ্বকাপের ফাইনাল।’

মেসি ছাড়াও এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজ, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ,ম্যাক অ্যালিস্টার ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজরাও মাঠে রাখছেন দুর্দান্ত ভূমিকা। তাই মেসি ছাড়াও বাকিদের নিয়েও ভাবতে হবে স্প্যানিশদের। দলগতভাবে যেভাবেই আর্জেন্টিনা খেলছে এবং বারবার পিছিয়ে পড়েও জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ছে তাতে স্পেনের আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

দুই দলের কোচও প্রতিপক্ষ হিসেবে একে-অপরকে চেয়েছেন। দুই কোচের মধুর সম্পর্কটাও বেশ পুরোনো। আর সেই বন্ধুত্বের কারণে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে পা রেখেই আর্জেন্টিনার অপেক্ষায় ছিলেন স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে, ‘স্কালোনির সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের কারণে আমি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে চাই।’ বিশ্বকাপের মাঝপথে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে লিওনেল স্কালোনিও চেয়েছেন স্পেনের মুখোমুখি হতে ফাইনালে, ‘স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল খেলতে হলে আমি আজই চুক্তিতে সই করতে রাজি আছি।’

সেমিফাইনালে ২-১ গোলে জয় ছাড়াও কোয়ার্টার ফাইনালে অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে দুই গোল করে ৩-১ ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেয়ে সেমিতে ওঠে মেসির আর্জেন্টিনা। শেষ ষোলোতে ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পরও মেসির ১৩ মিনিটের ঝলকে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখে আর্জেন্টিনা। শেষ ৩২-এর ম্যাচেও অতিরিক্ত সময়ে জিতে কেপ ভার্দেকে বিদায় করেছিল স্কালোনির শিষ্যরা। বারবার এই ফিরে আসার গল্পটা বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপুন ধরিয়ে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে দুই দল এখন পর্যন্ত ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে। সেখানে দুই দলই জিতেছে ৬টি করে ম্যাচ, দুটি ম্যাচ হয়েছে ড্র। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের দেখা হয়েছে মাত্র একবার ১৯৬৬ সালে। গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচে লুইস আরতিমের জোড়া গোলে স্পেনকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই ১৯৬৬ সালের পর দীর্ঘ ৬০ বছর পর দুই দলের আবারও দেখা হচ্ছে বিশ্বকাপে। তবে একেবারে হাইভোল্টেজ ম্যাচ ফাইনালে।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরোপার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে হাসে বিজয়ের হাসি, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

আইএন/এমএমআর