ম্যাচ তখন শেষ, ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেছে আর্জেন্টিনা। গ্যালারি থেকে ভেসে আসছে, ‘লিও মেসির হাত ধরে, আমরা সবাই বিজয়যাত্রায় যাচ্ছি।’ মেসির নজর এড়ায়নি সেটা, গ্যালারির দিকে দুই হাত তুললেন, এরপর সতীর্থদের দিকে আঙুল দেখিয়ে স্পষ্ট করে দিলেন বার্তা-‘শুধু আমি নই, আমরা সবাই।’

এই যে বিশ্বকাপে টানা ৪ ম্যাচে এমন প্রত্যাবর্তন, এর পেছনে এই লাইনটার মাহাত্ম্য অনেক অনেক বেশি। বাইরে বিশ্বতারকা, কিন্তু দলে বাকিদের কাছে বড় ভাই, বন্ধু। এই মেসির জন্য সতরার্থা পাগল হবে, মাঠে নিজেদের জীবন বাজি রাখবে এটাই তো স্বাভাবিক!

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ, বারবারই আলোচনায় চলে আসেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংলিশদের বিপক্ষে এক হাতে জিতিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে। সময় যেন নিজেই দুই ভিন্ন যুগকে এক সুতোয় গেঁথে দিল। বুধবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লিওনেল মেসির উদযাপনের দৃশ্য অবিকল ফিরিয়ে আনলো ৪০ বছর আগের ম্যারাডোনাকে। একটি ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা স্টেডিয়ামে, অন্যটি মেক্সিকোতে। ভেন্যু আলাদা, প্রজন্ম আলাদা, কিন্তু প্রতিপক্ষ একই-ইংল্যান্ড। পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে বলতে গেলে একাই টেনে তুললেন মেসি।

প্রথমার্ধটা মেসির জন্য ছিল কঠিন। ইংল্যান্ডের চাপে তিনি ছিলেন কার্যত খোলসবন্দি। বল পেতে লড়াই করতে হয়েছে, ফাঁকা জায়গা খুঁজতে হয়েছে, ফাউল আদায় করতে হয়েছে, এমনকি কিছু ব্যক্তিগত দ্বৈরথেও পিছিয়ে পড়তে হয়েছে, বিশেষ করে এলিয়ট অ্যান্ডারসনের বিপক্ষে। ইংল্যান্ড গোল করার আগ পর্যন্ত ম্যাচের চিত্রটা ছিল প্রায় একই। কিন্তু স্কোরলাইন প্রতিকূলে যেতেই লিওনেল স্কালোনির দল দেখিয়েছে তাদের চরিত্র।

jagonews

তারা জয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আরও বেশি খেলোয়াড়কে আক্রমণে তুলে এনে এবং লাউতারো মার্টিনেজকে হুলিয়ান আলভারেজের সঙ্গী হিসেবে মাঠে নামিয়ে, মেসি আবার ডান প্রান্তে সেই পরিচিত জায়গা খুঁজে পেলেন-যেমনটা তিনি মিশরের বিপক্ষেও করেছিলেন। ফলও আসলো একই। মেসি রাইট উইংয়ে আসতেই প্রচন্ড দ্বিধায় পড়ে গেলেন ইংলিশ ডিফেন্ডাররা।

তাদের সামনে তখন কঠিন এক সিদ্ধান্ত-তারা কি মেসিকে অনুসরণ করে নিজেদের অবস্থান ছেড়ে বেরিয়ে আসবে, নাকি নিজেদের জায়গাতেই স্থির থাকবে? মেসির দিকে এগোলে লাউতারো কিংবা অন্য দৌড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের জন্য ফাঁকা চ্যানেল তৈরি হতো। আর অবস্থান ধরে রাখলে আনমার্কড মেসি এক নিখুঁত পাসেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডাররা মেসিকে অনুসরণ করেই বেরিয়ে এলেন। আর সেই ফাঁকা জায়গাটাই কাজে লাগালেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

ডান প্রান্তে স্পেস পেয়েই বেরিয়ে এলো তার সেরা ফুটবল, এলো দুটি অ্যাসিস্ট। প্রথমটি ছিল এনজো ফার্নান্দেজের জন্য। দেখতে সহজ মনে হলেও, অসংখ্য পায়ের ফাঁক গলে সেই বল থেকে গোল আদায় করা মোটেও সহজ ছিল না।

দ্বিতীয় অ্যাসিস্টটি ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। মেসি একসঙ্গে দুই প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে বোকা বানালেন এবং একই মুহূর্তে বুঝে ফেললেন ঠিক কোথায় আছেন লাউতারো। দুই ইংলিশ সেন্টারব্যাকের মাঝখানে, আর জর্ডান পিকফোর্ডের সামনে, যিনি কয়েক মুহূর্ত আগেও ছিলেন দুর্ভেদ্য। মেসি তো বাঁ পায়ের খেলোয়াড় বলেই পরিচিত। অথচ সেই তথাকথিত দুর্বল ডান পায়েই তিনি তুললেন এমন এক নিখুঁত ক্রস, যা লাউতারোর শুধু জালে পাঠিয়ে দেওয়াই বাকি ছিল। অনেক স্বাভাবিক ডান পায়ের ফুটবলারের পক্ষেও এমন পাস দেওয়া সহজ নয়!

jagonews

সর্বোচ্চ প্রত্যাশিত অ্যাসিস্ট (০.৭৬), সর্বাধিক দুই অ্যাসিস্ট, দুটি বিগ চান্স তৈরি, চারটি কী পাস, সর্বোচ্চ ৯টি সফল ড্রিবল এবং মাটিতে হওয়া দ্বৈরথে ১২টি জয়-সবখানেই ম্যাচের সেরা ছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই, ম্যাচ শেষে সর্বোচ্চ ৮.০ সোফাস্কোর রেটিংও উঠেছে তার নামের পাশেই।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সামাজিক মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ঘুরে বেড়ানো ভিডিওগুলোর একটি ছিল ম্যারাডোনার একটি পুরোনো সাক্ষাৎকার। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে এক সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কীভাবে ইংল্যান্ডকে মোকাবিলা করা উচিত? উত্তরে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘বল মাটিতেই রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে-যেভাবে আমরা আর্জেন্টাইনরা সবসময় খেলি। প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড বলে আমাদের খেলার ধরন বদলানোর কোনো কারণ নেই।’

দ্বিতীয়ার্ধে মেসি নেতৃত্ব দিলেন, আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলল সাহসী ও প্রতিভাবান একটি দল। স্কালোনির আর্জেন্টিনা যেন নিজেদের সেরা রূপে ফিরে গেল। ইংল্যান্ড যখন নিজেদের রক্ষণে গুটিয়ে নিল, তখন আর্জেন্টিনা এমন সব ফাঁক খুঁজে বের করল, যা আগে চোখেই পড়ছিল না। নিখুঁত পাস, ড্রিবল আর বক্সে ঢুকে পড়া-প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফুটে উঠল তাদের আলাদা মান।

১-০ পিছিয়ে থাকার সময় মনে হচ্ছিল, সমতায় ফিরতে শুধু ভাগ্য আর পোস্টই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সমতা ফেরার পর পরিষ্কার হয়ে গেল, আর্জেন্টিনা ক্রমেই আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তাদের ফুটবল এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেল, যা আর আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। কাতারে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনাল কিংবা ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে যেভাবে খেলেছিল, ঠিক সেই চেনা সত্তাটাই যেন আবার ফিরে পেল তারা।

jagonews

আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ আর কোপা আমেরিকা মিলিয়ে টানা ৩ ফাইনাল হেরেছেন মেসি। কিন্তু কখনোই কোনো সতীর্থ, কোচকে নিয়ে নেতিবাচক কথা বলেননি। কষ্টে, দুঃখে অবসরও নিয়েছিলেন, পুরো বিশ্বের ডাকে ফিরে এসেছেন। ফেরার পর ২০১৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বিদায় নিয়েছে শেষ ষোলো থেকেই। বছর তিনেক পর কোপা জিতে শুরু, এরপর মেসি শুধু আর্জেন্টিনাকে জিতিয়েই যাচ্ছেন। খুব গর্ব করে বলেন, আর্জেন্টিনার এই দলের কেউ তাকে কখনো হতাশ হতে দেয় না। আসলে পুরো দলটাই মেসির পাগলা ভক্ত! ম্যাচ শেষে তাকে কাঁধে করে নাচেন, মাঠের ভিতর তার জন্য নিজেদের জীবনও বাজি রাখেন।

এই বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে সতীর্থদের পাস দেওয়া না দেওয়া নিয়ে নানা চর্চা হয়েছে। তার সঙ্গে দলের বাকিদের রসায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ আছে, রোনালদো বড় তারকা হিসেবে নিজেদের অহম বজায় রাখেন, বাকিদের সঙ্গে মিশতে পারেন না। এখানেই লিওনেল মেসি ব্যতিক্রম, সেই বার্সেলোনায় নেইমার-সুয়ারেজ থেকে আর্জেন্টিনায় আলভারেজ বা লাউতারো সবার কাছেই মেসি বড় তারকার থেকে বড় ভাই হয়েছেন বেশি।

বুধবার ইংলিশ বধের পরও সেটাই দেখা গেলো আরও একবার। শেষ বাঁশি বাজার পর মেসি তাড়াহুড়ো করে উদযাপন করেননি। তিনি গান গেয়েছেন, সতীর্থদের জড়িয়ে ধরেছেন, আর দর্শকদের ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছেন-শুধু তাকে নয়, পুরো দলকেই অভিনন্দন জানাতে। এরপর আটলান্টার ঘাসে বসে কিছুক্ষণ উপভোগ করেছেন মুহূর্তটি। ৩৯ বছর বয়সে তিনি খেলতে যাচ্ছেন নিজের তৃতীয় ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে জার্মানির কাছে হারের কষ্ট যেমন দেখেছেন, তেমনি লুসাইলে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার উচ্ছ্বাসও অনুভব করেছেন।

jagonews

‘টানা দুটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলাটা অবিশ্বাস্য। এই দলটা অসাধারণ। আজ যখন পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছিল, তখনও আমরা বিশ্বাস হারাইনি। আমরা চেষ্টা থামাইনি। আমরা আমাদের ফুটবল খেলেছি। পিছিয়ে পড়ার পর আমরা ওদের নিজেদের অর্ধে আটকে রেখেছিলাম। আমরা ভীষণ আনন্দিত,’ ম্যাচ শেষে বলেছিলেন মেসি।

ফাইনালে কী হবে, সেটা সময়ই বলবে। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আরেকবার প্রমাণ হয়ে গেল-আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু লিওনেল মেসি নন, বরং এমন এক সংস্কৃতি যেখানে অধিনায়ক বিশ্বতারকা হয়েও সবার আগে সতীর্থ। আর হয়তো সেই কারণেই এই দলটি তার জন্য শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত লড়তে জানে। এ কারণেই মেসি প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে চলেছেন কীভাবে বাইরে বিশ্বতারকা হয়েও দলের ভেতর বড় ভাই, বন্ধু হয়ে মিশে যেতে হয়।

এসকেডি/এমএমআর