ইরাক সরকারের সঙ্গে প্রায় ৬০০০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের ৪৮ টি চুক্তি ও অংশীদারিত্বে সই করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানি। এসব চুক্তির মধ্যে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথে তেল রপ্তানির অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের চেম্বার অব কমার্সে স্বাক্ষরিত এসব চুক্তিতে জ্বালানি খাত ছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তবে, বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির কার্যকর বিকল্প তৈরি হতে এখনও বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে। কারণ, নতুন তেল পাইপলাইন নির্মাণে অন্তত আড়াই বছর সময় লাগে এবং এসব পাইপলাইন একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে যাবে।
হরমুজে উত্তেজনা, তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান একাধিকবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার চেষ্টা করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাসের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ ডলারে পৌঁছায়। যুদ্ধ শুরুর আগে এর দাম ছিল প্রায় ৬৭ ডলার। এপ্রিলের শুরুতে এটি ১১০ ডলারেরও বেশি হয়েছিল, পরে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা কমলেও নতুন করে সংঘাত বাড়ায় আবার দাম বাড়তে শুরু করেছে।
‘হরমুজকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে’

তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত থমাস ব্যারাক বলেন, নতুন পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে যার ফলে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অনেকটাই কমে যাবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার হিউস্টনে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি ফালাহ আল-জায়েদি শেভরনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং কোম্পানিটিকে ইরাকে বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণ ও দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) এক বক্তব্যে আল-জায়েদি বলেন, ইরাকের অর্থনীতি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদার নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদার চায়।

শেভরনের তিনটি চুক্তি
শেভরন ইরাক সরকারের সঙ্গে তিনটি পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। কোম্পানিটির করপোরেট বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান জেক স্পিয়ারিং জানান, এর মধ্যে দুটি চুক্তির লক্ষ্য হলো তেল উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং তৃতীয়টি নতুন একটি পাইপলাইনে বিনিয়োগ করা।এটি ইরাকের জন্য বিশ্ববাজারে আরেকটি রপ্তানি পথ তৈরি করবে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে উন্নয়নাধীন সাতটি আঞ্চলিক পাইপলাইন ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে যে পরিমাণ তেল পরিবহন হয়, তার প্রায় ৬০ শতাংশ বহন করতে সক্ষম হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, তখন এসব পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন সম্ভব হবে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হতো।
আরও পড়ুন>>
তেল রপ্তানিতে হরমুজের বিকল্প পথ গড়ছে সিরিয়া-ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্র
সিরিয়া হয়ে বিকল্প রপ্তানি পথ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরুর পর তেলসমৃদ্ধ ইরাক নিজেকে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে দেখতে শুরু করে। এদিকে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে নিজেকে একটি বিকল্প জ্বালানি ট্রানজিট রুট হিসেবে তুলে ধরছে সিরিয়া।

হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় কিছু তেল বর্তমানে ট্রাকে করে ইরাক থেকে সিরিয়ায় নিয়ে গিয়ে বানিয়াস বন্দর হয়ে ইউরোপে পাঠানো হচ্ছে। এপ্রিল মাসে এক দশকের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর উত্তর ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় চালু করা হয়েছে, যা জ্বালানি রপ্তানির নতুন পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে, স্থলপথে এভাবে তেল পরিবহন সমুদ্রপথের তুলনায় ব্যয়বহুল ও কম কার্যকর। পরিকল্পিত নতুন পাইপলাইন বাস্তবায়িত হলে ইরাক থেকে সিরিয়া ও তুরস্ক হয়ে অনেক বেশি পরিমাণ তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
সূত্র: দ্য নিউ আরব/আল-জাজিরা
কেএম








