বিশ্বকাপ এলেই নানা রকম গল্প ডানা মেলে। অখ্যাত কেউ বিখ্যাত হয়ে যান মুহূর্তেই। হুট করেই ইতিহাসে নাম লেখায় কোনো কোনো দল। এবারের আসরেই কেপ ভার্দে যেমন, ৫ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যার দেশটি প্রথমবার বিশ্বকাপে এসে খেলছে নকআউটেও।

তবে আনন্দের সঙ্গে অনেক বেদনার গল্পও লেখা হয় বিশ্বকাপে। কারও যখন উদ্‌যাপনের আতিশয্য, তখন কেউ কেউ ভাগ্যের নির্মমতায় অশ্রুসিক্ত হয়ে বিদায় নেন টুর্নামেন্ট থেকে। এবারের বিশ্বকাপে সেই দলটা যে ইরান, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবারে আসরে তাদের যা কিছুর ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, ফুটবল ইতিহাসেই এমন গল্প কমই আছে।

টুর্নামেন্টে বল মাঠে গড়ানোর আগেই একের পর এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে ইরানকে। সব বাধা পেরিয়ে নকআউট পর্ব প্রায় মুঠোয় নিয়ে এলেও ইরানকে শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকেই।

গ্রুপ পর্বে একটি ম্যাচও না হেরেও কেবল গোল ব্যবধানের মারপ্যাঁচে ইরানকে বিদায় নিতে হলো বিশ্বকাপ থেকে। তাদের বিদায়ের গল্পগুলোই দেখুন…

শেষ মুহূর্তে গোল বাতিল

প্রথম দুই ম্যাচে নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়ামের সঙ্গে ড্র করার পর মিসরের বিপক্ষে ম্যাচে ইরানের সমীকরণটা স্পষ্ট ছিল। জিতলে সরাসরি তারা চলে যেত শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে।

ম্যাচের শুরুতেই গোল হজম করে পিছিয়ে পড়লেও দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় ইরান। মেহদি তারেম পেনাল্টি মিস করলেও রামিন রেজাইয়ানের চমৎকার ফিনিশিংয়ে সমতায় ফেরে ইরান। ১–১ গোলে সমতা থাকার পর খেলা গড়ায় দ্বিতীয়ার্ধের অতিরিক্ত সময়ে। ঠিক তখনই জটলার ভেতর থেকে দারুণ এক শটে বল জালে জড়িয়ে দেন শোজায়ে খলিলজাদেহ।

অফসাইডে বাতিল হয়ে যায় এই গোলটি

গোলের পর শুরু হয় তাঁর বাঁধভাঙা উদ্‌যাপন। জার্সি খুলে, চোখে সানগ্লাস পরে ক্যামেরার সামনে পোজ দেন খলিলজাদেহ। সেই উদ্‌যাপনের জন্য হলুদ কার্ড দেখলেও গোলটি পরে অফসাইডে বাতিল হয়! প্রতিপক্ষের শেষ ডিফেন্ডারের চেয়ে খলিলজাদেহের পায়ের আঙুল সামান্য একটু এগিয়ে ছিল, ব্যবধানটা ছিল খুবই সামান্য।

মিসরের বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত ১–১ গোলে ড্র করে ইরান। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যেতে পারবে কি না, ইরানের সেই ভাগ্য ঝুলে থাকে অন্যদের ম্যাচের ফলের ওপর।

৯৬ মিনিটের গোলে স্বপ্নভঙ্গ

শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে ওঠার জন্য ইরানের সামনে সমীকরণ ছিল তিনটি। ক্রোয়েশিয়া–ঘানা ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার হার তাদের জন্য পরের পর্বের দরজা খুলে দিতে পারত। কিন্তু ২–১ গোলে ম্যাচটা জিতে নেয় ক্রোয়েশিয়া।

এরপর উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ডিআর কঙ্গোর হারও তাদের তুলে দিতে পারত শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে। ওই ম্যাচে প্রথমার্ধ পর্যন্ত এগিয়ে ছিল উজবেকিস্তানই। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ৩ গোল করে ৩–১ ব্যবধানের জয়ে পরের পর্বে জায়গা করে নেয় তারা।

উজবেকিস্তানকে হারিয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করে ডিআর কঙ্গো

নিজেদের ভাগ্য জানতে ইরানকে অপেক্ষা শুরু হয় গ্রুপ পর্বের একেবারে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত। আলজেরিয়া বনাম অস্ট্রিয়ার ম্যাচটি শুধু ড্র না হলেই তারা নকআউটে চলে যেত।

রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের পর ২–২ সমতায় শেষের পথেই ছিল ম্যাচটি। তখন হয়তো সব আশাই ছেড়ে দিয়েছে ইরান। কিন্তু হুট করে ৯৩ মিনিটে রিয়াদ মাহরেজের এক দুর্দান্ত গোলে এগিয়ে যায় আলজেরিয়া। তাঁর এ গোলে স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি পৌঁছে যায় ইরানও। কিন্তু নাটকের তখনো বাকি ছিল। গোল শোধে মরিয়া হয়ে অলআউট আক্রমণে যায় অস্ট্রিয়া। আর একদম শেষ সেকেন্ডে সাশা কালাদজিচের বুলেট হেডে সমতায় ফেরে তারা। শেষ মুহূর্তে আবার স্বপ্নভঙ্গ হয় ইরানের।

আয়োজক দেশের ‘অন্যায়’ আচরণ

ইরান যে এত সব প্রতিকূলতার মধ্যেও নকআউটের এত কাছে যেতে পেরেছিল, সেটাই অনেকের কাছে বড় বিস্ময়। কারণ, মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের লড়াইটাই তাদের জন্য বেশি কঠিন ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান রাজনৈতিক সংঘাতের আবহেই এই বিশ্বকাপ খেলতে হয়েছিল তাদের। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই তাদের মূল অনুশীলন ক্যাম্প অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় নিয়ে যেতে হয়। টুর্নামেন্টজুড়েই তাদের ওপর ছিল কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা।
ভিসার শর্ত অনুযায়ী, প্রথম দুটি ম্যাচের জন্য ইরান কেবল ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পায় আর ম্যাচ শেষ হওয়ার দিনই তাদের আবার দেশটি ছেড়ে যেতে হয়।

ম্যাচের দিন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি ছিল না ইরানের

ইরানের কোচ ঘালেনোই ক্ষোভ উগরে দিয়ে ইরানকে এই টুর্নামেন্টের ‘সবচেয়ে নিপীড়িত’ দল হিসেবে আখ্যা দেন। তাঁর দাবি, দলকে প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় থেকে ‘বঞ্চিত’ করা হয়েছে ও অন্য দলগুলো যখন স্বাভাবিক সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করেছে, তখন ইরানকে প্রয়োজনের তুলনায় ‘অর্ধেকেরও কম’ অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

মিসরের বিপক্ষে ম্যাচের পর এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে ইরানের কোচ ঘালেনাই বলেন, ‘আমি আমার খেলোয়াড় ও পুরো দলকে নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত। এই তরুণেরা যা করে দেখিয়েছে, তা ইতিহাসে লেখা থাকা উচিত। কারণ, আয়োজক দেশ আমাদের সঙ্গে চরম অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে।’

গ্রুপসেরা হয়েও কেউ পায় তৃতীয় দল, কেউ রানার্সআপ—এ কেমন বিচার