মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইরানশাহরের একটি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছেন। ঘাঁটিটির একটি অংশ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ব্যবহার করত। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানে মার্কিন সামরিক হামলার মধ্যেই ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে তার চেয়ে ২০ গুণ বেশি শক্তিশালী আঘাত হানবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে—ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ উপকূলের একাধিক স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কমপ্লেক্সের জন্য পরিচিত বুশেহর এবং বন্দরনগরী চাবাহার, কোনারাক, বন্দর আব্বাস ও সিরিক। পাশাপাশি ইরানশাহরের একটি বিমানঘাঁটিও মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
এই হামলার জবাবে ইরান বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এর ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ বন্ধে করা অন্তর্বর্তী সমঝোতা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ইরানের হামলাগুলো সামগ্রিকভাবে আগের তুলনায় আরও বড় পরিসরের ছিল। তবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্রিয়ভাবে প্রতিহত করছে।
এদিকে, ট্রাম্প দাবি করেছেন—তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে ‘মরিয়া হয়ে’ চেষ্টা করছে। যদিও এর একদিন আগেই তিনি বলেছিলেন, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক ‘শেষ হয়ে গেছে।’ এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে ইরান ফোন করেছিল। তারা খুবই মরিয়া হয়ে একটি চুক্তি করতে চায়। কিন্তু তারা আদৌ এর যোগ্য কি না, আমি জানি না। তারা চুক্তি মানবে কি না, সেটাই আসল সমস্যা।’
তিনি ফোনকল সম্পর্কে আর কোনো বিস্তারিত জানাননি বা কে যোগাযোগ করেছিলেন, তা উল্লেখ করেননি। একই সঙ্গে তিনি সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে ইরানিদের ‘একটু পাগল ধরনের’ বলে মন্তব্য করেন। ট্রাম্প আরও বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্ট এবং প্রধান তেল উৎপাদন কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে হামলা চালাতে পারে কিংবা সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, ‘যা কিছু ঘটবে, খুব দ্রুতই ঘটবে।’ একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, মার্কিন বাহিনী হয়তো ‘কাজটা পুরোপুরি শেষই করে দেবে।’ গতকাল মঙ্গলবার তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। তখন ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁর দৃষ্টিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তী চুক্তি ‘শেষ।’ তবে তিনি আলোচনার পথ খোলা রাখার কথাও জানান।
অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি তাদের হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার অন্যতম প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক্সে এক পোস্টে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার পর ‘ইরানের ব্যবস্থাপনা’ অনুযায়ীই কেবল হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে। তিনি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনও শেখেনি যে, দাদাগিরি এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কোনো পরিণতি ছাড়া আর চলে না। পরিষ্কার করে বলছি, তোমরা যদি আঘাত করো, তাহলে পাল্টা আঘাতও পাবে।’
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকির সমালোচনা করে বলেন, এসব বক্তব্য শক্তির পরিচয় নয়; বরং বলপ্রয়োগ, নিষেধাজ্ঞা ও হুমকিনির্ভর নীতির ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি। এক্সে তিনি লেখেন, ‘আজ ট্রাম্পের বক্তব্য, যেখানে তিনি ইরানি জাতিকে অপমান করেছেন এবং আরও হামলার হুমকি দিয়েছেন, তা শক্তির পরিচয় নয়; বরং এমন এক নীতির ব্যর্থতার স্বীকৃতি, যা বছরের পর বছর বলপ্রয়োগ, নিষেধাজ্ঞা ও হুমকির ওপর দাঁড়িয়ে থেকেও ইরানি জাতিকে কখনও নতজানু করতে পারেনি। অপরাধী ও হত্যাকারী ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর নিজের ভাষাতেই কথা বলতে হবে; মনে হচ্ছে, তিনি কেবল শক্তির ভাষাই বোঝেন।’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও এক্সে লিখেছেন, ‘সভ্য ও সাহসী ইরানি জাতিকে অবমাননাকর ভাষায় সম্বোধন করলে তাঁদের মহত্ত্ব কমে যায় না। ইরানিরা তাঁদের সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং দৃঢ় নৈতিক মূল্যবোধের জন্য পরিচিত। আমরা অশালীনতার জবাব অশালীনতায় দিই না; আমরা জবাব দিই কর্মের মাধ্যমে, নির্ভীকভাবে এবং অসীম বীরত্বের সঙ্গে।’
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি বলেন, ‘আগ্রাসী শত্রু এবং তাঁদের সহযোগীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।’
সর্বশেষ এই হামলাগুলো এমন এক সময়ে হলো, যখন আজ বৃহস্পতিবার ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির দাফন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। চলমান যুদ্ধের সূচনালগ্নে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি নিহত হন। হামলার পর থেকে তেহরান জানিয়ে আসছে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে। তারা প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায় করবে এবং অনুমোদিত নৌপথ থেকে বিচ্যুত হওয়া জাহাজে হামলার হুমকিও দিয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ইরানের সামরিক বাহিনী অন্তত তিনটি জাহাজে হামলা চালানোর পর মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলা চালায়। এরপর ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়। আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ রাতেই আমরা ওদের ওপর কঠোর হামলা চালাব। তারা প্রতিদিনই চুক্তি লঙ্ঘন করছে।’ তবে পরে তিনি আবারও বলেন, ‘যা কিছু ঘটবে, সবকিছুই খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।’ ট্রাম্প এর আগে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ হয়ে গেছে’ বলে মন্তব্য করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।








