যুক্তরাষ্ট্র গতকাল বুধবার ইরানের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। আগের দিনের হামলার পর এই নতুন অভিযানে মধ্য জুনে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে পূর্ণমাত্রার সংঘাতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। এই হামলা জুনের মাঝামাঝি উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনা।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় পূর্বাঞ্চলীয় ইরানশাহর, বান্দার আব্বাস, কোনারাক, চাবাহার ও বুশেহর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আক কালা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ইরানশাহর বিমানবন্দরে হামলায় একজন দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্রবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক্সে শেয়ার করা এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন বাহিনী ‘হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাকে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা আরও দুর্বল করতে’ ইরানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত হামলা শুরু করেছে। সেন্টকমের ভাষ্য, ‘হরমুজ প্রণালির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অযৌক্তিক আগ্রাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করছে।’

সেন্টকমের বিবৃতির কিছুক্ষণ আগে ইরানের মেহর বার্তা সংস্থা জানায়, বান্দার আব্বাসের কাছে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘শত্রুতাপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু’ প্রতিহত করছে। পরে ইরানি কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা ফার্সকে জানান, চাবাহারে একটি সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ও একটি গুদামে হামলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, আক কালায় একটি রেলসেতুও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা পর বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। একই সময়ে কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রকেট ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করছে। এরপর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করে, তারা কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক ঘাঁটি এবং বাহরাইনে আরও দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে যে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা অব্যাহত রাখলে ভবিষ্যতে অঞ্চলের অন্যান্য মার্কিন ঘাঁটিও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

এর আগে বুধবার ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছিলেন, ‘ইরানিদের কঠোর চড়ের জন্য অপেক্ষা করুন।’

মঙ্গলবারও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছিল। সেন্টকম জানায়, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে ৮০ টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় এবং প্রায় চার ঘণ্টা ধরে অভিযান পরিচালনার পর তা শেষ করে। আইআরএনএর তথ্য অনুযায়ী, বান্দার আব্বাস ও বুশেহরে ওই হামলায় ইরানের বিমান ও নৌবাহিনীর আট সদস্য নিহত হন।

মধ্য জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা হয়েছিল। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মতো জটিল বিষয় ৬০ দিনের আলোচনার জন্য স্থগিত রাখা হয়।

দুই পক্ষই এখন একে অপরের বিরুদ্ধে ওই সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম ধারা, যেখানে বলা হয়েছে ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত এবং বিপরীতমুখী পথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং ৬০ দিনের জন্য বিনা খরচে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এস্মাইল বাঘাই বলেন, তেহরানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নির্ধারণের একক দায়িত্ব ইরানের। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই অনুমোদনবিহীন জাহাজের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে পেন্টাগনের সাবেক ন্যাটো অপারেশনস পরিচালক ডেভিড ডেস রোশ আল জাজিরাকে বলেন, সমঝোতা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত পারস্পরিক অবরোধ প্রত্যাহার করেছে এবং ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। বিনিময়ে ইরানের দায়িত্ব ছিল হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক জাহাজ চলাচলে হস্তক্ষেপ না করা। তাঁর ভাষ্য, ইরান জাহাজে হামলা চালিয়ে সমঝোতার সীমার বাইরে নতুন বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, যেখানে জাহাজগুলোকে ইরানের জলসীমা ব্যবহার করতে বাধ্য করা হবে এবং তা না করলে হামলার মুখে পড়তে হবে। তিনি বলেন, ‘এটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এই হামলাগুলো ওই পদক্ষেপের প্রতিশোধ।’

বুধবারের হামলার পর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, হরমুজ প্রণালি ‘শুধু ইরানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই খুলবে, আমেরিকান হুমকির মাধ্যমে নয়।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমেরিকা এখনো শেখেনি যে দাদাগিরি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ আর বিনা মূল্যে করা যায় না। পরিষ্কার করে বলছি, তোমরা আঘাত করলে পাল্টা আঘাত পাবে।’

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা কিম্বারলি হ্যালকেট জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী সব জাহাজের জন্য বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, সমঝোতা স্বাক্ষরের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছে যে বর্তমান সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কারণে। তবে হোয়াইট হাউসের মতে, এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করেছি। আমি বলব ২০-১ অনুপাতে আঘাত করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা যখনই আমাদের আঘাত করবে, আমরা তাদের ২০ গুণ আঘাত করব।’

তবে বুধবারের শুরুতে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর মনে হয় না যুদ্ধ আবার পূর্ণমাত্রায় শুরু হবে। তিনি বলেন, ‘যা কিছু ঘটবে, খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।’ একই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘এটি ইরানের গতকালের জাহাজে বোমা হামলার প্রতিশোধ। এটা আবার হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’ তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, তিনি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরতে চান না এবং আলোচনার সুযোগ এখনো রয়েছে।

আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে আবার নৌ অবরোধ আরোপ করতে পারে, ইরানের বিদ্যুৎ ও পানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে এবং এমনকি ইরানের খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নিতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসামরিক বিদ্যুৎ ও পানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে, আর খার্গ দ্বীপ দখলের জন্য কার্যত স্থলবাহিনী মোতায়েন প্রয়োজন হবে।