ইউক্রেনের বেশ কিছু স্কুল এখন কার্যক্রম চালাচ্ছে মাটির নিচে। স্কুলগুলোতে গেলে দেখা যাবে, বাইরে আছে শুধু খেলার মাঠ। কোনো শ্রেণিকক্ষ নেই। অন্য কোনো কার্যক্রমও নেই। তবে স্কুল চলছে। মাটির কয়েক মিটার নিচে চলছে পড়াশোনা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে স্কুলগুলো মাটির নিচে তৈরি করা হয়েছে। রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখতে তৈরি করা হয়েছে এই ব্যবস্থা। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরেই এখন এমন স্কুল কার্যক্রম চলছে।

ইউক্রেনের দক্ষিণের শহর জাপোরিঝঝিয়ায় এমনই একটি স্কুল হলো সিচোভি কলেজিয়াম। স্কুলটির শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা মাটির নিচের কংক্রিটের করিডর আর শ্রেণিকক্ষেই সময় কাটিয়েছে। বিরতির সময় কেউ বসেছে শক্ত কংক্রিটের দেয়ালের পাশে বেঞ্চে, কেউ দাঁড়িয়েছে বাতাস চলাচলের পাইপের কাছে। বাইরে যাওয়ার সুযোগ মেলে শুধু যখন আকাশপথে হামলার সতর্কসংকেত বন্ধ থাকে।

ইউক্রেনে পুরোপুরি মাটির নিচে থাকা এমন স্কুলের সংখ্যা এখন ৭৪। চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ কত দীর্ঘ যন্ত্রণা বয়ে এনেছে, তার একটা চিত্র যেন এটি। জাপোরিঝঝিয়া শহরটি যুদ্ধে আক্রান্ত জায়গাগুলোর সামনের দিকে। রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি এখানে সব সময়ই বেশি।

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দিন কি ঘনিয়ে আসছে

শহরের বাসিন্দা ওলেক্সান্দর লাগিনের দুই ছেলে মাটির নিচের স্কুলে পড়ে। তাঁর মতে, এখন নিরাপদে পড়াশোনা করতে হলে মাটির নিচে যেতেই হবে। সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর পর নিরাপত্তা নিয়ে এখন কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

শুনতে বিচিত্র মনে হলেও এখন এটাই ইউক্রেনের শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ। যুদ্ধের মধ্যে এসব স্কুলে পড়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই নিজেদের ভাগ্যবান মনে করে। কারণ, ইউক্রেনের প্রায় ৩৬ লাখ স্কুলপড়ুয়া শিশুর বেশির ভাগই অনলাইনে অথবা মাটির ওপরে থাকা স্কুলে পড়াশোনা করে। আকাশপথে হামলার সতর্কসংকেত বেজে উঠলে তাদের সবাইকে স্কুলের নিচের আশ্রয়কেন্দ্রে নেমে যেতে হয়। সেখানে বিভিন্ন বয়সের অনেক শিক্ষার্থী একসঙ্গে জড়ো হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে ক্লাস নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

জাপোরিঝঝিয়ার সিচোভি কলেজিয়ামে পড়তে আসা ১৩ বছর বয়সী দামিরেরও একই অভিজ্ঞতা। অষ্টম শ্রেণিতে ওঠা দামিরকে নিয়ে তাঁর মা ইউলিয়া বারাবাশ স্কুলের মাঠে এসেছিলেন। এরপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে তাঁরা মাটির নিচের শ্রেণিকক্ষে পৌঁছান।

সেদিন ছিল স্কুলের প্রথম দিন। শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যবাহী নকশা করা পোশাক পরে ফুল হাতে স্কুলে এসেছিল। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর বিশেষ অনুষ্ঠান ‘প্রথম ঘণ্টা’ও মাটির নিচেই হয়েছে। দামির বলেছে, স্কুলে পড়তে তার ভালো লাগে। শিক্ষকেরা খুব ভালো। এখানে সে নিরাপদ বোধ করে।

গত বছরও সে এই স্কুলে মাটির নিচে বসেই পড়াশোনা করেছে। অনেক দিন তাকে স্কুলের পুরোটা সময় মাটির নিচেই থাকতে হয়। ক্লাসের মাঝখানে বিরতি পেলে কখনো কখনো বাইরে গিয়ে একটু খোলা বাতাস নেওয়ার সুযোগ মেলে। কিন্তু সাইরেন বেজে উঠলেই আবার দ্রুত নিচে ফিরে আসতে হয়। শারীরিক শিক্ষার ক্লাসে দামির ফুটবল খেলতে পছন্দ করে। তবে আকাশপথে হামলার সতর্কসংকেতের কারণে খেলা মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলে তার মন খারাপ হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কিশোর-কিশোরীদের কি বুদ্ধি কমে যাচ্ছে

দামিরের মা ইউলিয়া অবশ্য ছেলের এই স্কুল নিয়ে খুবই খুশি। সকালে ছেলেকে স্কুলে দিয়ে যাওয়ার পর সারা দিন তিনি অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধের মধ্যে মাটির নিচের এই স্কুলই ছেলের জন্য অনেক নিরাপদ।

জাপোরিঝঝিয়ায় ইউরোপীয় অর্থায়নে ১০টি মাটির নিচের স্কুল তৈরি করা হয়েছে। পুরো অঞ্চলে এমন স্কুলের সংখ্যা ২২। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের তুলনায় জাপোরিঝঝিয়া অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। তবু এসব স্কুল শিশুদের নিরাপদে ক্লাস করার জন্য তুলনামূলকভাবে ভালো।

কিয়েভে কিছুদিন আগে এক শুক্রবারে আকাশপথে হামলার সতর্কসংকেত মোট ১৫৮ মিনিট ধরে চালু ছিল। মানে ছয়টি ক্লাসের মধ্যে প্রায় চারটি ক্লাসই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক দিন ধরে শহরটিতে ড্রোন হামলাও চলছিল। এতে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এমনকি শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনের অনুষ্ঠানও সতর্কসংকেতের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল।

ইউক্রেনের অন্য শহরগুলোতেও স্কুলের জন্য মাটির নিচের জায়গা ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও নতুন করে স্কুল তৈরি হয়েছে, কোথাও আবার সিনেমা হল, হাসপাতাল, শিশুদের দেখাশোনার কেন্দ্র, পানি সরবরাহের পাম্প স্টেশন বা প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামোর মতো জায়গাকে স্কুলে রূপ দেওয়া হয়েছে।

সিচোভি কলেজিয়ামের মাটির নিচের স্কুলটি অনেকটা বাংকারের মতো। সেখানে আধুনিক বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা আছে, যা তেজস্ক্রিয় পদার্থের প্রভাব থেকেও বাতাসকে পরিশোধন করতে পারে। বিদ্যুৎ চলে গেলে চালু রাখার জন্য আছে ডিজেলচালিত বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থাও।

অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল ফোনে কী আছে

তবে শুধু নিরাপদ জায়গা তৈরি করলেই তো যুদ্ধের ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায় না। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের শিশুদের পড়াশোনাতেও প্রভাব পড়েছে। দেশটির শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দক্ষতা নির্ধারণী পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে। দেখা গেছে, যুদ্ধের কারণে শিশুদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগের সঙ্গে পরীক্ষার ফল কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে।

ইউক্রেনে মোট ১১ হাজার ৯৪০টি স্কুল আছে। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার স্কুলে শুধু অনলাইনে পড়ানো হয়। বেশির ভাগ স্কুলেই অনলাইন ও অফলাইন—দুই ধরনের পড়াশোনা চালু আছে। এমনকি রাশিয়ার দখলে থাকা কিছু এলাকাতেও গোপনে অনলাইনের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় শিশুদের পড়ানো হচ্ছে।

আইন অনুযায়ী, ইউক্রেনের কোনো স্কুলে সরাসরি ক্লাস নিতে হলে সেখানে সহজে পৌঁছানো যায় এমন আশ্রয়কেন্দ্র থাকতে হবে। সাধারণত এগুলো হলো স্কুলের নিচের বেজমেন্ট। সেখানে বোমা থেকে নিরাপদে থাকা সম্ভব হলেও ক্লাস নেওয়ার মতো পরিবেশ থাকে না। তাই কোথাও কোথাও বেজমেন্টেই শ্রেণিকক্ষ তৈরি করার কথা ভাবা হচ্ছে।

সিচোভি কলেজিয়ামের প্রধান শিক্ষক হালিনা ভলকোভা মনে করেন, শিক্ষার সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে বিচার করা যায় না। পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম ও সামগ্রিক বিকাশও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ, ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হয়ে ওঠা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী।

স্কুলের করিডরে যুদ্ধের আরেকটি চিহ্ন আছে। সেখানে স্কুলের সাবেক চার শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষকের স্মরণে একটি স্মৃতিফলক রাখা হয়েছে। তাঁরা যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে মারা গেছেন। স্মৃতিফলকের পাশে ছিল ফুল।

মাটির নিচে স্কুলে পড়া শিক্ষার্থীদের কাছে মাটির নিচের জায়গাটি শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, এটি তাদের নিরাপদ থাকার জায়গা। ১৪ বছর বয়সী মারিয়া গুচকোভা স্কুলে পড়তে পছন্দ করে। তবে যুদ্ধের কারণে বাইরে যেতে না পারায় তার খারাপ লাগে।

তবু যুদ্ধের মধ্যেও স্কুলটি স্বাভাবিক জীবন ধরে রাখার চেষ্টা করছে। শিশুরা মাটির নিচে ফুটবল খেলে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে, ক্লাস করে। কখনো সুযোগ পেলে বাইরে বের হয়ে একটু আলো-বাতাসও গায়ে মাখে। কিন্তু আকাশপথে হামলার সতর্কসংকেত বেজে উঠলেই আবার তাদের ফিরতে হয় মাটির নিচে।

সূত্র: নিউইউর্ক টাইমসসূর্য হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলে পৃথিবীতে জীবন কত দিন টিকবে