ইউক্রেনের একের পর এক হামলায় রাশিয়ায় জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে। বিষয়টি গত রোববার প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে স্বীকার করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

ভ্লাদিমির পুতিন জানান, এ সমস্যা সমাধানে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স কাজ করছে। বিভিন্ন বিষয়ে ক্রেমলিনের ওপর সাধারণ মানুষের অসন্তোষ যখন বাড়ছে, ঠিক তখন এ জ্বালানিসংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

একই সময়ে রাশিয়াকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন তৎপরতার মুখোমুখিও হতে হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিয়েভের এ প্রচেষ্টার প্রকাশ্যে প্রশংসাও করেছেন।রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, ‘আমাদের অবকাঠামোগুলোতে এসব হামলা সমস্যা তৈরি করছে, তা স্পষ্ট।’

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা জোরদার করেছে। ফলে রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে এবং অধিকৃত ক্রিমিয়ায় জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। পেট্রলপাম্পে মাইলের পর মাইল গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে।

ইউক্রেনের অভিযানের কারণে রাশিয়ার জ্বালানি খাতে কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে পুতিন এবারই প্রথম জনসমক্ষে মুখ খুললেন।

পুতিন অবশ্য দাবি করেন, বর্তমানে জ্বালানির ‘কিছুটা ঘাটতি’ থাকলেও ‘তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো মারাত্মক প্রকৃতির নয়।’

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা জোরদার করেছে। ফলে রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে ও অধিকৃত ক্রিমিয়ায় জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। পেট্রলপাম্পে মাইলের পর মাইল গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। আবার ড্রোন হামলার মাধ্যমে ক্রিমিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টাও বাড়িয়েছে ইউক্রেন।

রোববার সকালে নিজের দল ‘ইউনাইটেড রাশিয়া’র কংগ্রেসে দেওয়া এক ভাষণে পুতিন বলেন, ‘আমরা একটি কঠিন সময় পার করছি। তবে এটি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। একজন রুশ নাগরিক হওয়ার প্রকৃত অর্থ কী, তা আমাদের বুঝতে সাহায্য করেছে।’

ভ্লাদিমির পুতিন, রুশ প্রেসিডেন্টহ্যাঁ, আমরা সমস্যাগুলো দেখছি। এগুলো নিয়ে আমরা সচেতন এবং ব্যবস্থাও নিচ্ছি। তবে আমরা নিশ্চিতভাবেই দেশ এবং আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও রাশিয়ার সীমান্তের অখণ্ডতা রক্ষা করব।

পুতিন আরও বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা সমস্যাগুলো দেখছি। এগুলো নিয়ে আমরা সচেতন এবং ব্যবস্থাও নিচ্ছি। তবে আমরা নিশ্চিতভাবেই দেশ এবং আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও রাশিয়ার সীমান্তের অখণ্ডতা রক্ষা করব।’

পরে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন পুতিন। বৈঠকে দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি ও ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।

রোববার পুতিনের এ বৈঠক করা থেকে স্পষ্ট, জ্বালানিসংকট নিয়ে বেশ উদ্বেগের মধ্যে আছেন তিনি। কারণ, রুশ প্রেসিডেন্ট সাধারণত রোববার সরকারি বৈঠক ডাকেন না।

এ বৈঠকের পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দেন পুতিন। সেখানে বলেন, রাশিয়ার প্রধান লক্ষ্য হলো, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার এবং ক্রিমিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। শুক্রবার ক্রিমিয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেন গত সপ্তাহে তাদের অন্যতম বড় ড্রোন হামলাটি চালায়। মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও ক্রিমিয়াসহ রাশিয়ার ১২টি অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এসব ড্রোন।

ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়া প্রায় প্রতিদিনই যে হামলা চালায়, তারই জবাবে ইউক্রেন এ পাল্টা হামলা শুরু করেছে। হামলাগুলোর মাধ্যমে ইউক্রেন তাদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতারও জানান দিচ্ছে। এর ফলে তারা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে পারছে। সেই সঙ্গে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার জন্য মস্কোর ওপর চাপ বাড়াতে পারছে।

ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রুশ তেল শোধনাগারে আগুন লাগে। রোববার মস্কোয়

রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি লিখেছেন, ‘আমরা আমাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছি, যা এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।’

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, মস্কোর উচিত ‘টেবিলে বসে যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর জবাব দেওয়া।’ এক্সে তিনি আরও লেখেন, ‘পুতিন যত দেরি করে এ বাস্তবতা মেনে নেবেন যে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে কখনো নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন না, রাশিয়ার জন্য পরিস্থিতি ততটাই খারাপ হবে।’

কেন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমানোর ইউক্রেনের প্রস্তাব নাকচ করলেন পুতিন

পুতিন জানান, শান্তির লক্ষ্যে ইউক্রেন দূরপাল্লার হামলা পরস্পরের মধ্যে বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে রুশ বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের অভিযান চালিয়ে যাবে।

সাক্ষাৎকারে পুতিন বলেন, ‘এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার কারণ স্পষ্ট। ইউক্রেনের ভূখণ্ডের ভেতরে আমাদের পাল্টা হামলাগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী, বেদনাদায়ক ও ধ্বংসাত্মক হচ্ছে। ফলে কিয়েভ প্রশাসন সত্যিই মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছে।’

রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেন গত সপ্তাহে তাদের অন্যতম বড় ড্রোন হামলা চালায়। মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও ক্রিমিয়াসহ রাশিয়ার ১২টি অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এসব ড্রোন।

পুতিন দাবি করেন, ইউক্রেনীয় হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো ‘আমাদের মনোযোগ মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে নেওয়া—যা হলো, দনবাস ও নভোরোসিয়ার চূড়ান্ত মুক্তি।’ এখানে পূর্ব ইউক্রেনের দনবাসের পাশাপাশি জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলকে বুঝিয়েছেন তিনি।

ইউক্রেনের ড্রোন অভিযানের কারণে রাশিয়ার জ্বালানি ও লজিস্টিকস (যোগাযোগ ও সরবরাহ) খাতে ক্ষতি বাড়লেও ক্রেমলিনের বাহিনী কস্তিয়ান্তিনিভকা শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শহরটি পূর্ব ইউক্রেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ, যা পুতিন দীর্ঘদিন ধরে দখলের চেষ্টা করছেন।

ভলোদিমির জেলেনস্কি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টআমরা আমাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছি, যা এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাস গত সপ্তাহে বলেছে, রুশ বাহিনী কস্তিয়ান্তিনিভকার পূর্বাঞ্চলের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিয়েছে এবং এর উত্তর-পূর্ব উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে।

তবে কিয়েভ এ শহরটি অবরুদ্ধ হওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার জানিয়েছে, শহরের কিছু অংশ এখন ‘ধূসর অঞ্চলে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে কোনো পক্ষেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। কস্তিয়ান্তিনিভকা দখল করতে পারলে ক্রেমলিন তাদের যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, অর্থাৎ পুরো দনবাস অঞ্চল দখলের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন যে ক্ষয়ক্ষতি করেছে, তার মাঝে এ জয় রাশিয়ার জন্য বড় প্রচারণামূলক সাফল্য হিসেবে কাজ করবে।

রাশিয়ায় সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা চালাল ইউক্রেন