সন্ধ্যা নামলেই একসময় পরিবারের সবাই টেলিভিশনের সামনে বসতেন প্রিয় নাটক, সংবাদ বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখার জন্য। নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান সম্প্রচার হতো, আর দর্শকদেরও সেই সময়ের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে হতো। কিন্তু সময় বদলেছে। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার যুগে এখন দর্শকই ঠিক করছেন কখন, কী এবং কোথায় কনটেন্ট দেখবেন। ফলে বাংলাদেশের বিনোদন কিংবা গণমাধ্যম ব্যবহারের চিত্রে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। টেলিভিশন ও অন্যান্য প্রথাগত মাধ্যমের পাশাপাশি, অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোকে ছাড়িয়েও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ইউটিউব, ফেসবুক ও টিকটকের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বিনোদন, সংবাদ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, ভ্রমণ কিংবা জীবনধারাবিষয়ক তথ্যের জন্য তারা ক্রমেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছেন। ফলে একদিকে যেমন বদলে যাচ্ছে দর্শকের অভ্যাস, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
দেশের দর্শকের পছন্দের তালিকার শীর্ষে এখন ডিজিটাল কনটেন্ট। মিডিয়া বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এর সহজপ্রাপ্যতা ও বৈচিত্র্য। দর্শককে আর কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। নিজের সুবিধামতো সময়ে পছন্দের কনটেন্ট দেখা যায়। একই সঙ্গে একটি প্ল্যাটফর্মেই পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের বিষয়ভিত্তিক ভিডিও। বর্তমানে বাংলাদেশের অসংখ্য দর্শক প্রতিদিন ইউটিউব ও ফেসবুকে ভিডিও দেখছেন। কেউ প্রযুক্তিপণ্যের রিভিউ দেখছেন, কেউ ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ শিক্ষামূলক কনটেন্টের মাধ্যমে নতুন দক্ষতা অর্জন করছেন। টিকটকও বিনোদন ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর ক্ষেত্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
ডিজিটাল কনটেন্টের এই উত্থান প্রথাগত মিডিয়াকেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দর্শকের মনোযোগ যেখানে যাচ্ছে, বিজ্ঞাপনদাতারাও সেদিকেই ঝুঁকছেন। ফলে বিজ্ঞাপন বাজারেও পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন তারকা, যারা সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার নামে পরিচিত। একসময় জনপ্রিয়তার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন সিনেমা ও নাটকের অভিনয়শিল্পী কিংবা সংগীতশিল্পীরা। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট নির্মাতারা। লাখো অনুসারী নিয়ে তারা ডিজিটাল জগতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব দর্শকগোষ্ঠী।
বাংলাদেশে এমন অনেক কনটেন্ট নির্মাতা রয়েছেন, যাদের ভিডিও প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো ভিউ অর্জন করে। প্রযুক্তি, ভ্রমণ, রান্না, শিক্ষা, কমেডি কিংবা লাইফস্টাইল-বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাতারা এখন সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত মুখে পরিণত হয়েছেন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, বাংলাদেশের ইউটিউব অঙ্গনের অগ্রদূতদের একজন হিসেবে পরিচিত সালমান মুক্তাদির। ২০১২ সাল থেকে তিনি কমেডি, স্কেচ ভিডিও ও লাইফস্টাইলভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করে দেশের তরুণ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে অভিনয়, সংগীত ও উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। দেশের প্রথম নারী এগ্রি-ইনফ্লুয়েন্সার ও সফল কৃষি উদ্যোক্তা হলেন উম্মে কুলসুম পপি। তিনি কীটনাশকমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করছেন। অন্যদিকে শিক্ষামূলক কনটেন্টের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আয়মান সাদিক, মুনজেরীন শহীদ, ঝংকার মাহবুবের মতো নির্মাতারা ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, প্রোগ্রামিং, ক্যারিয়ার উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিবিষয়ক কনটেন্ট তৈরি করে তরুণদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। এতে প্রমাণ হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু বিনোদনের নয়; শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেরও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া ইউটিউব ও ফেসবুকের লাইফস্টাইল এবং ট্রাভেল ভগিংয়ে রাফসান দ্য ছোট ভাই, রাকিব হোসেন এবং নাদির নিব্রাস বেশ জনপ্রিয়। কমেডি ও বিনোদনমূলক ভিডিওতে রাবা খান, রিকিন আবসার এবং জিয়াউল হক পলাশ বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া শোবিজ অঙ্গনের অনেকেই এখন ইনফ্লুয়েন্সার হিসাবে কাজ করছেন।
বিপণন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রতি দর্শকের আস্থাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য ও সেবার প্রচারণা চালাচ্ছে। ফলে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং এখন দেশের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কয়েক বছর আগেও ভিডিও তৈরি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট প্রকাশকে অনেকেই শুরুতে শখের কাজ হিসাবে দেখতেন। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। কনটেন্ট ক্রিয়েশন এখন অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য পূর্ণকালীন পেশায় পরিণত হয়েছে। ইউটিউবের বিজ্ঞাপন আয়ের পাশাপাশি ফেসবুক মনিটাইজেশন, ব্র্যান্ড স্পনসরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে আয় করছেন কনটেন্ট নির্মাতারা। জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতাদের অনেকেই মাসিক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় করছেন, যা তাদের অন্য পেশার বিকল্প হিসাবে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে বেছে নিতে উৎসাহিত করছে।
শুধু ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষেত্রেই নয়, এই খাত নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করছে। একটি সফল ইউটিউব চ্যানেল বা ডিজিটাল কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার জন্য ভিডিওগ্রাফার, সম্পাদক, গ্রাফিক ডিজাইনার, স্ক্রিপ্টরাইটার, ডিজিটাল মার্কেটার ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবস্থাপক প্রয়োজন হয়। ফলে একজন সফল কনটেন্ট নির্মাতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও অনেকের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।
তবে এ খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। দর্শক আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় অতিরঞ্জিত শিরোনাম, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা নিম্নমানের কনটেন্ট প্রকাশের অভিযোগ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল কনটেন্ট শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে তথ্যের সত্যতা যাচাই, নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং মানসম্মত কনটেন্ট তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একইসঙ্গে নির্মাতাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তাও জরুরি।
নেতিবাচক কিছু দিক থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কনটেন্ট শিল্পও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। স্মার্টফোন ব্যবহার বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ জনগোষ্ঠী এই খাতকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একসময় যে প্ল্যাটফর্মগুলোকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে দেখা হতো, আজ সেগুলোই হয়ে উঠেছে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন ক্ষেত্র। ফলে ইউটিউব, ফেসবুক ও টিকটকের উত্থানকে শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতারই একটি প্রতিফলন। দর্শকের হাতে থাকা স্মার্টফোনের পর্দাই এখন নতুন যুগের মিডিয়া। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেশের হাজারো কনটেন্ট নির্মাতা ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, যারা প্রতিদিন নতুন করে গড়ে তুলছেন বাংলাদেশের ডিজিটাল মিডিয়ার ভবিষ্যৎ।
পরিসংখ্যান বলছে
* বিটিআরসি’র তথ্যমতে বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ১৩ কোটি ৪০ লাখ ছাড়িয়েছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩.৪ শতাংশ।
* একই সময় দেশে সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর হিসাব পাওয়া যায় ৬ কোটি ৪০ লাখ থেকে ৭ কোটি ৭০ লাখের মধ্যে। ষইউটিউবের সম্ভাব্য বিজ্ঞাপন-দর্শক (অফ জবধপয) বাংলাদেশে ৪ কোটি ৪৬ লাখ-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর প্রায় ৫৭ শতাংশেরও বেশি ইউটিউবের আওতায় রয়েছে।
* ফেসবুকের সম্ভাব্য বিজ্ঞাপন-দর্শক বাংলাদেশে ৭ কোটিরও বেশি। অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক বিপণনে ফেসবুক এখনও সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।



