বিগত সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে দেশের আর্থিক খাতে অর্থ পাচার এবং সাইবার হ্যাকিংয়ের একটি ভয়াবহ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে ব্যাংক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের ঘটনা জাতীয় পত্রপত্রিকায় ছিল বেশ মুখরোচক বিষয়। বাস্তবতা হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনা আমাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিয়েছে। ভঙ্গুর এ অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা এবং হ্যাকিং বা সাইবার চুরির ঝুঁকি মোকাবিলা করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনাই এখন নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি অত্যাধুনিক, নিরাপদ এবং প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাপনার পুনর্গঠন। তাই আমি এ লেখায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা (সিবিডিসি) কীভাবে একটি প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাপনা আনতে পারে তা নিয়ে আলোকপাত করতে চাই।

সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা, যা একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা সরাসরি জারি ও নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এটি দেশের ফিয়াট মুদ্রার একটি ডিজিটাল সংস্করণ। এ প্রযুক্তিগত ভিন্নতা সত্ত্বেও সব ডিজিটাল মুদ্রার মূল লক্ষ্য হলো আধুনিক লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ এবং সহজ করে তোলা। সিবিডিসি প্রচলনের মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা উন্নত করা, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সমাজের বৃহত্তর অংশকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা।

ডিজিটাল মুদ্রার কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এগুলোকে প্রথাগত ফিয়াট মুদ্রা থেকে আলাদা করে। ডিজিটাল মুদ্রাগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণের কাঠামোর ভিত্তিতে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত বা বিকেন্দ্রীভূত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কাগজের টাকা বা নোটের মতো প্রথাগত ফিয়াট মুদ্রাগুলো ব্যাংক এবং সরকার দ্বারা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে, ব্লকচেইনভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একটি বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় কাজ করে, যেখানে কোনো একক সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ এটির নিয়ন্ত্রণ করে না।

বর্তমান আধুনিক ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্লকচেইনভিত্তিক সিস্টেম অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করা হয়। কারণ এটি কোনো ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে তহবিল স্থানান্তরের জন্য একটি বিকেন্দ্রীভূত, সুরক্ষিত এবং দ্রুত উপায় সরবরাহ করে। এটি কম ফি এবং আর্থিক পরিষেবাগুলোতে বৃহত্তর অ্যাকসেসযোগ্যতাসহ সীমানাহীন লেনদেনের অনুমতি দেয়, বিশেষ করে যারা ব্যাংকিং পরিষেবা পাননি বা সীমিত পরিষেবা পান। ডিজিটাল মুদ্রা ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে দ্রুত, নিরাপদ এবং আধুনিক লেনদেন প্রক্রিয়াকে সম্ভব করে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

যাহোক, আলোচনার মূলে ফিরে যাই। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে প্রযুক্তির দুর্বলতা এবং এর ফলে উদ্ভূত নিরাপত্তা ঝুঁকি অত্যন্ত প্রকট বলে মনে করি। বর্তমানে অনিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং নিুমানের আইটি অবকাঠামো এ চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৩ সালে সোনালী ব্যাংকের ঘটনায় সাইবার অপরাধীরা সুইফট আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ৪ কোটি টাকা চুরি করেছিল। এর চেয়েও বড় সাইবার আক্রমণের ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে, যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ১,২৩২ কোটি টাকা ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ নিউইয়র্ক অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি হয়।

এ ধরনের ভয়াবহ চুরির মূল কারণ হলো আমাদের সিস্টেমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত রিয়েল-টাইম থ্রেট ডিটেকশন বা অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তকরণের সাবসিস্টেমস নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংকিং আইটি আর্কিটেকচার এতটাই দুর্বল যে, তা সামান্যতম সাইবার আক্রমণও প্রতিহত করতে সক্ষম নয়। ফলস্বরূপ, সরকারি, বেসরকারি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আইটি সিস্টেমগুলো ঘনঘন অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এছাড়াও কেন্দ্রীভূত ব্যাংকিংব্যবস্থার কারণে আমরা পুরোপুরি ব্যাংক ও সরকারের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংক চাইলেই যে কোনো অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে পারে বা উত্তোলন সীমা আরোপ করতে পারে। সরকার মুদ্রার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতির দিকে নিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক ব্যাংক স্থানান্তর বা সুইফট সিস্টেম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েকদিন সময় লাগে এবং এর ফি অত্যন্ত চড়া। বর্তমান ব্যবস্থা ব্যাংকের মতো মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করে, যারা দুর্নীতিগ্রস্ত বা অদক্ষ হতে পারে, এবং রেকর্ড ম্যানিপুলেট করে অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

যাহোক, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ব্লকচেইনের মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তিগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ ‘ইন্ডাস্ট্রি ৫.০’-এর উপযোগী সুযোগ তৈরি করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে এ সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে, তার প্রথমেই হলো, অ্যানোমালি ডিটেকশন। এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদমগুলো রিয়েল-টাইমে মিলিয়ন মিলিয়ন লেনদেন বিশ্লেষণ করতে পারে। কোনো লেনদেনের ধরন যদি সন্দেহজনক হয় (যেমন হঠাৎ করে দেশের বাইরে বিশাল অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সঙ্গে সঙ্গে তা ব্লক করে দিতে পারে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করতে পারে। তারপর আসবে অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং অটোমেশন, যেখানে মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে অপরাধীরা অর্থের উৎস লুকাতে অত্যন্ত জটিল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মেশিন লার্নিং মডেল ব্যবহার করে জটিল নেটওয়ার্কের প্যাটার্ন খুব সহজেই ধরে ফেলতে সক্ষম, যা মানুষের পক্ষে ম্যানুয়ালি করা প্রায় অসম্ভব। এরপর রয়েছে প্রেডিক্টিভ সাইবার সিকিউরিটি মনিটরিং, যা হ্যাকারদের আক্রমণ করার আগেই সিস্টেমের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারে। অতীত সাইবার হামলার ডেটা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের হামলার পূর্বাভাস দিতে পারে। সবশেষে রয়েছে স্মার্ট কেওয়াইসি, যেখানে বায়োমেট্রিক এবং ফেসিয়াল রিকগনিশনের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রাহকের পরিচয় নিমিষেই এবং নিখুঁতভাবে যাচাই করতে পারে, যা ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধ করবে।

উদার বা ‘ব্লক-নিরপেক্ষ’ পররাষ্ট্রনীতির একটি সম্ভাব্য আধুনিক রূপ হিসাবে মার্কিন আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেমের বিকল্প হিসাবে ব্রিকস পেমেন্ট সিস্টেমের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। ব্রিকস পে-কার্ড হলো একটি ব্লকচেইনভিত্তিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমানো এবং সুইফট সিস্টেমের বিকল্প হিসাবে চালু করা হয়েছে। BRICS Pay-এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশে ব্লকচেইন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রা চালু হলে দেশের সামগ্রিক আইটি অবকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক স্তরে আধুনিক হবে। আন্তঃসীমান্ত লেনদেন দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং স্বচ্ছ হওয়ার মাধ্যমে ই-কমার্স ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে উৎসাহিত হবে। এ প্রযুক্তি প্রবর্তন আইটি খাতে হাই-স্কিলড জনবল এবং ফিনটেক উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে।

ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অব বিজনেস অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া; ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম