জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) চিকিৎসাকেন্দ্রে মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে প্রায় ৭৩ হাজার টাকার ওষুধ উধাও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্টোর শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. নূর-এ-কামালকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তাকে (সিএমও) শামসুর রহমানকে অবরুদ্ধ করে চিকিৎসাকেন্দ্রের সংস্কারে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি চিকিৎসাকেন্দ্রে আকস্মিক অডিট পরিচালনা করে ওষুধ ক্রয় কমিটি। অডিটে ওষুধের মজুদে বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়ে। গত ৩০ জুন থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত সময়ের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্টোর থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫৬৭ পিস ওষুধের কোনো হিসাব মিলছে না। এসব ওষুধের বাজারমূল্য প্রায় ৭৩ হাজার ১০১ টাকা। এর মধ্যে অ্যালাট্রল ও ডমপেরিডোনের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। এছাড়া, এজিথ্রোমাইসিন, প্যারাসিটামল, ফ্যামোটিডিন ও নাপরনসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধেরও গরমিল পাওয়া গেছে।

ঘটনার পর বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এ বি এম আজিজুর রহমান দুটি পৃথক অফিস আদেশ জারি করেন। আদেশে বলা হয়, কর্মচারী দক্ষতা ও শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ অনুযায়ী স্টোরের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. নূর-এ-কামালকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকালীন তিনি অর্ধেক মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতা পাবেন।

ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. সালেকুল ইসলাম এবং দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুস ছাত্তার। সদস্যসচিব করা হয়েছে রেজিস্ট্রার অফিসের (কাউন্সিল শাখা) ডেপুটি রেজিস্ট্রার আলাউদ্দিন মোল্লাকে।

এদিকে, বিপুল পরিমাণ ওষুধ উধাও এবং চিকিৎসাকেন্দ্রের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দুপুরে বিক্ষোভে নামেন শিক্ষার্থীরা। তারা প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ড. শামসুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা এবং ব্যক্তিগত কাজে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। দুপুর দেড়টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) নেতারা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে প্রশাসনের আশ্বাসের পর বিকেল ৩টার দিকে তাকে মুক্ত করা হয়।

এ সময় চিকিৎসাকেন্দ্রের আধুনিকায়নে পাঁচ দফা দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সাত দিনের মধ্যে চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ছয়জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ, ১০টি নতুন কক্ষ নির্মাণ, অপারেশন থিয়েটারের আধুনিকায়ন, নতুন দুটি অ্যাম্বুলেন্স চালু এবং চিকিৎসাকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

সার্বিক বিষয়ে জাকসুর স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক হুসনে মুবারক বলেন, “প্রশাসনের দীর্ঘদিনের গাফিলতির কারণেই এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।”

তিনি আরো বলেন, “আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।” ওষুধ উধাওয়ের বিষয়ে অভিযুক্ত মো. নূর-এ-কামাল বলেন, “চাবি আমার কাছেই থাকে এবং ওষুধ আমিই বিতরণ করি। তবে কীভাবে এ ঘাটতি হয়েছে, তা আমি বুঝতে পারছি না।”

অন্যদিকে, প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ড. শামসুর রহমান দাবি করেন, “স্টোরের চাবি আমার কাছে থাকে না। এটি পুরোপুরি ডেপুটি রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব।”

উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, অডিটে গরমিল ধরা পড়ার পর আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুর রব বলেন, “লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর প্রধান মেডিকেল অফিসারের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরো জানান, চিকিৎসাকেন্দ্রের শূন্য পদে নিয়োগ এবং নতুন পদ সৃষ্টির অনুমোদনের জন্য দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) প্রস্তাব পাঠানো হবে।