বর্তমানে পৃথিবীতে ১৯৫টি দেশ আছে। আর প্রতিটি দেশের রয়েছে জাতীয় পতাকা। একেক পতাকার রং আর ডিজাইন একেক রকম। এই পতাকাগুলোর মাধ্যমে মূলত সেই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর মানুষের কথা ফুটিয়ে তোলা হয়। যেমন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার লাল বৃত্তটি একটি নতুন দিনের উদীয়মান সূর্য এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের তাজা রক্তের প্রতীক।

পৃথিবীর সব পতাকার দিকে যদি তুমি একটু ভালো করে তাকাও, তবে একটা দারুণ মিল খুঁজে পাবে। একটু খেয়াল করলে দেখবে, বেশির ভাগ দেশের পতাকা লাল, নীল আর সাদা রঙের।

পৃথিবীর প্রায় ৩০টি দেশ তাদের পতাকায় ঠিক এই তিনটি রং ব্যবহার করে। অবশ্য যদি বিভিন্ন ছোট অঞ্চল বা দ্বীপগুলোকেও এর মধ্যে ধরো, তবে এই সংখ্যাটা আরও বাড়বে। আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশ থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড কিংবা থাইল্যান্ড, সবার পতাকা কিন্তু এই তিন রঙের। পতাকার দুনিয়ায় এইগুলো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় রং।

কিন্তু পৃথিবীতে এত এত সুন্দর রং থাকতে কেন এই তিনটি রংকেই সবাই এত বেছে নিল? এটা কি শুধুই একটা কাকতালীয় ব্যাপার। নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো বড় কারণ?

প্রচণ্ড গরমে সুস্থ থাকতে কী খাব, কী খাব না

শত শত বছর আগে থেকে রাজা-বাদশাহ, ব্যবসায়ী, এমনকি জলদস্যুরাও নিজেদের চেনাতে পতাকা ব্যবহার করত। তবে আজকের চেনা জাতীয় পতাকাগুলো মূলত ১৭০০ সালের শেষের দিকে রূপ পেতে শুরু করে।

কিন্তু সেকালের পতাকার রংগুলোর মধ্যে একটা মজার মিল ছিল। তখন তো আজকের মতো কৃত্রিম বা কেমিক্যাল রং ছিল না। ১৮৫৬ সালে উইলিয়াম হেনরি পারকিন নামের এক ১৮ বছরের তরুণ ভুল করে প্রথম কৃত্রিম বেগুনি রং আবিষ্কার করেন। তার আগে সব রং আসত প্রকৃতি থেকে।

তাই সে যুগে পতাকায় কোন রং থাকবে, তা নির্ভর করত কোন রংটি সহজে পাওয়া যায়, সস্তা এবং রোদে-বৃষ্টিতে নষ্ট হয় না তার ওপর। যেমন লাল রং তৈরি হতো ম্যাডারগাছের মূল থেকে। কিংবা আরও দামি লাল রং আসত একধরনের পোকার শুকনা গুঁড়া থেকে। সাদা রঙের জন্য কোনো বাড়তি রঙেরই দরকার হতো না। কাপড় ব্লিচ বা পরিষ্কার করলেই সাদা হয়ে যেত। আর নীল রং আসত ‘উড’ নামের একধরনের শর্ষে গোত্রের উদ্ভিদের পাতা থেকে। সহজে পাওয়া যায় আর দীর্ঘস্থায়ী হয় বলে লাল, সাদা আর নীল রং কাপড় রাঙানোর জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন টেনিস প্রতিযোগিতার কোর্ট পাহারা দেয় যে বাজপাখি

অন্যদিকে, বেগুনি রং তৈরি হতো এক বিশেষ শামুকের লালা থেকে, যা ছিল অনেক দামি। আবার সবুজ, কমলা বা কালো রং সহজে টেকসই করা যেত না। দ্রুত ফ্যাকাশে হয়ে যেত। সস্তা, সহজলভ্য আর টেকসই হওয়ার কারণে লাল, সাদা ও নীল রং সবার পছন্দের তালিকায় ওপরে চলে আসে। পরে নতুন দেশগুলো যখন পতাকা বানাতে গেল, তখন চেনা এই তিন রংকেই বেছে নিল।

সহজে রং পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের বেশির ভাগ পতাকায় লাল, সাদা আর নীল রং ছড়িয়ে পড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো, শক্তিশালী দেশগুলোর ঐতিহাসিক প্রভাব ও রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা।

১৭০০ শতকে ডাচরা (নেদারল্যান্ডস) ছিল সমুদ্রের রাজা ও ব্যবসায় দারুণ শক্তিশালী। তারা প্রথম নিজেদের পতাকায় লাল, সাদা আর নীলের তিনটি আড়াআড়ি দাগ ব্যবহার শুরু করে। তাদের দেখে মুগ্ধ হয়ে রাশিয়ার রাজা পিটার দ্য গ্রেট নিজের দেশের জন্যও একই রঙের পতাকা বানিয়ে নেন। পরে রাশিয়াকে দেখে স্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মতো অনেক দেশ একই রঙের পতাকা তৈরি করে।

একইভাবে ব্রিটেনের বিখ্যাত লাল, সাদা আর নীল রঙের ইউনিয়ন জ্যাক পতাকাটিও পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্রিটেন যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য হয়ে উঠল, তখন তাদের দেখাদেখি বা প্রভাবে অনেক দেশ এই তিন রং বেছে নেয়। আজও অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোর পতাকার এক কোনায় ব্রিটেনের সেই ইউনিয়ন জ্যাক রয়ে গেছে। ইউনিয়ন জ্যাক হলো যুক্তরাজ্যের (ব্রিটেন) জাতীয় পতাকা, যা মূলত সেন্ট জর্জ, সেন্ট অ্যান্ড্রু এবং সেন্ট প্যাট্রিকের ক্রস চিহ্নের সমন্বয়ে তৈরি লাল, সাদা ও নীল রঙের একটি ঐতিহাসিক প্রতীক।

খাবারের ছত্রাক পড়া অংশ ফেলে বাকিটা খাওয়া কি নিরাপদ
পতাকা উত্তোলনে নির্ধিষ্ট নিয়ম আছে

আবার ফরাসি বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে ফ্রান্সের লাল, সাদা আর নীল রঙের পতাকাটি সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাদের স্বাধীনতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তী সময়ে অনেক দেশই নিজেদের পতাকায় এই তিন রংকে জায়গা দেয়। এভাবেই মূলত ইতিহাস ও শক্তিশালী দেশগুলোর দেখাদেখি লাল, সাদা আর নীল রঙের পতাকা আজ পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলোর যুদ্ধ জয়, উপনিবেশ তৈরি কিংবা তাদের দেখাদেখি করার কারণেই মূলত লাল, সাদা আর নীল রং পুরো পৃথিবীতে এত বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে পৃথিবীর সব জায়গায় কিন্তু এই তিন রঙের এমন দাপট ছিল না।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মুসলিম ঐতিহ্যের চারটি রং, লাল, সাদা, সবুজ আর কালো রঙের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সেখানকার বেশির ভাগ ইসলামিক দেশের পতাকায় এই রংগুলোর ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে এশিয়ার অনেক দেশের পতাকায় এমন সব ধর্মীয় বা রাজনৈতিক প্রতীক রয়েছে, যেগুলোর ওপর ইউরোপের কোনো প্রভাবই ছিল না। এমনকি এশিয়ার অনেক পতাকা ইউরোপের দেশগুলোর চেয়েও শত শত বছর পুরোনো।

সূত্র: হিস্ট্রি ডটকমগরমের দেশগুলো কেন বেশি দরিদ্র হয়