জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র বিতর্কের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন। প্রথম দিনেই সরকারের বিভিন্ন নীতি ও বিল উত্থাপন নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে তুমুল বিতর্ক হয়। একপর্যায়ে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। তাদের অভিযোগ, জনদুর্ভোগ ও সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংসদেই এসব বিষয়ে আলোচনা ও সমাধানের পথ বের করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন, নেপালের বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় শোক, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা, পররাষ্ট্রনীতি, উন্নয়ন প্রকল্প, পানি বণ্টন, জ্বালানি সংকট ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা হয়।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে। শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে গণতান্ত্রিক, শক্তিশালী ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মহান জাতীয় সংসদ ও ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানান স্পিকার। তার আশা, নতুন রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা ও পারস্পরিক সহযোগিতা আরো সুদৃঢ় হবে।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সর্বোচ্চ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
এরপর কার্যপ্রণালী বিধির ১২(১) বিধি অনুযায়ী তৃতীয় অধিবেশনের জন্য পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর নাম ঘোষণা করা হয়। তারা হলেন- গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, জামাল নিজাম, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, নিলুফার চৌধুরী মনি ও মুজিবুর রহমান। অধিবেশনে সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও মন্ত্রী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকারসহ প্রয়াত সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায়ও সংসদের পক্ষ থেকে শোক ও সমবেদনা জানানো হয়।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, নেপালের দুর্যোগে সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্ধারকাজ ও মেডিকেল টিম পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
হট্টগোলে উত্তপ্ত অধিবেশন শোক ও শ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরই সংসদে উত্তেজনা তৈরি হয়। কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘন, হট্টগোল এবং একে অপরকে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্পিকার।
তিনি বলেন, “সংসদের ভেতরে সদস্যদের অসহিষ্ণুতা এবং স্পিকারের নির্দেশ উপেক্ষার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংসদের ভবিষ্যৎ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যে বাকবিতণ্ডার সময় বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুরু থেকেই বিরোধীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আসছেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আচরণকে সংসদীয় ফ্যাসিবাদের রূপ বলে উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশের দাবি জানান।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘সংসদ সদস্যরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছাত্র হতে এখানে আসেননি।’’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সম্মানিত সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, আজ (বৃহস্পতিবার) তিনি নতুন করে এসব শব্দ উচ্চারণ করেননি। সংসদ অধিবেশন শুরুর দিন থেকেই তিনি তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সুরে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। তিনি নিজেকে কী মনে করেন, আমি বুঝতে পারি না।”
তিনি আরো বলেন, “এমনকি তিনি এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন। আমরা এখানে তার ছাত্র হওয়ার জন্য আসিনি। শিক্ষকতা করতে হলে তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে পারেন। সেখানে যাদের ইচ্ছা, তারা ভর্তি হয়ে তার লেকচার শুনবেন।”
জবাবে স্পিকার বলেন, “কোনো বক্তব্যে অসংসদীয় শব্দ থাকলে তা পরীক্ষা করে এক্সপাঞ্জ করা হবে। তবে কোনো সদস্যকে কথা বলতে না দিয়ে সমস্বরে চেঁচামেচি করাও সংসদীয় রীতি হতে পারে না।” নিজের দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি উভয় পক্ষকে পরমতসহিষ্ণু হওয়ার আহ্বান জানান।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সরকারের তথ্য প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশ বিভাগের অনিয়ম প্রতিরোধে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালে দেশে খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা কমেছে।”
ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীনের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, উপকূলীয় এলাকায় ‘অপারেশন রিস্টোর পিস’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং জলদস্যুদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে দেশে ২ হাজার ৬০৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছিল। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে ২ হাজার ৩৩২টিতে দাঁড়িয়েছে। মব সহিংসতার ঘটনা ৮৯টি থেকে কমে ৫৬টিতে এবং সংখ্যালঘু সংক্রান্ত সহিংসতার ঘটনা ৯৯৯টি থেকে ১৬৩টিতে নেমেছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশে দুর্নীতির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা হয়েছে। অপকর্মে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতির পাশাপাশি ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশি সেবায় স্বচ্ছতা আনতে ট্রাফিক জরিমানা, সাধারণ ডায়েরি ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ডিজিটাল করা হয়েছে এবং বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি। গোপন অভিযোগের জন্য কমপ্লেইন সেল এবং হেফাজতে নির্যাতন রোধে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে সরকারের অবস্থান অধিবেশনে পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও আলোচনা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, “বিগত ১৫ বছরের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করছে। ”
‘মক্কা প্যাক্ট’ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যকার এ চুক্তি আন্তর্জাতিক মুসলিম সমাজের সুরক্ষার জন্য ইতিবাচক ব্যবস্থা।” সদস্য দেশগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে সরকার তা ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করবে বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এ পদ বাংলাদেশের জন্য গৌরবের হলেও সভাপতিকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়।”
তিনি জানান, জলবায়ু অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক অনুদান আদায়ের লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ও আন্তঃসীমান্ত পানি সম্পদ’ নামে একটি বিশেষ অনুবিভাগ খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়নে ‘কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর’ পদ্ধতি চালুর কথাও জানান তিনি।
গঙ্গা চুক্তির নবায়নের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভারতের কাছে নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে কারিগরি মূল্যায়নের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে পর্যালোচনা উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকি বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চলমান, সংশোধনাধীন ও প্রাথমিক পর্যায়ের ২ হাজার ৪০০টির বেশি প্রকল্প পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অতীতে বিচ্ছিন্নভাবে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান। অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমাতে সমন্বিতভাবে প্রকল্প নেওয়ার নতুন নীতি বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
মেট্রোরেলসহ মেগা প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বেড়েছে। প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে খুঁটিনাটি বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।”
দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকটে বিরোধীদের ক্ষোভ সংসদে দেশের বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, জ্বালানির দাম, দ্রব্যমূল্য ও বেকারত্ব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট একসঙ্গে জনজীবনে চাপ তৈরি করেছে।”
বাজার পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। টিসিবির ট্রাকের পেছনে মানুষের দীর্ঘ লাইন তাদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরছে।”
সরকারের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে এই সংসদ সদস্য জানান, ইতোমধ্যে ৬২ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং ৯০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বলে তিনি দাবি করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন রুমিন ফারহানা। তাঁর ভাষ্য, দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪ জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলেও হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসত।
ওয়াকআউট বিরোধী দলের বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জ্বালানি সংকট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে শত শত কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে।”
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পাশাপাশি অতিরিক্ত ‘ভুতুড়ে বিল’ নিয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিরোধীদলীয় নেতা জানান, দেশের জনদুর্ভোগ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে আগে রাষ্ট্রপতি ও স্পিকারের কাছে জরুরি সংসদ অধিবেশন আহ্বানের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, সেই চিঠির বিষয়ে কোনো ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গণভোটে সংস্কারের পক্ষে মানুষের রায় পাওয়া সত্ত্বেও সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান না করে সেই জনরায়কে পাশ কাটানো হয়েছে।”
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ সংস্কার ও নির্বাচনসংক্রান্ত অন্তত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ অর্ডিন্যান্স ল্যাপস হতে দেওয়া হয়েছে।
‘বেসরকারি সদস্য দিবসে সরকারি বিল’ নিয়ে আপত্তি বিরোধীদলীয় নেতা সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার দাবি, বৃহস্পতিবারের অধিবেশনটি ‘বেসরকারি সদস্য দিবস’ হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ সংসদ সদস্যদের নোটিশ ও বেসরকারি বিলের পরিবর্তে সরকারি বিল উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আনা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট চারটি নোটিশ নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
স্পিকার বিরোধী সংসদ সদস্যদের কক্ষ ত্যাগ না করার অনুরোধ জানালেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করে অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে সরকারের অবস্থান সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের অস্তিত্ব বা বিধান নেই। তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানের অধীনেই নির্বাচন হয়েছে, সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ও শপথ নিয়েছেন। তাই একই সংবিধানের অধীনে নির্বাচিত সংসদকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ কোনো পরিষদের কথা বলা দ্বিমুখী নীতি।
সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি নিয়ে বিরোধী দলের সংশয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির কার্যপরিধির মধ্যেই সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি রয়েছে। বিরোধী দলের সদস্যদের কমিটিতে এসে নিজেদের প্রস্তাব ও মতামত দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদ কার্যকর রাখার আহ্বান বক্তব্যের শেষ দিকে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর রাখার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদকে আলোচনার মূল কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সংসদেই আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এদিকে, একই অধিবেশনে গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করা হয়। ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন করার জন্য আরেকটি বিল এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের জন্যও একটি বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়।
বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করে সংসদকে কার্যকর করতে চাই বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেই সংবিধান সংশোধন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের ওয়াকআউটের পর জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে চিফ হুইপ বলেন, “বিরোধী দলের অধিকাংশ সংসদ সদস্য এবারই প্রথম নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে শাহজাহান চৌধুরী একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথমবার সংসদ সদস্য হলে সংসদের কার্যপ্রণালি ও বিভিন্ন বিষয় বুঝতে কিছুটা সময় লাগে। প্রথমবার সংসদ সদস্য হওয়ার অনেকে অনেক কিছু বুঝতে পারেননি। আমি বিশ্বাস করি, তারা সময়ের সঙ্গে সংসদের কার্যক্রম বুঝবেন। এরপর তারা সংসদে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন। আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে সংবিধান সংশোধনের কাজ করব।”
বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদে যেমন বক্তব্য দিয়েছেন, বাইরে এসেও বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। তাদের বক্তব্য শুনে কিছুটা হতাশ হওয়ার কথা জানান তিনি।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দেওয়ার প্রসঙ্গে চিফ হুিইপ বলেন, “সংসদ আহ্বানের এখতিয়ার বিরোধী দলের কোনো সদস্যের নেই। তারপরও তাদের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই অধিবেশন ডাকা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এই সংসদ আরো পরে বসার কথা ছিল। সেপ্টেম্বর মাসে অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিরোধী দলের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমরা অধিবেশন এগিয়ে এনে ২৭ আগস্ট থেকে শুরু করেছি। এতে সরকারের অনেক অসুবিধা হয়েছে, তারপরও আমরা তাদের অনুরোধকে গুরুত্ব দিয়েছি।”
তিনি বলেন, “সংবিধানের একটি কমা, একটি দাঁড়ি বা একটি সেমিকোলন পরিবর্তন করাও সংবিধান সংশোধনের অংশ। কাজেই সংস্কারের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। আমরা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চাই।”
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে চিফ হুইপ বলেন, “অনেক মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশে গণতন্ত্রের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই গণতন্ত্রকে নষ্ট করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। আমরা রক্ত দিয়েছি, জেল-জুলুম সহ্য করেছি। বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মীও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন। এত ত্যাগের বিনিময়ে যে গণতন্ত্র আমরা পেয়েছি, সেটাকে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।”








