• ঝরে পড়ার হার ৩৬ শতাংশ, কারিগরিতে বেশি
  • নেপথ্যে রাজনীতি-শিক্ষাঙ্গনে টানা অস্থিরতা
  • তরুণদের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়াও দায়ী
  • শিক্ষামন্ত্রীর উদ্বেগ, কারণ অনুসন্ধানে বোর্ড

গণঅভ্যুত্থানের বছর ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করে ১৬ লাখ ৮১ হাজার ৬৮৮ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৩২ জন শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে তারা রেজিস্ট্রেশন করে। তবে তাদের মধ্যে ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জন শিক্ষার্থী এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বসছে না; শতাংশের হিসাবে যা ৩৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মোর্চা বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্য বিশ্লেষণে ঝরে পড়ার এ তথ্য পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) থেকে শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উদ্বেগও জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। রেজিস্ট্রেশন করেও এতসংখ্যক শিক্ষার্থী এইচএসসিতে বাদ পড়ার কারণ খোঁজার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রতি শিক্ষাবর্ষে ঝরে পড়ার চিত্র রয়েছে। তবে ২০২৪ সালে এসএসসি পাস করাদের মধ্যে ঝরে যাওয়ার হার বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেশি। গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা এবং তরুণদের অতিমাত্রায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়াও এর পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ফল প্রকাশও ঝরে পড়ার নেপথ্যে কাজ করতে পারে।

ঝরে পড়েছে ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী, বেশি কারিগরিতে

দেশের সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যমতে, এসএসসি পাস করে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন করে ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী। এক বছর পর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে তাদের মধ্যে ফরম পূরণ করেছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন। আর নিয়মিত শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বে ফরম পূরণ করেনি ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন। শতাংশের হিসাবে ফরম পূরণ না করা শিক্ষার্থীর হার ৩৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

আগে মেয়েরা ঝরে পড়তো। সামাজিক কারণ ছিল, অর্থনৈতিক কারণ ছিল। এখন মেয়েদের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের ঝরে পড়াটাও উদ্বেগজনক। তারা কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে...অস্থির রাজনীতিতে জড়িয়ে ছাত্রজীবন হারিয়ে ফেলছে।—রাশেদা কে চৌধূরী

বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিল পাস করে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আলিম শ্রেণিতে ভর্তি এবং রেজিস্ট্রেশন করে এক লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী। তবে চলতি বছরের আলিম পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন। আর ফরম পূরণ করেনি ৬১ হাজার ৬৬০ জন। শতাংশের হিসাবে এ হার ৪৪ দশমিক ০৭ শতাংশ।

আরও পড়ুন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি কম, ঝরে পড়ার হার বেশি: শিক্ষামন্ত্রী

কারিগরি বোর্ডের অধীন ২০২৪ সালে এসএসসি পাস করে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশে ভর্তি হয়ে রেজিস্ট্রেশন করে এক লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন। তাদের মধ্যে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন। আর ঝরে গেছেন ৯০ হাজার ৩৪৫ জন। কারিগরিতে রেজিস্ট্রেশন করা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

ঝরে পড়া বাড়ছে কেন, কী বলছেন শিক্ষাবিদরা

২০২২ ও ২০২৩ সালে এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা একাদশে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন, তাদের মধ্যে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ, ২০ শতাংশের কিছু বেশি শিক্ষার্থী ওই দুই শিক্ষাবর্ষে ঝরে পড়েছিলেন। ২০২৪ সালে পাস করে ভর্তি হওয়াদের ঝরে পড়ার হার সে তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ (৩৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ)।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম রাজনৈতিক ও শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা।

এতসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী কোথায় গেলো, কেন তারা এইচএসসি পরীক্ষায় বসতে পারলো না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।—শিক্ষামন্ত্রী

‘চব্বিশের যে অভ্যুত্থান সেখানে ১২ থেকে ২২ বছরের কিশোর-তরুণদের অংশগ্রহণ বেশি ছিল। পরবর্তীতে তারা নানান রাজনৈতিক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ভিন্ন মতাদর্শের কিংবা তাদের পরিবার ভিন্নমতের হওয়ায় কলেজে যেতেও ভয় পেয়েছে। হয়তো অনেকে কলেজে আর যায়নি। কারণ, শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপকভাবে ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের হেনস্থার ঘটনা ঘটেছে’—জাগো নিউজকে বলছিলেন ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘আবার যারা অভ্যুত্থানের পক্ষের ছিল, তারাও হঠাৎ অতিমাত্রায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। এসএসসি পেরোনো তরুণ হয়তো একটি রাজনৈতিক দলের নেতা বনে গেছে। যার হয়তো বড়জোর ছাত্ররাজনীতি করার কথা, সে এখন জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়...এসব তো বাস্তবতা।’

আরও পড়ুন

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অনেক কারণ খুঁজে পেয়েছি: বিধান রঞ্জন

‘আবার ২০২৪ সালে কিছু পরীক্ষা হলো, কিছু বাতিল করে সাবজেক্ট ম্যাপিং করে ফল প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছিল। দেখা যাবে, সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের কারণে অনেকে এসএসসি ‍উতরে গেছে, কিন্তু এইচএসসিতে হয়তো মানিয়ে নিতে পারেনি। সেটা যা-ই ঘটুক, এতসংখ্যক ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে হবে এবং ঝরে পড়া ঠেকাতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে’—যোগ করেন তিনি। 

কী বলছে শিক্ষা বোর্ড

এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও ঝরে পড়ার হার বাড়ায় উদ্বেগ জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এতসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী কোথায় গেলো, কেন তারা এইচএসসি পরীক্ষায় বসতে পারলো না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।

যারা অভ্যুত্থানের পক্ষের ছিল, তারাও হঠাৎ অতিমাত্রায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। এসএসসি পেরোনো তরুণ হয়তো একটি রাজনৈতিক দলের নেতা বনে গেছে। যার হয়তো বড়জোর ছাত্ররাজনীতি করার কথা, সে এখন জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়...এসব তো বাস্তবতা।—ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ

জানতে চাইলে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অনেকে ফরম পূরণ করেনি। কেন তারা ঝরে গেলো, এবারের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারলো না; তা বের করা হবে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

এইচএসসির খাতা পুনর্মূল্যায়ন হবে, যা-তা নম্বর দিলেই ব্যবস্থা

এ বিষয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঝরে পড়াটা নতুন নয়। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হলো- ঝরে পড়ার হারটা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এটা হঠাৎ এবার এতো বাড়লো কেন? আগামী বছরগুলোতেও কি এ ধারা অব্যাহত থাকবে? সরকারের পদক্ষেপটা কী?’

রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘আগে মেয়েরা ঝরে পড়তো। সামাজিক কারণ ছিল, অর্থনৈতিক কারণ ছিল। এখন মেয়েদের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের ঝরে পড়াটাও উদ্বেগজনক। তারা কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে...অস্থির রাজনীতিতে জড়িয়ে ছাত্রজীবন হারিয়ে ফেলছে। এসব নিয়ে কথা বলার উপায়ও আবার নেই।’

‘আমাদের স্থির হতে হবে, ভাবতে হবে এবং সমস্যা নিরসন করতে হবে। ওদের (ছাত্র-ছাত্রী) মনোজগতে স্থিরতা আনতে হবে। সরকার, অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী সবাইকে সমানভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে’—এমনটিই মনে করছেন তিনি। 

এএএইচ/এমকেআর