বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই একটি নিবিড় সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এখানে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, পাড়া-মহল্লা এবং স্থানীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। যে কোনো পারিবারিক বা সামাজিক সংকট—তা হোক তীব্র অসুস্থতা, বিধ্বংসী বন্যা, চরম দারিদ্র্য, আকস্মিক বেকারত্ব কিংবা দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক কলহ—মানুষ কখনো নিজেকে একা ভাবত না। সমাজবদ্ধ মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াত এক অলিখিত সামাজিক চুক্তির টানে।

এই সামাজিক আস্থা, পারস্পরিক নিঃস্বার্থ সহযোগিতা এবং সমষ্টিগত দায়িত্ববোধই ছিল এই ভূখণ্ডের টিকে থাকার মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু গত তিন দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির অনুপ্রবেশ, অনিয়ন্ত্রিত ও দ্রুত নগরায়ণ, অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তির আগ্রাসী বিস্তার, বিশ্বায়ন এবং তীব্র ভোক্তাবাদী সংস্কৃতির প্রসারের ফলে সেই চেনা সামাজিক কাঠামোটি চোখের পলকে বদলে যাচ্ছে। যৌথ পরিবারের স্থান নিচ্ছে অণু পরিবার, আর পারস্পরিক আস্থার জায়গা দখল করছে গভীর সংশয়। এই পটভূমিতে আজ একটি অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে—বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে এমন এক আত্মকেন্দ্রিক সমাজে পরিণত হচ্ছে, যাকে বিখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী উলরিখ বেক তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘রিস্ক সোসাইটি: টুওয়ার্ডস আ নিউ মডার্নিটি’ (১৯৯২)-এ "ঝুঁকির সমাজ" (Risk Society) হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন?

উলরিখ বেকের সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের মূল নির্যাস হলো—আধুনিক সমাজের সবচেয়ে বড় ও কূটাভাসীয় বৈশিষ্ট্য হলো উন্নয়নের সমান্তরালে নতুন এবং অত্যন্ত জটিল ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি হওয়া। আদিম বা প্রাক-আধুনিক যুগে মানুষ প্রধানত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ, খরা কিংবা মহামারির মতো বাহ্যিক ঝুঁকির মুখোমুখি হতো, যা ছিল বহুলাংশে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু উত্তর-আধুনিক যুগে এসে শিল্পায়ন, অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি, ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, পুঁজিবাদের আর্থিক অস্থিরতা, সাইবার অপরাধ, তীব্র মানসিক চাপ এবং কর্মসংস্থানের চরম অনিশ্চয়তার মতো যে সমস্ত ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে মানুষের নিজের তৈরি। বেক দেখিয়েছেন, এই নতুন ধরনের ঝুঁকিগুলোর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এসব ঝুঁকি মোকাবিলা বা ব্যবস্থাপনার দায়ভার ক্রমশ সমাজ, গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের কাঁধ থেকে অপসৃত হয়ে এককভাবে ব্যক্তির ওপর এসে পড়ছে। রাষ্ট্র বা সমাজ এখন আর নাগরিকের জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারছে না, বরং ব্যক্তিকেই তার নিজের সুরক্ষার পথ খুঁজে নিতে হচ্ছে।

ওপর। আমাদের এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে যা ব্যক্তির স্বাধীনতা, মেধা ও নতুন উদ্যোগকে সর্বোচ্চ উৎসাহিত ও পুরস্কৃত করবে, কিন্তু একই সাথে সমাজের সেই চিরায়ত ঐতিহ্যগত সংহতি, পারস্পরিক নিঃস্বার্থ আস্থা এবং সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রাচীরটিকেও কোনোভাবেই ধসে পড়তে দেবে না। কারণ যেকোনো সভ্য ও টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত পরিমাপক কেবল জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা বহুতল ভবনের সংখ্যা নয়; বরং সেটি হলো এমন একটি মানবিক সমাজব্যবস্থা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরকে যদি আমরা উলরিখ বেকের এই তত্ত্বের আলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে যে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক চোখধাঁধানো উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের ভেতরের জীবন দিন দিন আরও বেশি অনিশ্চিত ও ভঙ্গুর হয়ে উঠছে। আজ দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণরা দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষ করেও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ন্যূনতম নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এক ধরনের নীরব অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে।

অন্যদিকে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং শহরের বস্তিগুলোতে ভাসমান জনসংখ্যা হিসেবে যোগ দিচ্ছে। আমাদের হাতের মুঠোয় আসা ডিজিটাল প্রযুক্তি যেমন ফ্রিল্যান্সিং বা যোগাযোগের নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, ঠিক তেমনি ভুয়া তথ্যের মহামারি, সাইবার বুলিং, নিখুঁত অনলাইন প্রতারণা এবং গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সম্পূর্ণ নতুন ও কৃত্রিম ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই ঝুঁকিগুলো থেকে বাঁচার জন্য আজ কোনো সামাজিক ঢাল নেই; ব্যক্তিকে নিজেই তার সাইবার নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ লড়তে হচ্ছে।

এই রূপান্তরের সমাজতাত্ত্বিক পূর্বাভাস অবশ্য আরও অনেক আগেই দিয়েছিলেন আরেকজন বিখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ফার্দিনান্দ টনিস তাঁর ক্লাসিক গ্রন্থ ‘গেমাইনশ্যাফট উন্ড গেজেলশ্যাফট’ (১৮৮৭)-এ। তিনি মানব সমাজকে দুটি মৌলিক আদর্শিক রূপের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, ‘গেমাইনশ্যাফট’ (Gemeinschaft) বা ঐতিহ্যবাহী সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো গড়ে ওঠে মূলত রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়তা, অগাধ পারস্পরিক বিশ্বাস, প্রাচীন ঐতিহ্য এবং স্বতঃস্ফূর্ত দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে, যেখানে সমষ্টির স্বার্থই প্রধান। অন্যদিকে, ‘গেজেলশ্যাফট’ (Gesellschaft) বা আধুনিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজে মানবিক সম্পর্কগুলো নিয়ন্ত্রিত হয় সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ, আইনি চুক্তি, আনুষ্ঠানিকতা এবং পেশাগত প্রয়োজনের কড়া হিসাবে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে গেমাইনশ্যাফটের আন্তরিক বৈশিষ্ট্যগুলো সগৌরবে বহন করে এসেছে। কিন্তু বর্তমানের অতি-নগরায়ণ, ব্যাপক অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অভিবাসন এবং আধুনিক ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টভিত্তিক যান্ত্রিক নগরজীবনের ফলে সেই আন্তরিক সম্পর্কগুলো ক্রমেই গেজেলশ্যাফটের আত্মাহীন অবয়বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আজ ঢাকার একটি বহুতল ভবনে বসবাসকারী একজন নাগরিক তাঁর পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীর বিপদের খবর রাখার চেয়ে তাঁর করপোরেট অফিসের সহকর্মীকে বেশি চেনেন। বাস্তব বা শরীরী সামাজিক যোগাযোগের পরিবর্তে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মতো ভার্চুয়াল লাইক-কমেন্টের কৃত্রিম যোগাযোগই এখন আমাদের প্রধান সামাজিক পরিচয় হয়ে উঠছে।

এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতার যে একটি মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি রয়েছে, তা ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ডিভিশন অব লেবার ইন সোসাইটি’ (১৮৯৩) এবং ‘সুইসাইড’ (১৮৯৭)-এ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন। দুর্খেইমের মতে, সমাজে যখন দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে পারস্পরিক সংহতি ও নৈতিক বন্ধনগুলো শিথিল বা দুর্বল হয়ে যায়, তখন মানুষ ‘অ্যানোমি’ (Anomie) বা এক ধরনের চরম মূল্যবোধগত অনিয়ম ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পতিত হয়।

এই অবস্থায় ব্যক্তি নিজেকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, অভিভাবকহীন এবং একা অনুভব করে, যা মানুষের ভেতরের মানসিক চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমান বাংলাদেশের তরুণ সমাজের দিকে তাকালে দুর্খেইমের এই কালজয়ী বিশ্লেষণের ভয়াবহ প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমসাময়িক তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্লিনিক্যাল উদ্বেগ, গভীর বিষণ্ণতা, চরম একাকিত্ব, আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যে ভয়াবহ সংকট আমরা চারদিকে দেখতে পাচ্ছি, তা মূলত এই অ্যানোমি বা সামাজিক সংহতি ভেঙে পড়ারই এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। সমাজ আজ ব্যক্তিকে সফল হওয়ার জন্য তীব্র চাপ দিচ্ছে, কিন্তু ব্যর্থতায় তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো সংহতি বা আশ্রয় অবশিষ্ট রাখেনি।

ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থনি গিডেন্স তাঁর ‘মডার্নিটি অ্যান্ড সেলফ-আইডেন্টিটি’ (১৯৯১) গ্রন্থে এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রক্রিয়াটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে, উত্তর-আধুনিক সমাজে মানুষ আর কেবল তার পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য, বংশমর্যাদা বা পারিবারিক পরিচয়ের চেনা ছকে পরিচালিত হতে পারে না। বরং এই সমাজে প্রত্যেকটি ব্যক্তিমানুষকে তার নিজের জীবনপথ সম্পূর্ণ নিজেকেই ক্রমাগত অন্বেষণ ও নির্মাণ করতে হয়। শিক্ষা, পেশা নির্বাচন, জীবনসঙ্গী বাছাই, দেশান্তর কিংবা নিজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ—সবকিছুই এখন এক একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশেও আজ একজন তরুণকে রাষ্ট্র বা সমাজের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকেই এককভাবে পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। এই তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবস্থায় সে যদি সফল হয়, তবে সমাজ তাকে ব্যক্তিগত কৃতিত্ব বা জিনিয়াস হিসেবে হাততালি দেয়। কিন্তু সে যদি কোনো কারণে ব্যর্থ হয়, তবে সমাজ অত্যন্ত নির্মমভাবে সেটিকেও তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা অলসতা হিসেবেই বিবেচনা করে। অথচ সমাজ চতুরতার সাথে আড়াল করে ফেলে যে, এই ব্যর্থতার পেছনে আসলে ব্যক্তির কোনো হাত ছিল না, বরং দায়ী ছিল রাষ্ট্রের ভেতরের গভীর কাঠামোগত বৈষম্য, কোটা-স্বজনপ্রীতি, পুঁজির অভাব কিংবা ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার মতো সামষ্টিক সীমাবদ্ধতাগুলো।

এই উদীয়মান ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাকে আরও বেশি উসকে দিচ্ছে এবং ভেতর থেকে শক্তিশালী করছে বর্তমানের সর্বগ্রাসী ভোক্তাবাদী সংস্কৃতি। ফরাসি উত্তর-আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক জ্যাঁ বোদ্রিয়ার তাঁর ‘দ্য কনজিউমার সোসাইটি’ (১৯৭০) গ্রন্থে বলেছিলেন যে, আধুনিক বা উত্তর-আধুনিক সমাজে মানুষ কেবল তার মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য কোনো পণ্য ভোগ করে না। বরং সে পণ্য ভোগ করে সমাজে নিজের উচ্চতর অবস্থান, আভিজাত্য এবং কৃত্রিম সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন বা জাহির করার জন্য।

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির দৈনন্দিন জীবনযাত্রার দিকে তাকালে বোদ্রিয়ারের এই ‘সিমুলাক্রা’ বা চিহ্নের রাজনীতির সত্যতা প্রতিমুগ্ধে প্রমাণিত হয়। আলিশান ফ্ল্যাট, নামী ব্র্যান্ডের গাড়ি, আইফোন, ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কৃত্রিম সুখী জীবনের অতি-প্রদর্শন—এসবই এখন একজন মানুষের সামাজিক পরিচয়ের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠছে। এর ফলে সমাজের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহযোগিতার ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির পরিবর্তে তৈরি হচ্ছে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা, হিংসা এবং ক্রমাগত সামাজিক তুলনার এক ধ্বংসাত্মক মনস্তত্ত্ব। ‘কার চেয়ে কে বেশি ভোগ করতে পারল’—এই ইঁদুরদৌড়ে শামিল হতে গিয়ে মানুষ তার পাশের মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের প্রতি সম্পূর্ণ অন্ধ ও উদাসীন হয়ে পড়ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এক চরম অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে, যার ব্যাখ্যা আমরা পাই ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ গাই স্ট্যান্ডিং-এর ‘দ্য প্রিকেরিয়েট: দ্য নিউ ডেঞ্জারাস ক্লাস’ (২০১১) গ্রন্থে। স্ট্যান্ডিং উত্তর-আধুনিক বিশ্বে এমন একটি নতুন সামাজিক শ্রেণির উত্থানের কথা বলেছেন, যাদের তিনি ‘প্রিকেরিয়েট’ বা ‘অনিশ্চিত সর্বহারা’ নামে অভিহিত করেছেন। এই শ্রেণির মানুষেরা মূলত কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিহীন, অনিয়মিত কর্মসংস্থান, তীব্র অস্থির আয় এবং নামমাত্র বা শূন্য সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে এক চরম অনিশ্চিত জীবনযাপন করে।

বাংলাদেশের বর্তমান কর্মক্ষম যুবসমাজ, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বিশাল অংশ আজ হুবহু এই প্রিকেরিয়েট শ্রেণির বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রিল্যান্সিং, রাইড শেয়ারিং, ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মতো গিগ ইকোনমি, চুক্তিভিত্তিক থার্ড-পার্টি চাকরি এবং অনিশ্চিত বিদেশমুখী কর্মসংস্থান আপাতদৃষ্টিতে কিছু নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করলেও, এগুলো একজন তরুণের জীবন বা পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, পেনশন বা চিকিৎসার কোনো ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে এই তরুণরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও মানসিকভাবে তীব্র এক অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যে দিনাতিপাত করছে, যা যেকোনো মুহূর্তে তাদের জীবনকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার এই আগ্রাসী থাবার পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক বাস্তব অভিঘাত আজ বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে ‘ঝুঁকির সমাজে’র অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জীবন্ত উদাহরণে পরিণত করেছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে হঠাৎ তীব্র খরা ও আকস্মিক বন্যা, দক্ষিণে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘন ঘন শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, মাটির গভীরে লবণাক্ততার প্রবেশ এবং দেশজুড়ে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ এখন আর কেবল পরিবেশবিজ্ঞানীদের গবেষণার কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এই পরিবেশগত বিপর্যয়গুলো সরাসরি আঘাত হানছে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ বলপ্রয়োগমূলক অভিবাসনের ওপর।

একটি নদীভাঙনে যখন একটি গ্রামীণ পরিবারের সব সম্বল এক রাতে বিলীন হয়ে যায়, তখন সেই ঝুঁকি কোনো একজন ব্যক্তি বা কেবল একটি ক্ষুদ্র গ্রামীণ সম্প্রদায়ের পক্ষে একা মোকাবিলা করা অসম্ভব। এই ধরনের বিশাল ও বৈশ্বিক ঝুঁকিগুলো মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা, উন্নত বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং জোরালো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। কিন্তু রাষ্ট্র যখন এই সামষ্টিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পিছিয়ে পড়ে, তখন প্রান্তিক মানুষগুলো সামাজিক সংহতির অভাবের কারণে আরও বেশি অসহায় ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে।

তবে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বা আধুনিকায়নের এই পুরো প্রক্রিয়ার সব দিকই যে কেবল নেতিবাচক, তা কিন্তু নয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডেভেলপমেন্ট অব ফ্রিডম’ (১৯৯৯)-এ অত্যন্ত জোরালোভাবে যুক্তি দিয়েছেন যে, প্রকৃত উন্নয়নের মূল লক্ষ্য ও মাপকাঠি হওয়া উচিত মানুষের ব্যক্তিগত সক্ষমতা (Capability), স্বাধীন চিন্তা এবং জীবনযাপনের ক্ষেত্রে নিজস্ব বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগের পরিধি বৃদ্ধি করা। এই নিরিখে বিচার করলে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে নারীর অভাবনীয় ক্ষমতায়ন, শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার, তরুণ উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তির লোকায়ত উদ্ভাবনের মাধ্যমে সমাজ এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ক্ষেত্রে এক অনন্য ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

একজন ব্যক্তির নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করার এই স্বাধীনতা ও সক্ষমতার বিকাশ যেকোনো আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। কিন্তু কূটাভাসটি সেখানেই ঘটে, যখন ব্যক্তির এই অর্জিত স্বাধীনতা ও চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা যদি সমাজের সেই প্রাচীন ও শক্তিশালী ঐতিহ্যগত সংহতি, পারস্পরিক আস্থার বন্ধন এবং যৌথ সামাজিক পুঁজিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস বা দুর্বল করে দেয়, তবে সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নের মূল নৈতিক ভিত্তিটিই চরমভাবে নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ আজ তার ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আমাদের চমৎকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও চোখধাঁধানো প্রযুক্তিগত উন্নয়ন তরুণ প্রজন্মের সামনে নতুন নতুন সম্ভাবনার শত শত দ্বার খুলে দিয়েছে, কিন্তু ঠিক তার উল্টো পিঠেই জন্ম দিয়েছে এক চরম একাকী, বিচ্ছিন্ন এবং নিরাপত্তাহীন নতুন সামাজিক ঝুঁকির। তাই উন্নয়নের এই পরবর্তী ধাপে এসে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের কেবল বড় বড় মেগা-অবকাঠামো নির্মাণ, জিডিপির কাগুজে বৃদ্ধি কিংবা যান্ত্রিক প্রযুক্তি আমদানির ওপর জোর দিলেই চলবে না। তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের ভেঙে পড়া সামাজিক আস্থা পুনর্নির্মাণ, নাগরিক অধিকারের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং বাঙালির সেই চিরন্তন পারস্পরিক সহযোগিতার মানবিক সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার ওপর।

উলরিখ বেক তাঁর তত্ত্বের শেষাংশে আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, আধুনিকতা মানুষকে যেমন সীমাহীন নতুন সুযোগ ও মুক্তির স্বাদ দেয়, ঠিক তেমনি উপহার দেয় নিজের তৈরি নতুন এক মহাসংকট বা ঝুঁকির জাল। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্ব মূলত নির্ভর করবে এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই সমন্বয় রক্ষার ওপর। আমাদের এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে যা ব্যক্তির স্বাধীনতা, মেধা ও নতুন উদ্যোগকে সর্বোচ্চ উৎসাহিত ও পুরস্কৃত করবে, কিন্তু একই সাথে সমাজের সেই চিরায়ত ঐতিহ্যগত সংহতি, পারস্পরিক নিঃস্বার্থ আস্থা এবং সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রাচীরটিকেও কোনোভাবেই ধসে পড়তে দেবে না। কারণ যেকোনো সভ্য ও টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত পরিমাপক কেবল জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা বহুতল ভবনের সংখ্যা নয়; বরং সেটি হলো এমন একটি মানবিক সমাজব্যবস্থা— যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজের গতিতে স্বাধীনভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, কিন্তু দিনশেষে কোনো একটি সম্প্রদায় বা অবহেলিত মানুষও পেছনে পড়ে থাকবে না।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।

এইচআর/এএসএম