রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় মেট্রোরেল এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। যে শহরে একসময় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা ছিল নাগরিক জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা, সেখানে মেট্রোরেল মানুষের সময়, শ্রম ও অর্থ—সবই সাশ্রয় করছে। বিশেষ করে মিরপুর, পল্লবী, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার মতো এলাকায় বসবাসকারীদের জীবনযাত্রায় এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। যাতায়াত সহজ হওয়ায় এই এলাকাগুলো দ্রুতই ঢাকার অন্যতম আকর্ষণীয় আবাসিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। একের পর এক বহুতল ভবন উঠেছে, বেড়েছে জনসংখ্যা, বেড়েছে আবাসনের চাহিদা।

কিন্তু উন্নয়নের এই গল্পের আড়ালে তৈরি হয়েছে আরেকটি গভীর সংকট। যে মিরপুর মেট্রোরেলের জন্য প্রশংসিত, আজ সেই মিরপুর পানির অভাবে হাঁসফাঁস করছে। উন্নত যোগাযোগের সুফলকে ম্লান করে দিয়েছে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানির সংকট। প্রশ্ন হলো, একটি আধুনিক নগরে কীভাবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আমরা কি অবকাঠামো উন্নয়ন করছি, নাকি পরিকল্পনার অসম্পূর্ণতার কারণে নতুন সংকট তৈরি করছি?

মিরপুরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াসার পানির সংকট থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মনিপুর, পল্লবীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় দিনের পর দিন পর্যাপ্ত পানি মিলছে না। কোথাও নির্ধারিত সময়ে পানি আসে না, কোথাও পানির চাপ এত কম যে মোটর চালিয়েও প্রয়োজনীয় পানি ওঠে না। ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

পানির এই সংকট কেবল একটি ভোগান্তির গল্প নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নগর অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও। রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া কিংবা শিশু ও বয়স্কদের পরিচ্ছন্নতা—সব ক্ষেত্রেই সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে জারজাত পানি কিনছে কিংবা বিকল্প উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করছে। এতে মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি অনেকে মিরপুর ছেড়ে অন্য এলাকায় বাসা নেওয়ার কথাও ভাবছেন।

ঢাকা যদি সত্যিই একটি টেকসই, বাসযোগ্য এবং আধুনিক মহানগর হতে চায়, তাহলে পানিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতেই হবে। মেট্রোরেলের সাফল্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন মিরপুরের একজন বাসিন্দা দ্রুত কর্মস্থলে পৌঁছানোর পাশাপাশি বাড়ি ফিরে কল খুললেই পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পাবেন। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড সেখানেই।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট শুধু আবাসিক এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ, মসজিদ, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানও পানির অভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। নিরাপদ পানির অভাব ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ব্যাহত করে, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুবার সতর্ক করেছে, নিরাপদ পানির অভাব শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক কল্যাণের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

ঢাকা ওয়াসার ব্যাখ্যাও অযৌক্তিক নয়। তাদের মতে, মেট্রোরেল চালুর পর মিরপুরে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন নতুন বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। বেড়েছে ভাড়াটে ও স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা। ফলে পানির চাহিদা যে হারে বেড়েছে, সরবরাহব্যবস্থা সেই হারে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগারের যান্ত্রিক ত্রুটি। স্বাভাবিক সময়ে এই শোধনাগার থেকে প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হয়, যা মূলত বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় যায়। গত জুন মাসে ট্রান্সফরমার ও জেনারেটরের ত্রুটির কারণে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ৯ কোটি লিটার পানি কম সরবরাহ হয়েছে। এই ঘাটতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে আগে থেকেই সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে।

তবে এই ব্যাখ্যা একটি বড় বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে আসে। মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নাগরিক সেবার সক্ষমতা কতটা বাড়ানো হয়েছে? যদি একটি পরিবহন প্রকল্প নতুন জনবসতি সৃষ্টি করে, তাহলে তার সমান্তরালে নগরসেবার সম্প্রসারণও হওয়া উচিত ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের পরিকল্পনা এখনো খণ্ডিত। একটি সংস্থা রাস্তা বানায়, অন্য সংস্থা বিদ্যুৎ দেখে, আরেকটি পানি সরবরাহ করে। কিন্তু সমন্বিত নগর পরিকল্পনার অভাবে উন্নয়নের সুফল অনেক সময় নতুন সংকটে পরিণত হয়।

ঢাকার পানি সংকট অবশ্য নতুন নয়। বহু বছর ধরেই রাজধানীর বড় অংশ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও তীব্র হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং জলাধার ভরাটের কারণে প্রাকৃতিক পুনর্ভরণও কমে যাচ্ছে।

বিশ্বের অনেক বড় শহর এই সংকট মোকাবিলায় বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে। সিঙ্গাপুর পুনর্ব্যবহৃত পানি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে ব্যবহারের মাধ্যমে পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। টোকিওতে পাইপলাইনের পানি অপচয় কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। কোপেনহেগেন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে দীর্ঘমেয়াদি জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, কেবল নতুন পানি উৎপাদন করলেই হবে না; সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও সমান জরুরি।

ঢাকার ক্ষেত্রেও এখন সময় এসেছে সমন্বিত জলনীতি গ্রহণের। ভাকুর্তা বা পদ্মানির্ভর একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। নতুন পানি শোধনাগার নির্মাণের পাশাপাশি পাইপলাইনের লিকেজ কমানো, স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা এবং ভবন নির্মাণের অনুমোদনের সময় পানি সরবরাহ সক্ষমতা মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার পানি, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশনের ধারণক্ষমতা যাচাই করা উচিত।

একই সঙ্গে ভবনগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। অনেক উন্নত শহরে বড় ভবনগুলো নিজেদের পানির একটি অংশ নিজেরাই সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও বাণিজ্যিক ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ব্যবস্থা ধীরে ধীরে চালু করা সম্ভব।

নগর পরিকল্পনাবিদদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানো। ঢাকার আশপাশে পরিকল্পিত উপশহর এবং বিকল্প অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারলে পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহনসহ সব ধরনের নাগরিক সেবার ওপর চাপ কমবে। অন্যথায় প্রতিটি নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে নতুন সংকটও যুক্ত হতে থাকবে।

নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার, অবৈধ সংযোগ, পাইপলাইনের অপচয় কিংবা ভূগর্ভস্থ পানি নির্বিচারে উত্তোলন—এসব অভ্যাস পরিবর্তন না হলে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট হবে না। পানি ভবিষ্যতের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। এর সাশ্রয়ী ব্যবহারকে নাগরিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত করতে হবে।

মেট্রোরেল আমাদের দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দক্ষ বাস্তবায়ন থাকলে বাংলাদেশ বড় অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে। এখন সেই সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে মৌলিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও। কারণ একটি শহরের আধুনিকতার পরিচয় শুধু দ্রুতগতির ট্রেনে নয়; প্রতিটি নাগরিকের বাসায় নিরাপদ পানির ধারাবাহিক সরবরাহেও নিহিত।

ঢাকা যদি সত্যিই একটি টেকসই, বাসযোগ্য এবং আধুনিক মহানগর হতে চায়, তাহলে পানিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতেই হবে। মেট্রোরেলের সাফল্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন মিরপুরের একজন বাসিন্দা দ্রুত কর্মস্থলে পৌঁছানোর পাশাপাশি বাড়ি ফিরে কল খুললেই পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পাবেন। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড সেখানেই। অন্যথায় আমরা হয়তো নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করব, কিন্তু নাগরিক জীবনের মৌলিক সংকট থেকে কখনোই মুক্তি পাব না।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/এএসএম