বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ চলছে। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি চলছে বাকযুদ্ধও। পুরো বিশ্বের মানুষ যেন এই যুদ্ধে অংশীদার হয়ে গেছে।
বিনোদনমূলক এই বিশ্ব-উৎসব থেকে ইগো স্যাটিসফাই করার জন্য দলাদলি, মারপিট, খুন, হার্ট এটাক, সুইসাইডের মতো ঘটনা চমকে দিচ্ছে আমাদের। ব্যথিত করছে, কষ্ট দিচ্ছে। আনন্দময় খেলা বিষাদের রূপ নিয়েছে।এসব কারণে একটা মনস্তাত্ত্বিক সিরিয়াস লেখার চাপ এসেছে আমার কাছে। সেই চাপ এবং দায়বদ্ধতা থেকে এই লেখা। সহজ-সরল কথায় বেপরোয়া দর্শকদের জন্য লিখতে চাই এই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।

পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এই খেলা নিয়ে বেঁচে থাকে। খেলা মানুষের শরীর ও মনের জন্য উপকারী। এটি আনন্দ দেয়, উত্তেজনা দেয়, একঘেয়ে জীবন থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। পরিবার ও বন্ধুদের একত্র করে। এমনকি প্রিয় দলের জয় আমাদের মস্তিষ্কে আনন্দ-সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক নিঃসরণও বাড়াতে পারে।

কিন্তু একটা প্রশ্ন আমাদের ভাবিয় তুলেছে—কেন খেলা কখনও কখনও গালি, ট্রল, মারামারি, হার্ট অ্যাটাক, এমনকি আত্মহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের মনস্তত্ত্বে।

আমরা অনেক সময় অজান্তেই একটা দলকে শুধু সমর্থন করি না; নিজের পরিচয়ের অংশ বানিয়ে ফেলি। তখন 'আমি আর্জেন্টিনা', 'আমি ব্রাজিল, 'আমি স্পেন', 'আমি ফ্রান্স', 'আমি নরওয়ে' কিংবা 'মিশর' হয়ে উঠি—এই কথাগুলো শুধু সমর্থন নয়, আত্মপরিচয়েরও রূপ নেয়। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে 'সোশ্যাল আইডেন্টিটি' বলা হয়। তখন দলের জয়কে নিজের জয় এবং দলের পরাজয়কে নিজের পরাজয় বা অপমান বলে মনে হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইগো, কিংবা ইগো কমপ্লেক্স। প্রিয় দল জিতলে মনে হয়, 'আমি জিতেছি'। হারলে মনে হয়, 'আমি হেরে গেছি'।

ফলে অন্যকে ছোট করা, ট্রল করা বা অপমান করার প্রবণতা বেড়ে যায়। বাস্তবে প্রতিপক্ষের সমর্থক আমাদের শত্রু নয়; কিন্তু আবেগের মুহূর্তে মস্তিষ্ক তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করে। শুদ্ধতম মজা করতে করতে অনেক সময় আমরা সীমা লঙ্ঘন করে ফেলি। সীমা লঙ্ঘনকারীকে স্বয়ং মহান আল্লাহও ক্ষমা করেন না।

আরও একটা বিষয় ঘটে। খেলা দেখার সময় আবেগ, অ্যাড্রেনালিন ও উত্তেজনা বেড়ে যায়।

যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা মানসিক চাপ আগে থেকেই আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উত্তেজনা ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই খেলা উপভোগ করুন, কিন্তু নিজের শরীরের সীমাও মনে রাখুন। প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রও সঙ্গে রাখুন।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—কেউ কেউ একটা দলের হারকে জীবনের ব্যর্থতা মনে করেন। এটি সুস্থ মানসিকতার লক্ষণ নয়। খেলা কখনোই মানুষের জীবন, সম্পর্ক, আত্মসম্মান বা ভবিষ্যতের চেয়ে বড় হতে পারে না।

মনে রাখতে হবে, ফুটবল একটা সুন্দর খেলা। এটি যুদ্ধ নয়। এখানে প্রতিপক্ষ আছে, শত্রু নয়; প্রতিযোগিতা আছে, বিদ্বেষ নয়।

আমার প্রিয় দল জিতলে আমি আনন্দিত হব। হারলে কষ্টও পাব। কিন্তু সেই কষ্ট যেন কাউকে অপমান না করে, নিজের ক্ষতি না করে, পরিবারে অশান্তি না আনে। কারণ খেলার উদ্দেশ্য আনন্দ সৃষ্টি করা, ঘৃণা সৃষ্টি করা নয়।

আপনার দলের জার্সির রং ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সবার রক্তের রং এক। খেলা শেষ হয়ে যায় নব্বই মিনিটে; মানুষের সম্পর্ক ও মানবিকতা যেন তার পরেও বেঁচে থাকে।

আসুন ফুল বিতরণ করি। বিজয়ীকে অভিনন্দন জানাই।
যাঁরা হেরে গেছে তাঁদের প্রতি সহমর্মী হই।
তাঁদের পাশে দাঁড়াই বন্ধু হয়ে।
এটা সাহিত্যের ভাষা নয়।
এটি হোক জীবনেরই অন্যতম ভাষা।

লেখক : মনোচিকিৎসক। সাহিত্যিক।

এইচআর/এএসএম