জনগণের নির্বাচিত সরকার জনগণের কথা বলবে, সবাই এটাই আশা করেন। সরকার যখন জনমতের বা জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নেয়, তখন বুঝে নিতে হয়, সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। আবার সরকারের পেছনে জনগণের ম্যান্ডেট না থাকলে সরকার জনমতের তোয়াক্কা করে না, গোষ্ঠীস্বার্থে যা খুশি করে বেড়ায়।
আমরা ২০০৯ সাল থেকেই দেখছি ‘পলিটিক্যাল মনোপলি’র একটি বিকৃত রূপ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ‘আমি আর ডামি’ নির্বাচনের পর যে সরকারকে আমরা দেখেছি, সেটি ছিল জনগণের ম্যান্ডেটহীন একটি অলিগার্ক। এ ধরনের অলিগার্ক যিনি বা যারা চালান, তাদের মাথায় সবসময় দুষ্ট বুদ্ধি কিলবিল করে। এ প্রসঙ্গে কল্পকথার হবুচন্দ্র রাজা আর গবুচন্দ্র মন্ত্রীর কিস্সা মনে পড়ে যায়। হবুচন্দ্র রাজার মাথায় যখন যে খেয়াল চাপে, তিনি সেটাই করে বসেন। এতে তিনি ব্যাপক বিনোদন পান। আর তার গবুচন্দ্র উজির-নাজির-কোটাল-অমাত্যরা জো হুকুম বলে হাত কচলান।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু অনেক আগে। ২০১৮ সালে ছাত্ররা দ্বিতীয় দফা কোটা সংস্কার আন্দোলন করেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন সরকারি চাকরিতে কোটা যুক্তিসংগত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে। প্রধানমন্ত্রীর মাথায় ছিল অন্য মতলব। তিনি রাজনীতির পাকা খেলোয়াড়। সব রকম বিরোধী মত দমন করে তিনি তখন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, বেপরোয়া, ঔদ্ধত্য। কোটা সংস্কারের ধারেকাছে না গিয়ে তিনি পুরো কোটা ব্যবস্থাই তুলে দেন। এ বিষয়ে সরকার ২০২১ সালে একটি পরিপত্র জারি করে। এটা ছিল এক ধরনের স্টান্টবাজি। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিতে ঘোঁট পাকানোর একটা সুযোগ রেখে দেন নিজের হাতে।
এভাবে পেরিয়ে যায় আরও তিন বছর। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা নামেন নতুন মতলব নিয়ে। হঠাৎ দেখা গেল, কোথা থেকে উদয় হলেন সাতজন ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’। তারা সরকারি চাকরিতে ২০২১ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। একাত্তর সালে যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাদের কারও সন্তানের সরকারি চাকরিতে ঢোকার বয়স আর ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল নাতিপুতিসহ বংশপরম্পরায় সরকারের দেওয়া ‘সনদধারী’ মুক্তিযোদ্ধারা কোটা ব্যবস্থার ফল ভোগ করবেন।
ক্ষমতাসীনরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলতেন। কার্যত তারা চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জনগণের আবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে একটি অনুগত সম্প্রদায় তৈরি করা ও মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া।
২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের বিচারপতি কে এম কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের বেঞ্চ সরকারের ২০২১ সালের পরিপত্র বাতিল করে কোটা পুনর্বহালের রায় দেন। হাসিনা সরকারের ইচ্ছা পূরণ হয়। সেখান থেকেই ঝামেলার শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ওই দিনই এ রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন।
সরকার তথা রাষ্ট্রপক্ষ শিক্ষার্থীদের প্রতি ছদ্ম সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আবেদনটি শুনানির জন্য ৪ জুলাই দিন ঠিক করা হয়।
শিক্ষার্থীরা কি ততদিন বসে আঙুল চুষবেন? ১০ জুন তারা তাদের দাবি মানতে সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। ২১ জুন তারা বলে দেন, তাদের দাবি মূলত তিনটি- ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কোটা রেখে পুনর্বণ্টন বা সংস্কার; চাকরির পরীক্ষায় কোটাসুবিধা একাধিকবার ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ ও কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্যপদে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া এবং দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
সরকার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। অথবা সরকারের সে সদিচ্ছা ছিল না। তারা কালক্ষেপণের পথ বেছে নেয়। বিষয়টি আদালতের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে হবুচন্দ্র-গবুচন্দ্ররা গোঁফে তা দিতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১ জুলাই শুরু হয়ে যায় শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলন। এ আন্দোলনের অনুঘটক ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই এ আন্দোলনে শরিক হন। এমনকি সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের অনেকেই তাতে শামিল হন। কেননা এ আন্দোলনের মধ্যে তারা তাদের বৃহত্তর স্বার্থ দেখেছিলেন।
১৩ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলেন, ‘দাবি আদায়ে যৌক্তিক ও গঠনমূলক সমাধানের জন্য যতগুলো পথ প্রয়োজন, তার সবই আমরা অবলম্বন করব। আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরোধী নই, বিরোধিতা করছি নাতিপুতি কোটার। তবে কোটার শতাংশ নিয়ে সরকারের গবেষণাভিত্তিক তথ্য থাকলে তা নিয়ে পরে আলোচনা হতে পারে।’
সরকার যদি জোর খাটাতে না পারে, তাহলে কিসের সরকার-এ ভাব নিয়ে চলেন ক্ষমতাসীনরা। মীমাংসার পথে না গিয়ে সরকার ‘কনফ্রন্টেশনের’ পথ বেছে নেয়। সরকারের মধ্যে একটা অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব কাজ করে-দাবি মেনে নিলে বুঝি প্রমাণ হয়ে যাবে যে সরকার দুর্বল। অতএব, ‘কানে বেঁধেছি তুলো, পিঠে বেঁধেছি কুলো’। ফলে নিজের অজান্তে তারা আন্দোলনের চারাগাছে জলসিঞ্চন করতে থাকে। এটি ছিল তাদের নির্বুদ্ধিতা কিংবা অতিচালাকি।
আন্দোলন যত বেগবান হয়, সরকার ততই হয়ে ওঠে মারমুখী। সরকারকে মন্ত্রণা দিতে দলের লোক আর ১৪ দলের জোটসঙ্গীরা তো একপায়ে খাড়া। শেখ হাসিনার খাস বরকন্দাজদের একজন ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আইন-আদালতের প্রতি তার মাত্রাতিরিক্ত ভক্তি। তিনি বললেন, আপিল বিভাগের রায়ের আগে সরকার কোটা পরিবর্ধন-পরিমার্জন নিয়ে কিছু করবে না। এবার তিনি পকেট থেকে বের করলেন চিরাচরিত ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। বললেন, শিক্ষার্থীদের আবেগকে পুঁজি করে একটি কুচক্রী মহল রাষ্ট্রকে অস্থির করার ষড়যন্ত্র করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন? বললেন, ‘আমি মনে করি, ছাত্রদের একটু অপেক্ষা করা উচিত, আন্দোলন থামানো উচিত।’ অর্থাৎ, কালক্ষেপণের সেই একই তরিকা। তাদের বিশ্বাস, আন্দোলন বেশিদিন চলবে না। একসময় সেটি ঝুলে পড়বে। শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত-বিরক্ত হয়ে ‘পাঠে দিবে মন’। এর মধ্যে দেখা গেল, ক্ষমতাসীনদের ছাত্র সংগঠনের বরকন্দাজরা হাতের আস্তিন গোটাচ্ছে, পেশি বের করছে। আওয়ামী সিপাহসালার বললেন, আন্দোলন দমাতে তার ছাত্র সংগঠনই যথেষ্ট।
১৩ জুলাই ছিল সরকারের জন্য আগাম সতর্কবার্তা। এক সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বললেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলাম। সরকারের উচিত ছিল, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুরু থেকেই আলোচনা করে সংকট নিরসন করা। কিন্তু তারা নানা শক্তির মাধ্যমে এ আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকার দায় এড়ানোর জন্য আদালতকে ব্যবহার করছে এবং কালক্ষেপণের নাটক করছে। এটি সরকারের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। এমন কিছু হলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে।’
আন্দোলন শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ধীরে ধীরে সেটি ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছুদিনের মধ্যেই তা ব্যাপ্তি পায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তারপর দেখা যায়, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও এ আন্দোলনে শরিক হয়েছেন। এমন ছাত্র আন্দোলন ১৯৬৯ সালের পর এ দেশে আর দেখেছি বলে মনে হয় না।
ইতিহাস সাক্ষী, সরকারের কালক্ষেপণের কৌশল সত্যি সত্যিই বুমেরাং হয়েছিল। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের লাশ পড়তে থাকল। আন্দোলন হলো আরও বেগবান। সরকার যত দমন-পীড়ন চালায়, আন্দোলন ততই গতি পায়। একপর্যায়ে এটি শিক্ষার্থী আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পরিণত হলো ব্যাপক গণআন্দোলনে। তাতে যোগ দিলেন হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ, যেমনটি দেখা গিয়েছিল ১৯৬৯ সালের ১১ দফা ছাত্র আন্দোলনের শেষ দিকে।
ঘটনাটি দুবছর আগের। শিক্ষার্থীদের একটি গোষ্ঠীগত দাবি-দাওয়াভিত্তিক আন্দোলন যে দেশব্যাপী সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে পারে, শুরুর দিকে এ রকম মনে হয়নি। ক্ষণে ক্ষণে আন্দোলনের গতি পালটেছে। শুরুতে যা ছিল একটি ছোট স্ফুলিঙ্গ, কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেটি তৈরি করল বিশাল এক দাবানল। এভাবেই ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন জায়গা করে নিল ইতিহাসে।
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক








