বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা প্রদানের অন্যতম প্রধান সারথি ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। অথচ দীর্ঘদিন এসব ইন্টার্ন চিকিৎসক পেতেন নামমাত্র ভাতা। যদিও আন্দোলন ও ব্যাপক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ভাতা বাড়ানো হয়েছে। তবে এখনো আলোচনার বাইরেই রয়ে গেছেন বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।

সার্ক স্কলারশিপ প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশে অধ্যয়নরত এসব বিদেশি তরুণ চিকিৎসক বাংলাদেশি সহকর্মীদের মতোই সমান দায়িত্ব ও ক্লিনিক্যাল কর্তব্য পালন করেন। অথচ মাস শেষে তাদের ভাগ্যে জুটছে না কোনো ইন্টার্নশিপ ভাতা।

দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বর্তমানে মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পেয়ে থাকেন। সাম্প্রতিক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ভাতা নবম গ্রেডের মূল বেতনে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর ফলে এটি ২২ হাজার টাকায় উন্নীত হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন

ইন্টার্ন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকদের ভাতা বাড়ছে, কর্মবিরতি স্থগিত

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৫০ জনের অধিক বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন, যারা এই সুবিধার আওতার বাইরে। বর্তমানে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে পড়ছেন ৫০০ বিদেশি শিক্ষার্থী। তারাও পড়তে যাচ্ছেন একই সমস্যায়।

কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য

কথা হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. আবিষ্কার অধিকারীর সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, বর্তমানে ইন্টার্নদের বেতন বা ভাতা নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু বিদেশি ইন্টার্নদের সমস্যাগুলো একেবারে উপেক্ষা করা হচ্ছে। সার্ক স্কলারশিপ প্রোগ্রামের আওতায় পড়াশোনা করে আমরা বাংলাদেশি সহকর্মীদের মতোই একইভাবে ক্লিনিক্যাল দায়িত্ব পালন করছি। অথচ, আমরা কোনো ইন্টার্নশিপ ভাতা পাচ্ছি না।

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতার বিষয়টি বর্তমানে আলোচনায় থাকলেও সার্ক স্কলারশিপ প্রোগ্রামের অধীনে থাকা বিদেশি ইন্টার্নদের বিষয়টি এখনো আড়ালে রয়ে গেছে। আমরা বাংলাদেশি সহকর্মীদের মতোই সমান দায়িত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছি। অথচ আমাদের কোনো ইন্টার্নশিপ ভাতা দেওয়া হয় না।— ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. স্তুতি রিমল জাগো নিউজকে বলেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতার বিষয়টি বর্তমানে আলোচনায় থাকলেও সার্ক স্কলারশিপ প্রোগ্রামের অধীনে থাকা বিদেশি ইন্টার্নদের বিষয়টি এখনো আড়ালে রয়ে গেছে। আমরা বাংলাদেশি সহকর্মীদের মতোই সমান দায়িত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছি। অথচ আমাদের কোনো ইন্টার্নশিপ ভাতা দেওয়া হয় না।

আরও পড়ুন

হাসপাতালে দ্বিগুণ হচ্ছে শয্যা, জনবল-বাজেট কি বাড়বে?

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ও ওয়ার্ল্ডওয়াইড নেপালি স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ডা. মুন্না যাদব বিদেশি ইন্টার্নদের বঞ্চনার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, বর্তমানে ইন্টার্নদের বেতন-ভাতার বিষয়টি গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেলেও বিদেশি ইন্টার্নদের সমস্যাগুলো মূলত আলোচনার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। আমরা বারবার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং আশ্বাস পেয়েছি। কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি। আমাদের সংখ্যা কম হওয়ায় এ বিষয়টি প্রায়ই সবার অগোচরে থেকে যায়। ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে আমাদের দাবি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করছি।

দ্বারে দ্বারে ঘুরেও মেলেনি সমাধান

ভাতা বৈষম্যের শিকার এই চিকিৎসকরা গত কয়েক মাস ধরে সমাধানের জন্য বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটছেন। অনুপরাজ পৌডেল নামের এক বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসক বলেন, মাসব্যাপী হাসপাতাল প্রশাসন, ডিজিএমই, ডিজিএইচএস এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ধরনা দিয়ে আমরা কেবল আশ্বাসই পেয়েছি, কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। বিদেশি ইন্টার্নদের এই কঠিন পরিস্থিতি ও বৈষম্যের অবসান চাই।

ইন্টার্নদের এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বিদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থীরাও। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী পুস্কর সুবেদি জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশি সহকর্মীদের সমান ক্লিনিক্যাল দায়িত্ব পালন করেও বিদেশি ইন্টার্নরা কোনো ভাতা পাচ্ছেন না। আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে এ ধরনের বৈষম্য যেন কারও চোখে পড়ছে না।

আরও পড়ুন

মাত্র ২৯% জনবলে চলছে স্বাস্থ্য খাত, সরকারি হিসাবেই শূন্যপদ ৭২ হাজার

একই কলেজের ৫ম বর্ষের শিক্ষার্থী বিবেক কুমার সাহ এবং ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী অনুপ তিমিলসিনা জানান, কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার যোগাযোগ ও আশ্বাস পাওয়া সত্ত্বেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তারা মনে করেন, একই দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকদের মধ্যে এমন বৈষম্য কাম্য নয়।

বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা আগে দেওয়া হতো না। তবে, সামনে দেওয়ার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। শিগগির এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিষয়টি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের, তারা ভালোভাবে বলতে পারবে।— স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি এই বৈষম্য বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সমান কাজের জন্য সমান মর্যাদা ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।

এ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা আগে দেওয়া হতো না। তবে, সামনে দেওয়ার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। শিগগির এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিষয়টি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের, তারা ভালোভাবে বলতে পারবে।

আরও পড়ুন

শত শত কোটি টাকা খরচ করেও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু?

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তারা বলেন, বিষয়টি বর্তমানে উচ্চপর্যায়ে আলোচনার দাবি রাখে। তবে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভাতার বিষয়টি জটিল কিছু আইনি ও নীতিগত কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে আমরা ইতিবাচক চিন্তা করছি।

চিকিৎসা শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, একই হাসপাতালে একই পরিবেশে সেবা প্রদানকারী একজন ইন্টার্ন চিকিৎসককে কেবল জাতীয়তার কারণে ভাতার বাইরে রাখা বৈষম্যমূলক। বিষয়টি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য শিক্ষার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও সহায়ক নয়।

এসইউজে/কেএসআর