কোথাও ফুলের টবে জমে ছিল পানি। কোথাও আবার বৃষ্টির পানি ছিল বাড়ির ছাদের কোণে। চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন ৩৭০টি বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগ। এসব নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতে এডিস মশা বা ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া গেছে; অর্থাৎ চট্টগ্রাম নগরের প্রতি চার বাড়ির মধ্যে একটিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।
গত পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে জুলাই-আগস্টে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি থাকে। এ বছর ৮ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নগরে ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’ শিরোনামে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরে জরিপের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জরিপ দল। সেখানে ৪ দফা জরুরি সুপারিশও দেওয়া হয়েছে।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপে ভিত্তিতে ঝুঁকির তিনটি আন্তর্জাতিক সূচকের সব কটিতেই বেশি চট্টগ্রাম। বাসাবাড়িতে টবে ও টায়ারের পাশাপাশি এবারের জরিপে নির্মাণাধীন ভবনের ফ্লোরেও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। জরিপে প্রাপ্ত লার্ভার মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ডেঙ্গুর প্রধান বাহক ‘এডিস ইজিপ্টাই’ এবং ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত কনটেইনার ইনডেক্স ১০ শতাংশের বেশি হলেই তাকে ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি ধরা হয়। এ হিসাবে চট্টগ্রাম নগরে মশার লার্ভার উপস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণের বেশি।
চার সদস্যের জরিপ দলে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত জেলা কীটতত্ত্ববিদ মঈন উদ্দীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা নির্মাণাধীন ভবনের লিফটের জন্য রাখা জায়গায় এডিসের লার্ভা পেতাম। এবার দেখা গেছে, এসব ভবনের ফ্লোরেও লার্ভা পাওয়া গেছে, যেখানে সিমেন্টও ছিল। লার্ভার সংখ্যা বা ঘনত্ব বায়েজিদ ও শেরশাহ এলাকায় বেশি পাওয়া গেছে।’
সব সূচকেই ঝুঁকিপূর্ণ চট্টগ্রাম
স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণত মশার লার্ভার উপস্থিতি ও ঘনত্ব বোঝার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে তিনটি সূচক ব্যবহার করা হয়। একটি হলো ‘কনটেইনার ইনডেক্স’ বা পরীক্ষা করা পাত্রগুলোর মধ্যে কত শতাংশে লার্ভা পাওয়া গেছে। অন্য দুটি হলো ‘হাউস ইনডেক্স’ বা প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে কতটি বাড়িতে লার্ভা পাওয়া গেছে এবং ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ বা পাত্র ও বাড়ির আনুপাতিক হার।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, নগরের ৩৭০টি বাড়ি থেকে বাড়ির বাইরে থাকা ৩৪৫টি কনটেইনার বা পাত্র পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৩৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। হাউস ইনডেক্সের ফলাফলে প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাড়িতে লার্ভা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে পাত্র ও বাড়ির আনুপাতিক হার ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ। এই তিন সূচকই স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত কনটেইনার ইনডেক্স ১০ শতাংশের বেশি হলেই তাকে ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি ধরা হয়। এ হিসাবে চট্টগ্রাম নগরে মশার লার্ভার উপস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণের বেশি। হাউস ইনডেক্সও ৫ শতাংশের নিচে থাকলে স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয়। পাত্র আর বাড়ির আনুপাতিক হার ২০ শতাংশের নিচে থাকার কথা। কিন্তু চট্টগ্রামে সব কটি সূচকই উচ্চ ডেঙ্গু সংক্রমণ ঝুঁকির বার্তা দিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রায় ৩০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়েছে। ৩৭০টি বাড়ির মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এবং ঘরে-বাইরে থাকা ৩৪৫টি পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টি পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এসব বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের বালতি, ড্রাম, টব, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, এসির ট্রে, ফ্রিজের ট্রেতে লার্ভা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মাটির পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, কনস্ট্রাকশন সাইট, এসির ট্রে, ফ্রিজের ট্রে, ফুলের টব এবং নির্মাণসামগ্রীতেও লার্ভা পাওয়া গেছে।
অতি ঝুঁকিতে নগরের ৮ ওয়ার্ড
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার পর্যন্ত চলতি বছর চট্টগ্রামে ২৮০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১০৪। এই ১০৪ জনের মধ্যে ৬৬ জন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। নগরের সঙ্গে লাগোয়া সীতাকুণ্ড, কর্ণফুলী ও হাটহাজারী উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩০; অর্থাৎ নগর ও আশপাশের এলাকায় আক্রান্ত বেশি।
চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপের নগরের মোট ১৮টি ওয়ার্ডে লার্ভা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে মাঠপর্যায়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্য বিভাগ চট্টগ্রাম নগরের ৮টি ওয়ার্ডকে এডিস মশার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ওয়ার্ডগুলো হলো উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা। হাসপাতালেও এসব এলাকার রোগী বেশি।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘জরিপের সুপারিশসহ আমরা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে যেন তারা সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আমাদের দিক থেকে আমরা পর্যাপ্ত স্যালাইন মজুত, নার্সদের প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য বিষয় নিশ্চিত করছি। সাধারণত জুলাই থেকে নভেম্বরে রোগী বেশি দেখা যায়। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
প্রতিবেদনে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ জন্য কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং পানি জমতে পারে—এমন স্থানগুলোয় বিশেষ নজরদারির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক এডিস মশা দমনে কার্যকরভাবে কীটনাশক ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
সুপারিশের ভিত্তিতে এই ৮ ওয়ার্ডে বিশেষ নজরদারি করা হবে বলে জানান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘৪১ নম্বর ওয়ার্ডে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। এই ৮ ওয়ার্ডে সচেতনতা বৃদ্ধি করছি। পাশাপাশি রোগী যেখান থেকে আসছে, সেই এলাকা বা বাড়ি চিহ্নিত করে এর আশপাশে মশার ওষুধ ছিটানো হবে।’







