হোটেলে ফিরেই দ্রুত স্নান সেরে নিলাম। এরপর ফোন করলাম সানিকে। রাতের নিউমার্কেটে একটু আড্ডা দেওয়ার ইচ্ছে। মারকুইজ স্ট্রিটে চলে আসতে বললাম তাকে। আধঘণ্টার মধ্যেই হাজির সানি আর শাম্মি আপা। তবে তারা একা আসেননি। সঙ্গে দুজন নতুন অতিথি। তমালিকা আর শাহেদ। পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে সানি হেসে বলল, ‘এ হচ্ছে আমার বান্ধবী। আর উনি তার স্বামী।’
কথা বলতে বলতেই জানা গেল, দুদিন আগেই কলকাতায় পৌঁছানোর কথা ছিল তাদের। কিন্তু নানা ঝামেলায় যাত্রাপথেই কেটে গেছে অতিরিক্ত দুই দিন। শাহেদ ভাইয়ের পায়ের চিকিৎসার জন্যই কলকাতায় আসা। আমাদের হোটেলের পাশের কক্ষেই উঠেছেন তারা। দুই মাস আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ডান পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন শাহেদ। ঢাকায় চিকিৎসার নানা ধাপ পেরিয়ে শেষ ভরসা নিয়েই এসেছেন কলকাতায়। যদি আবার আগের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন, সেই আশাতেই এই যাত্রা।
আগের দিনের একটা ছোট্ট অভিমান তখনো সানি আর শাম্মি আপার মনে রয়ে গেছে। সারাদিন ঘোরাঘুরি করেও সানি আর শাম্মি আপাকে ঠিকমতো কিছু খাওয়াতে পারিনি। তার ওপর তারা আবার মুসলিম হোটেল ছাড়া খেতেও রাজি নন। নিউটাউনের বিশাল এলাকায় ঘুরে ঘুরে আমিও তখন দিশেহারা। শেষ পর্যন্ত যা খাওয়া হয়েছিল, তা ওই কফি হাউসেই। আমার তো দোষ ছিল না। তবু সেই অভিমানের আঁচটা কিছুটা এসে পড়েছিল আমার গায়েও। যা-ই হোক, আজকের সন্ধ্যায় সেসবের আর কোনো চিহ্ন নেই। সবাই আগের মতো প্রাণখোলা।
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১২
শুরুতেই ঢুকে পড়লাম ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের পুরোনো এক বইয়ের দোকানে। পুরোনো কাগজের গন্ধে ভরা দোকানটা যেন বইপ্রেমীদের জন্য আলাদা এক জগৎ। শেলফ ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোখে পড়ল দক্ষিণী সুপারস্টার মাহেশ বাবুকে নিয়ে একটি বই। কিনতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু দাম দেখেই সেই ইচ্ছে উবে গেল। কলকাতা সফরের শেষ প্রান্তে এসে পকেটও তখন শেষ অধ্যায়ে। সামনে দেশে ফেরার টিকিট, কিছু কেনাকাটা আর হাতেগোনা কয়েকটা নোট। বইটা তাই তাকেই রেখে বেরিয়ে এলাম।

রাত বাড়লেও নিউমার্কেটের ব্যস্ততায় তার কোনো ছাপ নেই। বিগ বাজার, শ্রী লেদার, ফুটপাতের দোকান, ফুড স্টল, ভেলপুরির ঠেলাগাড়ি, সবখানেই মানুষের ঢল। হগ মার্কেটের সামনে খোলা চত্বরে গিয়ে গোল হয়ে দাঁড়ালাম সবাই। শুরু হলো আড্ডা। কেউ পুরোনো গল্প বলছে, কেউ নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শোনাচ্ছে, কেউ আবার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত। আড্ডা যখন জমে উঠেছে; তখনই গলা শুকিয়ে কাঠ। ঠিক সেই মুহূর্তে শাম্মি আপার পক্ষ থেকে এলো কুলফির ট্রিট।
বিশ রুপির দুধ-মালাই কুলফি হাতে পেয়েই মনে হলো কলকাতার আর্দ্র রাতটা হঠাৎ কয়েক ডিগ্রি ঠান্ডা হয়ে গেছে। কুলফি শেষ হতেই তমালিকার ঘোষণা—‘আমি পানিপুরি খাব।’
শাহেদ ভাই অবাক—‘এই রাতে? ডিনার করবে না?’
‘না। তুমি বাংলাদেশে থাকতেই কথা দিয়েছিলে আমাকে পানিপুরি খাওয়াবে।’
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১১
কথা শেষ হতেই চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করলেন শাহেদ ভাই। আমি আর সানি বাদে বাকিরা পানিপুরির স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু করে দিলেন। এরপর স্যান্ডউইচ, ঠান্ডা পানীয়, আরও কিছু টুকিটাকি। খাওয়া শেষ করে সবাই এমন ঢেকুর তুললেন, যেন রাতের খাবারের দায়িত্ব সেরে ফেলেছেন। ধীরে ধীরে রাত আরও গভীর হলো। একসময় বিদায় জানিয়ে সবাই ফিরে এলাম হোটেলে। কলকাতায় আমার শেষ রাত।
পরদিন বৃহস্পতিবার। পরিকল্পনা ছিল বড়। ট্রামে চড়া, ইডেন গার্ডেন, সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল, বিরলা প্ল্যানেটোরিয়াম, দিঘি আর আরও কিছু জায়গা ঘুরে দেখা। কিন্তু প্রকৃতির পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। ভোর থেকেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। জানালার কাচ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। রাস্তাঘাট ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আকাশের মুখ ভার। একসময় বুঝে গেলাম, আজ আর কোথাও যাওয়া হবে না। একে একে বাতিল হয়ে গেল সব পরিকল্পনা। পুরো দিনটা হোটেলের ঘরেই কেটে গেল। কখনো জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখছি, কখনো বিছানায় গা এলিয়ে দিচ্ছি। অপূর্ণতার একটা অদ্ভুত অনুভূতি ধীরে ধীরে জমা হতে লাগল ভেতরে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। কম্বল মুড়িয়ে একসময় ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলাম। ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি কোনো এক অদ্ভুত মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, যেন নিজের ভ্রমণ ডায়েরির শেষ পাতায় লিখছি—কলকাতা আমাকে অনেক কিছু দেখিয়েছে। নেতাজির বাড়ি, আলিপুর জেল, জোড়াসাঁকো, মায়ের মোমের জাদুঘর, পার্ক স্ট্রিট, নিউমার্কেট, কফি হাউজ আর ভিক্টোরিয়ার বিস্ময়।
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১০
তবু কিছু অপূর্ণতা থেকে গেল। সব জায়গায় যেতে না পারার আক্ষেপ নেই। কিন্তু ট্রামের শহরে এসে ট্রামে চড়তে না পারার কষ্টটা হয়তো বহুদিন বয়ে বেড়াব। হয়তো এটাই ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর দিক। সব গল্প কখনো শেষ হয়ে যায় না। কিছু গল্প অসমাপ্তই থেকে যায়, যাতে একদিন আবার ফিরে আসার কারণ থাকে। আর কলকাতা—সে হয়তো আমার জন্য ঠিক এমনই একটি অসমাপ্ত গল্প হয়ে রইল।
এসইউ








