স্মৃতি চক্রবর্তী

আষাঢ় মাসের শুরু। কয়েক দিন ধরে গ্রামের মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মাঠের মাটি ফেটে চৌচির, খাল-বিলের পানি কমে এসেছে। কৃষকদের চোখেমুখে একটাই অপেক্ষা—কবে নামবে বৃষ্টি। সেই গ্রামেরই এক কিশোরের নাম নীলয়। তার বয়স চৌদ্দ বছর। পড়াশোনার পাশাপাশি সে বাবার সঙ্গে মাঠে যায়, গাছপালার যত্ন নেয় আর বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে। তবে তার সবচেয়ে প্রিয় সময় হলো বর্ষাকাল। আষাঢ় এলেই তার মন আনন্দে ভরে ওঠে।

সকালের দিকে আকাশ ছিল একেবারে পরিষ্কার। কিন্তু দুপুর গড়াতেই পশ্চিম দিক থেকে কালো মেঘ জমতে শুরু করল। মেঘগুলো যেন ধীরে ধীরে পুরো আকাশ দখল করে নিল। বাতাসে ভেসে এলো ভেজা মাটির আগাম গন্ধ। নীলয় উঠোনে দাঁড়িয়ে মেঘ দেখছিল। হঠাৎ তার দাদি বললেন, “দেখিস, আজ বৃষ্টি হবেই। এই মেঘ ফাঁকি দেবে না।” দাদির কথা শেষ হতে না হতেই আকাশে গর্জে উঠল বজ্রধ্বনি। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। তারপর শুরু হলো বৃষ্টি। প্রথমে টুপটাপ, পরে ঝমঝম। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে উঠোন ভিজিয়ে দিল। আমগাছের পাতায় জমে থাকা ধুলো ধুয়ে গেল। বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস বইতে লাগল। নীলয় আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দৌড়ে বেরিয়ে গেল বৃষ্টিতে ভিজতে। তার সঙ্গে যোগ দিল বন্ধু সজীব, রাকিব আর শুভ।

তারা সবাই মিলে গ্রামের কাঁচা রাস্তায় ছুটোছুটি শুরু করল। কেউ বৃষ্টির পানিতে লাফ দিল, কেউ কাদা ছুড়ে মারল। হাসি আর আনন্দে চারদিক মুখর হয়ে উঠল। বৃষ্টি থামার পর গ্রামের দৃশ্য যেন বদলে গেল। ধুলোমাখা গাছগুলো নতুন প্রাণ পেল। পুকুরের পানিতে গোল গোল ঢেউ খেলছে। মাঠের শুকনো মাটি নরম হয়ে গেছে।

আষাঢ় এলেই প্রকৃতি নতুন করে সেজে ওঠে, মানুষের মুখে ফিরে আসে হাসি, আর গ্রামের জীবন যেন নতুন ছন্দে গান গাইতে শুরু করে। জানালার বাইরে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে নীলয় ঘুমিয়ে পড়ল। আর আষাঢ়ের সেই স্নিগ্ধ রাত নিঃশব্দে গ্রামটিকে জড়িয়ে রাখল তার মায়াময় বৃষ্টির চাদরে।

পরদিন ভোরে নীলয় বাবার সঙ্গে মাঠে গেল। কৃষকেরা ধানের চারা রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কারও কাঁধে চারা, কেউ জমি সমান করছেন। সবার মুখে এক ধরনের তৃপ্তি। নীলয়ের বাবা বললেন, “এই বৃষ্টিই আমাদের বাঁচায়। বৃষ্টি না হলে ফসল হবে না।” নীলয় বাবার কথার গভীরতা পুরোপুরি না বুঝলেও কৃষকদের মুখের হাসি দেখে বুঝতে পারল, বৃষ্টি তাদের কাছে কত বড় আশীর্বাদ।

দিন কয়েক পর গ্রামের খালগুলো পানিতে ভরে উঠল। ছোট ছোট মাছ দেখা যেতে লাগল। ছেলেরা বাঁশ দিয়ে ছিপ বানিয়ে মাছ ধরতে শুরু করল। নীলয়ও একদিন বন্ধুদের সঙ্গে মাছ ধরতে গেল। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সে একটি ছোট পুঁটি মাছ ধরল। মাছটি হাতে নিয়ে সে এমন খুশি হলো, যেন বড় কোনো পুরস্কার পেয়েছে।

এক বিকেলে নীলয় তার দাদির সঙ্গে বারান্দায় বসেছিল। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। দাদি পুরোনো দিনের গল্প শুরু করলেন। “আমাদের সময় আষাঢ় এলেই নৌকাবাইচ হতো,” দাদি বললেন। “দূর-দূরান্তের মানুষ দেখতে আসত। নদীর দুই পাড়ে মেলা বসত।” গল্প শুনতে শুনতে নীলয়ের মনে হলো, সে যেন সেই সময়ের নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের ভিড়, ঢোলের শব্দ আর নদীজুড়ে ছুটে চলা নৌকার দৃশ্য তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।

এক রাতে প্রবল বর্ষণ শুরু হলো। সারারাত ধরে বৃষ্টি। সকালে দেখা গেল, গ্রামের পাশের খাল উপচে পানি উঠেছে। কিছু জায়গা জলমগ্ন হয়ে গেছে।

গ্রামের মানুষ তখন একে অপরের পাশে দাঁড়াল। কেউ বাঁশ এনে পথ তৈরি করল, কেউ বৃদ্ধদের নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিল। এই দৃশ্য দেখে নীলয়ের মনে হলো, গ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের ঐক্য।

বৃষ্টির দিনে গ্রামের আরেকটি বিশেষ সৌন্দর্য ছিল সন্ধ্যা। যখন বৃষ্টি থেমে যেত, তখন দূরে ব্যাঙের ডাক শোনা যেত। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে চারদিক ভরে উঠত। কুপি বাতির আলো জানালা দিয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ত। সেই আলো আর অন্ধকারের মিশ্রণে গ্রামটাকে যেন গল্পের বইয়ের কোনো ছবির মতো লাগত।

একদিন বিকেলে বৃষ্টি থামার পর আকাশে বিশাল এক রংধনু দেখা দিল। গ্রামের সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এল। নীলয় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সাত রঙের সেই সেতু যেন আকাশ আর পৃথিবীকে একসঙ্গে বেঁধে দিয়েছে।

সেদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে নীলয় জানালার পাশে দাঁড়াল। দূরে কোথাও আবার মেঘ ডাকছে। বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা মাটির গন্ধ। তার মনে হলো, আষাঢ় শুধু বৃষ্টির মাস নয়। এটি গ্রামের মানুষের আশা, পরিশ্রম, আনন্দ আর স্মৃতির মাস।

আষাঢ় এলেই প্রকৃতি নতুন করে সেজে ওঠে, মানুষের মুখে ফিরে আসে হাসি, আর গ্রামের জীবন যেন নতুন ছন্দে গান গাইতে শুরু করে। জানালার বাইরে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে নীলয় ঘুমিয়ে পড়ল। আর আষাঢ়ের সেই স্নিগ্ধ রাত নিঃশব্দে গ্রামটিকে জড়িয়ে রাখল তার মায়াময় বৃষ্টির চাদরে।

এইচআর/এএসএম