দেশজুড়ে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজানের পানিতে বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং জনদুর্ভোগ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরসহ বিভিন্ন জেলায় সড়ক তলিয়ে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে, কোথাও নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে, কোথাও হাজারো মানুষ পানিবন্দী। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস ও ডেলিভারি ব্যাহত, রেল যোগাযোগ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন বন্ধ থাকলেও শাহ আমানত বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও ফটিকছড়ি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার, ভোলার মনপুরা, লক্ষ্মীপুর, ময়মনসিংহ, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে হাজারো পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে; সাজেকে সড়ক ডুবে শত শত পর্যটক আটকা পড়েছেন। একই সঙ্গে চাঁদপুরে মেঘনার ঘূর্ণিস্রোতে ধান-চালবোঝাই কার্গো ডুবেছে, বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার দুটি ট্রলারডুবিতে দুজন জেলে নিখোঁজ রয়েছেন এবং ময়মনসিংহে জলাবদ্ধ ঘরের পানিতে পড়ে আট মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সারা দিন বর্ষণমুখর চট্টগ্রাম নগরীর অধিকাংশ এলাকা আবারও জলাবদ্ধতায় পড়েছে। টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাব সব মিলিয়ে এই জলাবদ্ধতা। এতে মহানগরীর জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন শেডে রাখা কনটেইনারের নিচের অংশে পানি উঠেছে। তবে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা স্বাভাবিক রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, আগ্রাবাদ বাদামতলী ও অ্যাকসেস রোড, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, মোহরা, কাতালগঞ্জ, হালিশহর, পতেঙ্গা, চকবাজার, কাপাসগোলা, মুরাদপুর, খাজা রোড, রাজাখালী, রেয়াজুদ্দিন বাজার, মোহরা, ডিসি রোড ও বন্দর এলাকার নিম্নাঞ্চলে বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়।

পানি ঢুকেছে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও।

এদিকে রেললাইনে পানি ওঠায় গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। নগরীর মুরাদপুর সুন্নিয়া মাদ্রাসাসহ কয়েকটি এলাকায় রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি প্রায় আট ঘণ্টা ষোলশহর স্টেশনে আটকে থাকার পর চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে ফিরিয়ে আনা হয়। বুধবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। এ সময় তিনি জানান, তাঁদের সরকারের ভবিষ্যৎ চিন্তা হচ্ছে এই লাইনটি আরও ৫ ফুট উঁচু করার।

বৈরী আবহাওয়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। ভোররাত থেকে বৃষ্টির পানি জমে প্রধান সড়ক, হাসপাতাল, অলিগলি, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার অনেক অংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। নগরীর সানকিপাড়া, আকুয়া, গোলকিবাড়ী, বলাশপুর, চরপাড়া, খাগডহর, গাঙ্গিনারপাড়, নতুন বাজার, জিলা স্কুল মোড়, কেওয়াটখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। অনেকের বসত ঘরে পানি ওঠায় বেড়েছে ভোগান্তি।

সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকার ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, ‘অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করা এবং চলমান উন্নয়নকাজের কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না। সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, যা প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়।’

এদিকে গাইবান্ধায় ভারী বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এ ছাড়া অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে বুধবার বেলা ৩টা পর্যন্ত জেলায় ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরে সোমবার বিকেল থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত কখনো ভারী, কখনো হালকা আবার কখনো মাঝারি ও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি অব্যাহত হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ। টানা বৃষ্টির কারণে পৌরশহরের বাঞ্চানগর, সমশেরাবাদ কলেজ রোড মজুপুরসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা।

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বান্দরবান শহর ও লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শহরের আর্মিপাড়া, শেরেবাংলা নগর, ইসলামপুর, বরিশালপাড়াসহ আশপাশের নিচু এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। এতে ঘরবাড়ি, সড়ক ও উঠানে পানি ঢুকে পড়ে এবং চরম দুর্ভোগে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়রা জানান, রাতের দিকে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বৃষ্টিতে বান্দরবানের আর্মিপাড়া, ইসলামপুর, শেরেবাংলা নগর, উজানীপাড়াসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় ঘরে পানি প্রবেশ করেছে আর বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

শহরের আর্মিপাড়ার বাসিন্দা ফরিদ বলেন, ‘টানা বর্ষণে পানি বাড়ার কারণে আমরা ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র উঠেছি, প্রশাসন থেকে সেখানে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।’

এদিকে টানা বৃষ্টি ও সাঙ্গু নদে পানি বৃদ্ধি ও পাহাড়ধসের কারণে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত বান্দরবানের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে পর্যটনস্পট ও হোটেল-মোটেলগুলো এখন পর্যটকশূন্য।

ময়মনসিংহে ঘরের মেঝেতে জমে থাকা পানিতে পড়ে ৮ মাস বয়সী আয়াস নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশু আয়াস তার মায়ের সঙ্গে খাটে শুয়ে ছিল। খাট থেকে গড়িয়ে পড়ে যায় সে। বুধবার সকাল ৯টার দিকে নগরীর ব্রাহ্মপল্লি এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। আয়াস ওই ওই এলাকার আবির মিয়ার ছেলে।

মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের নদ-নদীর পানি বাড়ছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বন্যার শঙ্কা রয়েছে।

জেলার বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার মনু, ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নিম্নাঞ্চল এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা কবাখালী ও রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট মাচালং সড়ক পাহাড়ি ঢলে ডুবে যাওয়ায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে ছয় শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সাজেকের রিসোর্ট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা বলেন, বুধবার বিকেলের মধ্যে সড়কের পানি কমে গেলে পর্যটকেরা ফিরে যেতে পারবেন। আর ফিরতে না পারলে তাঁরা কটেজগুলোতে বিনা মূল্যে থাকতে পারবেন।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ। স্থানীয় লোকজন ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা ঢলে উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া এলাকায় সাঙ্গু নদের বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। তা ছাড়া ডলু নদীর পাড় উপচে সামিয়ারপাড়াসহ আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার পরিষদ সড়ক, সাতকানিয়া সরকারি কলেজ সড়ক, আদালত সড়ক ও মেইন রোডে হাঁটু পানি। অনেক দোকানে ঢুকে পড়েছে বন্যার পানি।

একই পরিস্থিতে ভোগান্তিতে পড়েছে আনোয়ারার খালপাড়ের প্রায় ১০ হাজার পরিবার। ওই এলাকায় খালের মাটি ও নোংরা পানি সরাসরি মানুষের বসতবাড়িতে ঢুকে পড়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এসব পরিবারের মানুষ।

এ ছাড়া ফটিকছড়ি উপজেলায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হালদা, ধুরং, সর্তা নদীসহ বিভিন্ন খাল-ছড়ার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বুধবার দুপুর থেকে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার পাইন্দং, সুন্দরপুর, হারুয়ালছড়ি ও ধর্মপুর ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণ সড়ক ও বসতবাড়ির উঠানে পানি ঢুকে পড়েছে।

বুধবার দুপুর পর্যন্ত টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ভোলার মনপুরায় মেঘনার পানি বিপৎসীমার ২৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে উপকূলের বেড়িবাঁধের বাইরের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে ৩-৪ ফুট জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ১০ হাজার বাসিন্দা। চার দিন ধরে উপকূলে টানা বর্ষণে মূল ভূখণ্ডে পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিপাকে পড়েছে হাজার হাজার বাসিন্দা।

বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে বরগুনার তালতলী উপজেলার মধ্য আমখোলা গ্রামের দুটি ট্রলার সাগরে ইলিশ শিকার করতে গিয়ে ডুবে গেছে। বুধবার সকালে দুই ট্রলারের ১৬ জন জেলেকে উদ্ধার করলেও কালাম পাইক ও শহীদুল খান নামের দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ দুজনকে ১৮ ঘণ্টায় উদ্ধার করতে পারেনি। ঘটনা ঘটেছে মঙ্গলবার বিকেলে বঙ্গোপসাগরে কুয়াকাটা এলাকায়।

উদ্ধার হওয়া জেলে কামাল ও জামাল বলেন, ‘আমাদের ট্রলারের দুজন ছাড়া সকল জেলে মৌডুবির একটি ফিশিং ট্রলারে উদ্ধার করেছে। কালাম ও শহিদুল ট্রলারের মধ্য থেকে বের হতে পারেননি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

এ ছাড়া চাঁদপুরের তিন নদীর মোহনায় উত্তাল মেঘনার প্রবল ঘূর্ণিস্রোতে পড়ে ৫ হাজার বস্তা ধান ও চালবোঝাই একটি কার্গো জাহাজ ডুবে গেছে। গতকাল সকাল ৮টার দিকে পুরানবাজার ঘাটসংলগ্ন মোহনায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে কার্গোতে থাকা মাঝিমাল্লাসহ পাঁচ শ্রমিক সাঁতরে নিরাপদে তীরে উঠতে সক্ষম হওয়ায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।