মেয়েটি এসেছে ভোররাত চারটার দিকে। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম দরজা বন্ধ করে। ভোররাতের ঘুম চোখে নিয়ে আমি দরজা খুলে দিলাম। সারা ঘর সৌরভে ভরে গেল। ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখি, তার মাথাভর্তি চুল। ছোট ছোট বেণি করা। মনে হচ্ছে, সাপের বাচ্চা তার মাথায় কিলবিল করছে! এসি চলেছে সারা রাত। রুমে প্রায় পৌষ মাসের শীত। আমার কাছ থেকে কম্বলটা চেয়ে নিয়ে জড়িয়ে নিল গায়ে। তারপর মোবাইল ফোনে মনোযোগ দিল। আমি পা মেলে লম্বা হয়ে শুয়ে শুয়ে দেখছি। ঘুম টুটে গেছে। সুন্দর সুঘ্রাণ আমাকে জাগিয়ে তুলছে ভেতর থেকে।
ভাবছি কোথায় শুয়ে আছি! আমি শুয়ে আছি ভারত মহাসাগরের কোলে। পণ্ডিচেরি (বর্তমান পদুচেরি) নামে এক প্রাচীন ফরাসি শহরে, সাদা সাদা বাড়ি, সুনসান রাস্তা। সমুদ্রের বাতাস শহরটিকে প্রতিনিয়ত সুরভিত করে রাখে। গলির পরে গলি, কাঠফুলগাছ, যার হলুদ পাপড়ি ঝরে পড়ে বাতাসে। তারপর কালো পিচের রাস্তায় আলপনা তৈরি করে। মাঝে মাঝে বড় বড় গাছের বাগান, মন্দির, রাস্তার দুই পাশে হোটেল, কফি শপ, মদের দোকান, আইসক্রিম, পারলার, লাইব্রেরি ও ইয়োগা সেন্টার। শহরটির নাম এখন পদুচেরি।
আরও কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে উঠে বসলাম বিছানায়। মেয়েটিকে বললাম, ‘ঘুম আসছে না আমার। চলো, সমুদ্রের পাড়ে হেঁটে আসি। ভোরের সমুদ্র-বাতাস খুব ভালো লাগবে। ’সে গায়ের কম্বল নামিয়ে রেখে স্লিপার পায়ে দিতে দিতে বলল,‘চলো যাই।’ আমি তাকে বললাম, ‘এখান থেকে রক বিচে যেতে তিন-চার মিনিট লাগবে মাত্র। ’সে আমাকে পরিচিত ঘরের মানুষের মতো বলল, ‘তুমি পেছনে তাকাবে না, আমি কাপড় বদল করব।’
বললাম, রুমের বাইরে যাই তাহলে। আমি পুরোনো ফরাসি কায়দার পুরোনো সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ছাদে চলে গেলাম। এখানে বাড়িগুলো খুব উঁচু নয়, সব দোতলাবিশিষ্ট। সূর্য এখনো ওঠেনি। তারপরেও আলো ছড়িয়ে পড়ছে আকাশের নিচে, এই সমুদ্রপারে। বড় স্নিগ্ধ, বড় পবিত্র মায়াবী সকালের শুরু হয়েছে। ছাদের মাঝখানে একজন তরুণী যোগব্যায়াম করছে। আমি থমকে দাঁড়ালাম, সাদা সালোয়ার, টপটাও সাদা, স্বর্ণকেশী। ভারতীয় নয় সে। সকালের বাতাসে তার কানের কাছের চুল দোল খাচ্ছে। কোনোভাবেই তাকে বিরক্ত করলাম না। সরে এসে সিঁড়ির মুখে দাঁড়ালাম। পুব আকাশে তখন লালচে আভা।
উর্ধভি নিচ থেকে আমাকে ডেকে বলল, ‘আমার কাজ শেষ, নেমে আসো। ’তার এক মিনিট পরেই আমরা রক বিচের পথে। হোয়াইট টাউন ডানে রেখে একটা মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মনা কুলা বিনায়গর (গণেশ) মন্দির। দুজনে মন্দিরে প্রবেশ করলাম। তার আগে জুতা জোড়া আমাদের জমা রাখতে হলো বাক্সে।
সকালের বাতাস, ধূপদানি, মন্দিরার শব্দে আরতি স্নিগ্ধ আবহ তৈরি করেছে। সঙ্গে ভক্তিগীত শুনতে পেলাম। সে ভেতরে চলে গেল পুরোহিতের কাছে, প্রণাম করল। তার কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল। হাতে কাগজ মোড়ানো কিছু একটা। আমার হাতে ঢেলে দিতে দিতে বলল, ‘বাসমা আর কুমকুম।’
সকালের সমুদ্রের বাতাস আমার প্রাণ জুড়িয়ে দিল। বড় বড়, শক্তিশালী ঢেউ আছড়ে পড়ছে কালো পাথরে। জায়গাটার নাম রক বিচ। সূর্য কিছুটা ওপরে উঠে এল। কিন্তু তেজ খুব একটা বাড়েনি। উর্ধভি, সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে গেল। এক পায়ের ওপর আরেক পা। দুই হাত জোড় করে মাথার ওপরে তুলে ধরা—সূর্য প্রাণায়াম। সমুদ্রের বাতাসে তার চুল উড়ছে। আমি রক বিচে রকের ওপর বসে আছি। পেছনে উদীয়মান সূর্য, সামনে প্রণামরত উর্ধভি।
সন্ধ্যার পর আমি রুমেই ছিলাম। সে ফিরে এসেছে রাত সাড়ে নয়টার দিকে, খুব উৎসুকভাবে। গালভর্তি হাসি, শিশুর মতো সারল্য তার মুখে, চোখে। চুলগুলো বাইরে থেকে সাজিয়ে এনেছে, তাতে বেলি ফুল ও ছোট ছোট গোলাপ। আমাকে বলল, ‘দেখবে একটা জিনিস!’
আমার হাতে তুলে দিল একটা ছোট কাপড়ের পুঁটলি। নীল রঙের নরম কাপড়ের পুঁটলি থেকে বের হয়ে এল লম্বা আয়তাকার একটা কবচ। আমাকে বলল, এটা রুপা।
আমি রুপার কৌটা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার টোল পড়া গালে ভরাট হাসির দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
আরও দুই দিন চলে গেল। হোস্টেলে আমি আর উর্ধভি। নতুন কোনো অতিথি এল না। লবিতে বসে একটা ইয়োগার বইতে চোখ বোলাচ্ছিলাম। সে আমাকে ইনস্টাতে মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোথায় আছি।
বললাম, ‘আমি অরোভিল গিয়েছিলাম, মাত্রই ফিরেছি। লবিতে বসে রেস্ট নিচ্ছি।’
কিছুক্ষণ পরে সে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘সারা দিন কী করেছ? কেমন গেল আজকের দিন?’
উত্তরে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমার জ্বর হয়েছে, দেখো শরীর গরম। আমি আজ কোথাও যাইনি। সারা দিন কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমিয়েছি।’
সময় বয়ে যাচ্ছে। সাগরপারের এই প্রাচীন শহরে আমি শুধু অতিথিমাত্র। উর্ধভি আমাকে তার সঙ্গে রামেশ্বরম যেতে বলল।
সে খুবই উদ্দীপিত। তার ঋষিকেশ থেকে এখানে আসার উদ্দেশ্য রামেশ্বরম দেখা। কিন্তু আমার বাকেট লিস্টে সেটি নেই, আছে কন্যাকুমারী।
ভারত মহাসাগরের পবিত্র বাতাস, উর্ধভির মায়া, পদুচেরি, তার প্রশান্তি আমাকে দোটানায় ফেলে দিল। আমাকে অনেক দূর পাড়ি দিতে হবে।
কন্যাকুমারী, বারকালা, থিরুভানান্থাপুরম, ফোর্ট কচি, আলেপ্পি, মুনার, উড়ি, বেঙ্গালুরু, পুনে হয়ে মুম্বাই। দিল্লি থেকে ঢাকার টিকিট কাটা আছে আবার।
সেদিন বিকেলে সাগরের ঝাপটা বাতাস আছড়ে পড়ছে পদুচেরির উপকূলে। আমার পিঠে একটা বড় ব্যাগ, বুকে আরেকটা ব্যাগ নিয়ে হোয়াইট টাউন পার হচ্ছি। আমার বাঁ পাশে একটা পুরোনো ভুবনের ওপরে সাদা ও নীল ডোরাকাটা ফ্রান্সের পতাকা উড়ছে পতপত করে।








