মানুষের অন্তরকে আমি একটি স্ফটিক পাত্র বা কাঁচের সুদৃশ্য সুকোমল পাত্রের সাথে তুলনা করে থাকি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের অন্তরকে অত্যন্ত সুন্দর, নির্মল ও দীপ্তিময় করে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এই নশ্বর পৃথিবীতে জীবনযাপন করার তাগিদে এবং সময়ের আবর্তনে আমাদের সেই স্বচ্ছ অন্তরটি ধীরে ধীরে কুয়াশাচ্ছন্ন হতে শুরু করে। প্রথমে সামান্য ধুলোবালি জমে, তারপর তা আরও নোংরা হয় এবং এক পর্যায়ে পুরো অন্তরটিই একদম কালো হয়ে যায়।

অন্তরে জমে থাকা এই কালো ময়লা বা কাদা আসলে কী? এগুলো আর কিছুই নয়; আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রাগ, ক্ষোভ, হিংসা, মিথ্যাচার, জাগতিক জীবনের প্রতি অন্ধ মোহ, দুনিয়াবি প্রতিযোগিতা, অন্যের চেয়ে যে কোনো মূল্যে সেরা হওয়ার অহংকার, প্রতিদ্বন্দ্বীকে পিষে ফেলার মানসিকতা এবং প্রতিনিয়ত অন্যের নামে গীবত বা পরনিন্দা করার মতো মারাত্মক সব পাপ। এই সমস্ত গুনাহ বা পাপ পঙ্কিলতাই মূলত মানুষের অন্তরে ভাইরাসের মতো জেঁকে বসে তাকে কলুষিত করে তোলে।

তাজকিয়াহ বা অন্তরের পরিশুদ্ধি বা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার কাজই হলো সময়ের সাথে সাথে কালচে ও কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়া সেই স্ফটিক পাত্রটিকে ঘষেমেজে আবার আয়নার মতো পরিষ্কার ও চকচকে করে তোলা। এর ফলে মানুষের অন্তর আবার তার আদি ও অকৃত্রিম স্বচ্ছ রূপে ফিরে আসে। তখন মানুষের মনের মণিকোঠায় এই গভীর বোধ জাগ্রত হয় যে, সে এই পৃথিবীতে কেবলই আল্লাহর একজন খলিফা বা প্রতিনিধি এবং তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে প্রেরিত হয়েছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় বিষয়টি আরও চমৎকারভাবে অনুধাবন করা যায়। আমাদের শরীরে যখন কোনো ক্ষত তৈরি হয় এবং সেই ক্ষতটি কোনো কারণে সংক্রমিত হয়ে পড়ে, তখন আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজই হয় ক্ষতস্থানটি খুব ভালোমতো পরিষ্কার করা। এরপর আমরা রোগীর চারপাশ থেকে এমন সব নোংরা উপাদান বা পরিবেশ সরিয়ে ফেলি যা সেই ক্ষতকে পুনরায় সংক্রমিত করতে পারে। সবশেষে আমরা ক্ষতটি দ্রুত শুকিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ বা নিরাময়কারী উপাদান ব্যবহার করি। অন্তরের পরিশুদ্ধিও ঠিক এই নিয়মে কাজ করে। হিংসা, গীবত, ঘৃণা কিংবা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অভাবের কারণে আমাদের অন্তর যখন গভীরভাবে ক্ষতবিশিষ্ট হয়, তখন তাজকিয়াহর মাধ্যমে সেই ক্ষতগুলো একে একে নিরাময় করতে হয়। আমি আমার বোনদের একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে বলি, এটি ঠিক একটি নোংরা থালা-বাসন মাজার মতো। পাত্রটি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত যেমন আমাদের অবিরাম তা মেজে যেতে হয়, অন্তরের ক্ষেত্রেও পরিচ্ছন্নতা না আসা পর্যন্ত এই ধোয়ার প্রক্রিয়া চালু রাখতে হয়।

আরও পড়ুন

অন্তরের পরিশুদ্ধির জন্য যে দোয়া পড়বেন

তাজকিয়াহ বা অন্তরের এই পরিশুদ্ধি সেই তিনটি মৌলিক দায়িত্বের একটি, যা দিয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদকে (সা.) এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারায় হজরত ইব্রাহিমের (আ.) দোয়ার বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, হে আমাদের রব! আপনি তাদের মধ্য থেকেই এমন একজন রাসুল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন। পবিত্র কোরআনে মোট চারবার এই প্রসঙ্গের উল্লেখ এসেছে। ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামি চিন্তাবিদগণ বলেন, যখন একজন মানুষ দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান লাভ করে, তখন অন্তরের পরিশুদ্ধি বা তাজকিয়াহর পথে হাঁটা তার জন্য একটি ব্যক্তিগত ফরজ বা আবশ্যিক কর্তব্যে পরিণত হয়।

তাজকিয়াহ পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার মতোই একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া; যা একদিনে বা রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়। এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হলো নিজের ভেতরের সমস্যাটি অত্যন্ত সততার সাথে চিহ্নিত করা। আমাকে বুঝতে হবে আমার আসল রোগটি কোথায়। আমার সমস্যা কি অতিরিক্ত রাগ? যে কারণে রেগে গেলে আমি আল্লাহর অবাধ্য হই, মুখে যা আসে তা-ই বলি এবং মানুষকে চরমভাবে কষ্ট দিই? নাকি আমার মূল সমস্যা হিংসা? কেন অন্য একজন একটি নেয়ামত বা সুযোগ পেল আর আমি পেলাম না, সে তো এটার যোগ্যই ছিল না—এমন হীনম্মন্যতায় কি আমি ভুগছি? নাকি আমার সমস্যা জিভ বা মুখের কথায়? আমি কি কথা বলতে গিয়ে মানুষকে আঘাত করি, গিবত করি, মিথ্যা বলি, অন্যকে ছোট করি কিংবা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি? সবার আগে নিজের এই ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে হবে।

আরও পড়ুন

অন্তরের পরিশুদ্ধি জরুরি যে কারণে

নিজেকে চেনার পর এই সমস্যাগুলো একে একে দূর করার কঠোর উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে সৎ সঙ্গের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি যদি জানি যে বন্ধুদের একটি নির্দিষ্ট দলের সাথে আড্ডা দিতে বসলে দিনশেষে তা গিবত বা পরনিন্দার আসরে রূপ নেয়, তবে নিজের ভালো চাইলে আমাকে সেই সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। কারণ তারা আপনার অন্তরের জন্য একটি মারাত্মক ভাইরাস। আমি যদি বুঝতে পারি যে কোনো একটি কাজ শতভাগ নিখুঁত না হলে আমি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ি, তবে আমাকে সেই অভ্যাস থেকে দূরে থাকার অভ্যাস করতে হবে। কিংবা আমি যদি জানি যে অমুক প্রতিবেশীর বাড়িতে বেড়াতে গেলে আমার মনের ভেতরে এক ধরনের কুৎসিত হীনম্মন্যতা তৈরি হয়, কারণ তার বাড়িটি আমার চেয়ে বড়, তার চারটে শোবার ঘর আর আমার মাত্র তিনটে—তবে নিজের অন্তরের সুরক্ষার স্বার্থেই সাময়িকভাবে হলেও সেই সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে আনতে হবে।

অর্থাৎ, প্রথম কাজ হলো নিজের সমস্যা এবং তা সৃষ্টির মূল কারণটিকে চিহ্নিত করা। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান অর্জন করা। আমরা আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে যত বেশি জানব এবং নিজের ত্রুটিগুলো যত বেশি অনুধাবন করতে পারব, আমাদের জ্ঞান তত বৃদ্ধি পাবে।

এর পরের ধাপটিকে বলা হয় ‘মুজাহাদাহ’, যার অর্থ অন্তরের কুপ্রবৃত্তির সাথে কঠোর সংগ্রাম। এটিই হলো মানবজীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই। আত্মশুদ্ধির এই প্রক্রিয়াটিতে চারটি জিনিস কমাতে হয় এবং একটি জিনিস বাড়াতে হয়। চারটি বর্জনীয় বা কমিয়ে আনার মতো জিনিস হলো, কম কথা বলা, কম ঘুমানো, কম আহার করা এবং মানুষের সাথে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা বা সামাজিকতা কমিয়ে দেওয়া। আর যে একটি জিনিস সবচেয়ে বেশি বাড়াতে হবে, তা হলো আল্লাহ তাআলার জিকির বা স্মরণ। এই জিকিরই হলো অন্তরের পরিশুদ্ধির মূল ভিত্তি। আল্লাহকে স্মরণ করাই হলো অন্তরের ময়লা পরিষ্কার করার সবচেয়ে বড় উপাদান। সেই কাঁচের সুদৃশ্য পাত্রটির কথা মনে করুন, জিকির বা আল্লাহর স্মরণই হলো তা ধোয়ার প্রধান মাধ্যম। এই জিকির হতে পারে যে কোনো উপায়ে—কোরআন তেলাওয়াত করা, কোরআন মুখস্থ করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, সকাল-সন্ধ্যার দোয়া ও আজকার পাঠ করা কিংবা আল্লাহর সৃষ্টিজগতের অনুপম সৌন্দর্য দেখে মনে মনে তাঁর মহত্ব নিয়ে চিন্তা করা।

অন্তরের এই পরিচ্ছন্নতার প্রক্রিয়াটি কোনো একদিন বা দুদিনের সাময়িক কোনো বিষয় নয়, এটি জীবনভর চালিয়ে যাওয়ার মতো একটি নিরবচ্ছিন্ন সাধনা। এর ফলে আপনি ধীরে ধীরে নিজের মাঝে এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করবেন। আপনি আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত, সৌম্য ও স্থির হয়ে উঠবেন, আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের প্রতি আপনার কৃতজ্ঞতাবোধ অনেক বৃদ্ধি পাবে। আমাদের বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও মানসিক ব্যাধি হলো সারাক্ষণ অভাব-অভিযোগ করা; অন্তরের পরিশুদ্ধি ঘটলে আপনার এই অভিযোগ করার ক্ষতিকর প্রবণতা ক্রমশ কমে আসবে। জাগতিক বা বস্তুগত জিনিসের প্রতি আপনার মোহ কমে যাবে। দুনিয়াবি জিনিস ঘরে থাকলে আলহামদুলিল্লাহ, আর না থাকলেও আলহামদুলিল্লাহ—এমন একটি পরমতৃপ্ত আত্মিক অবস্থা তৈরি হবে। আপনি যখন আল্লাহর যত কাছাকাছি পৌঁছাবেন, গভীর রাতে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে কোরআন তিলাওয়াত করার সময় আপনার চোখ দিয়ে ভক্তির অশ্রু ঝরবে।

আমি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যখনই এই আত্মশুদ্ধির বিষয়টি নিয়ে কথা বলি, তখন মানুষ অনুভব করে যে আজ আমাদের যান্ত্রিক সমাজে ঠিক এই জিনিসটিরই সবচেয়ে বেশি অভাব। মানুষ আজ প্রতিনিয়ত নিজের চারপাশে নানাবিধ আত্মিক ভাইরাসের মধ্যে বসবাস করছে এবং অবচেতনভাবেই সেই ভাইরাসগুলোকে পুষ্ট করছে, যা তাদের আত্মিকভাবে দিন দিন আরও বেশি অসুস্থ ও জরাজীর্ণ করে তুলছে।

লেখক পরিচিতি: ড. হাইফা ইউনুস আমেরিকান বোর্ড সার্টিফাইড একজন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ (অবস্টেট্রিশিয়ান অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্ট), যার আদি নিবাস ইরাকে। তিনি ‘জান্নাহ ইনস্টিটিউট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। ড. ইউনুস মক্কা ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ এবং আল-হুদা কোরআন মেমোরাইজেশন স্কুল (জেদ্দা, সৌদি আরব) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন, যেখানে তিনি সম্পূর্ণ কোরআন হিফজ করেন। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং তাজকিয়াহ বিষয়ক বিভিন্ন ইসলামিক কোর্সে ক্লাস নিয়ে থাকেন।

আরও পড়ুন

অন্তর পরিশুদ্ধ করার ৪ উপায়

সূত্র: ইউটিউব, ইলমফিড পডকাস্ট

ওএফএফ