ঘড়িতে ঠিক কত মিনিট চলছে, মাঠ থেকে সেটা আন্দাজ করাও মুশকিল ছিল স্টিফেন ইউস্তাকিওর জন্য। মাঝেমধ্যে গ্যালারির দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলেন, খেলার আর কতটুকু সময় বাকি। দক্ষিণ আফ্রিকা তখন নিজেদের রক্ষণভাগে আক্ষরিক অর্থেই দেয়াল তুলে বসে আছে, আর কানাডা লড়ছে সেই দেয়াল ভাঙার তীব্র এক হাহাকারে।
ম্যাচটা যখন নিশ্চিতভাবেই অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই লস অ্যাঞ্জেলেসের আলোঝলমলে মঞ্চে মঞ্চস্থ হলো এক জাদুকরি রূপকথা। ৯০ মিনিট পেরিয়ে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে পেনাল্টি বক্সের বাইরে বলটা এসে থামল ইউস্তাকিওর বুকে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই ডান পায়ের এক মাপা, গতিময় শটে বলটা তিনি পাঠিয়ে দিলেন জালে। পুরো স্টেডিয়াম তখন গর্জনে ফেটে পড়েছে, কানাডা মেতে উঠেছে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জয়ের বুনো উল্লাসে। কিন্তু সেই উৎসবের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন ক্যামেরা ম্যাচের নায়ককে খুঁজে নিল, দেখা গেল অন্য এক দৃশ্য।
ইউস্তাকিও হাঁটু গেড়ে মাঠে বসে আছেন, আর তাঁর চোখ বেয়ে নামছে নোনাজলের ধারা। সেই অশ্রু শুধু এক ফুটবলারের আনন্দের ছিল না, তা ছিল এক লড়াকু সন্তানের শূন্যতা আর এক বছরের ব্যবধানে জীবনের সবচেয়ে বড় দুই আশ্রয়কে হারানোর জমাট বাঁধা শোকের এক আকস্মিক মুক্তি।
ম্যাচ শেষে সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফিটা হাতে নিয়ে যখন ইউস্তাকিও কথা বলছিলেন, তাঁর কণ্ঠে তখনো সেই ঘোর। সেই ঐতিহাসিক শটের মুহূর্তটি মনে করে তিনি বলছিলেন, ‘যখন আমি শটটা নিয়েছিলাম, মনে হয়েছিল, পুরো দেশের মানুষ আমার সঙ্গে শটটা নিয়েছে। প্রত্যেকেই যেন তাতে একটু করে শক্তি জুগিয়েছিল, আর বলটা সোজা জালের গভীরে চলে গেল।’
তবে এই উল্লাসের আড়ালে ইউস্তাকিওর জীবনের পাতা ওলটালে যে কারও বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠবে। গত কয়েক বছরে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন যেভাবে ওলটপালট হয়ে গেছে, তা কোনো দুঃস্বপ্নের চেয়ে কম নয়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তিনি হারিয়েছেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দুই অবলম্বন—মা ও বাবাকে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর মা এসমেরালদা। মায়ের সেই অবর্তমানকে মেনে নেওয়ার আগেই ২০২৪ সালে আকস্মিক হৃদ্রোগে প্রাণ হারান বাবা আরমান্দো ইউস্তাকিও। জীবন তাঁকে যেমন কন্যাসন্তান বেনেদিতাকে উপহার দিয়ে পরম আনন্দ দিয়েছিল, ঠিক তার পরক্ষণেই কেড়ে নিল বাবা-মাকে। ইউস্তাকিও যেন ফুটবল মাঠের সীমানা পেরিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর ফেলে আসা দিনগুলোতে। জানালেন ফ্যামিলি ম্যান হয়ে ওঠার গল্প, ‘আমি যা কিছু করি, তা আমার পরিবারের জন্য; আমার মা-বাবা, আমার প্রেমিকা, আমার মেয়ে আর বন্ধুদের জন্য। আমি সবকিছু তাদের জন্যই করি।’
এই লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম কানাডার জন্য আরও এক আবেগের নাম। ১৫ মাস আগে এখানেই এক ভয়াবহ ইনজুরিতে পড়েছিলেন তাদের প্রাণভোমরা আলফোনসো ডেভিস। সেই মাঠেই ডেভিসের এক দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন হলো, আর তাঁর অনুপস্থিতিতে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড হাতে নিয়ে দলকে সামনে থেকে পথ দেখালেন ইউস্তাকিও। তবে বিশ্বকাপের এই নকআউট পর্বের মঞ্চে ইতিহাস গড়েও পা মাটিতেই রাখছেন এই ২৯ বছর বয়সী মিডফিল্ডার। গ্রুপপর্ব পেরোনোর পর থেকে দলের ভেতর যে বিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল, তা এখন আরও মজবুত। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে মরক্কো কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী দল। কিন্তু ইউস্তাকিও বিশ্বাস করেন, নিজেদের দিনে যেকোনো কিছুই করা সম্ভব। নিজেদের এই দলটাকে একটা পরিবার মনে করেন তিনি, যেখানে সবাই সবার জন্য লড়ে। আর তাই ম্যাচ শেষে একগাল হেসে ইউস্তাকিও মনে করিয়ে দিলেন আসল সত্যটা, ‘আমরা খুব আনন্দিত, কিন্তু কাজ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’








