প্রতি ম্যাচের আগেই স্টেডিয়ামে ফিফার উপস্থাপকেরা একটা মজার খেলা খেলেন দর্শকদের সঙ্গে। দুই দলের দর্শকদের আলাদা আহ্বান করেন, যতটা জোরে পারা যায় চিৎকার করতে। সেই কান ফাটানো চিৎকারের খেলায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার দর্শকদের সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন। মায়ামি স্টেডিয়ামেই যেমন আর্জেন্টিনার দর্শকদের আওয়াজ ১২৫ ডেসিবেল পর্যন্ত উঠল। কেপ ভার্দের দর্শকদের সেখানে ৯০ ডেসিবেল হওয়াই কঠিন।
হবে কী করে? মায়ামির গ্যালারিতে কেপ ভার্দের নীল জার্সি পরা দর্শকদের মনে হলো আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা তাঁদের কিছু দ্বীপের মতোই। অথচ আর্জেন্টিনার জালে যে দুবার জাল জড়াল কেপ ভার্দে, ওই হাতে গোনা কিছু দর্শকের চিৎকার যেন সাময়িক নীরব হয়ে পড়া আকাশি-সাদা সমুদ্রে ১২৫ ডেসিবেল পর্যন্ত উঠে যাচ্ছিল। ছোট্ট দ্বীপ দেশটি প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসে হৃদয় জিতে নিয়েছে। গ্রুপপর্বে স্পেন-উরুগুয়েকে রুখে দেওয়ার পর নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে তারা। মাঠে চোখে চোখ রেখে কথা বললেও ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসির বিশাল তারকাখ্যাতির কাছে আবার তাঁদের মন ‘হার’ মেনেছে। ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে প্রশ্নোত্তর থামিয়ে ছবি তুলেছেন। তবে মাঠের খেলায় মেসিকে আটকাতে যা যা করতে হতো, প্রায় সবই করেছে।
মায়ামিতে শেষ ৩২ পর্বে কেপ ভার্দের বিপক্ষে স্নায়ু ও শরীরের কঠিন পরীক্ষা দিয়ে আর্জেন্টিনা কোনোভাবে উদ্ধার হয়েছে। ১১১তম মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড বোর্জেসের হাতে লেগে জালে না জড়ালে আর শেষ দিকে দিবু মার্তিনেস অবিশ্বাস্য দুটি সেভ না হলে ৩-২ গোলের জয়ে শেষ ষোলোয় হয়তো ওঠা হতো না মেসিদের।
অথচ কাগজ-কলমের হিসাবে ম্যাচের আগে সবাই ধরে নিয়েছিল, আর্জেন্টিনা অনায়াসেই জিতবে। জিতবে কত গোলের ব্যবধানে, মেসি কটা গোল করবে—এসবই অনুমান করা হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে আর্জেন্টিনা দেখল কঠিন ছবি। অনুমানের চেয়ে কঠিন। আর্জেন্টিনা দলের কোচিং স্টাফ, কম্পিউটার বিশ্লেষক নিশ্চয়ই তাঁদের খেলোয়াড়দের কাছে প্রতিপক্ষের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছিল, কেপ ভার্দের রক্ষণ অনেক ডিসিপ্লিন। আক্রমণের শুরুতে ছোট পাস, তবে দ্রুত ট্রানজিশনে চলে যায়। আর তাদের আছে দুর্দান্ত এক গোলকিপার।
সব জানার পরও লিওনেল স্কালোনির দল কেপ ভার্দেকে হারাতে ১২০ মিনিট খেলতে হবে—এমনটা তারা হয়তো কল্পনাও করেনি। এমনকি শেষ মুহূর্তে এমিলিয়েনো মার্তিনেসকে অবিশ্বাস্য সেভ ও গোলমুখে সরাসরি প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতে হবে, কিংবা পুরো দলকে মরিয়া হয়ে রক্ষণ সামলাতে হবে—এটাও ভাবেনি। তবে এটাও সত্য, বড় দলগুলো অনেক সময় ভালো না খেলেও জয় তুলে নিতে জানে। সেই কারণেই ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার উদ্যাপন ছিল সংযত। ডাগআউটে স্কালোনি উচ্ছ্বাস করেননি। মেসি নিজের সতীর্থদের সঙ্গে হাত মেলানোর আগে প্রতিপক্ষকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন। তবে ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনা দলকে যথেষ্ট ক্লান্ত মনে হয়েছে। মায়ামির গরম আবহাওয়ায় কঠিন এক যুদ্ধে কেপ ভার্দে যে ঘাম ঝরিয়েছে, আর্জেন্টিনা ক্লান্ত তো হবেই। আগামী মঙ্গলবার শেষ ১৬ পর্বে অপেক্ষা করছে আর্জেন্টিনার আরেকটি কঠিন লড়াই—এবার প্রতিপক্ষ মোহাম্মদ সালাহর মিসর।
আকাশি-সাদায় পূর্ণ মায়ামির গ্যালারির সামনে কেপ ভার্দে নিজেদের ‘অতিথি’ হিসেবে মেনে নিলেও মাঠে তারা ‘দর্শক’ হয়ে থাকেনি। তারা চার ও পাঁচজনের দুটি রক্ষণাত্মক লাইন গড়ে তুলে আর্জেন্টিনার ধারণার চেয়ে কিছুটা ওপরে উঠে রক্ষণ করছিল। হাই প্রেসিং নয়; বরং পরিষ্কার পরিকল্পনায় এগোচ্ছিল। স্কালোনির পাসিং ফুটবলকে ধৈর্যের পরীক্ষায় ফেলে কেপ ভার্দে ম্যাচের গতি সুকৌশলে ধীর করে দেয়। আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ এর কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছিল না। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ক্রস পাসই হয়ে ওঠে সম্ভাব্য অস্ত্র।
২৯ মিনিটে মেসির ক্ষুরধার ফুটবলমস্তিষ্কের দারুণ এক ফসল পেল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের সামনে যে পজিশনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেসি, সেখান থেকে প্রথমে পাস রিসিভ করতে গেলে অফসাইড হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সে কারণে বল পাঠিয়ে দেওয়া হলো নিজেদের অর্ধে। আর মাঝমাঠ থেকে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের ক্রস, সেটি দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণে নামিয়ে নিখুঁত লক্ষ্যভ্রষ্ট শুধু মেসির পক্ষেই যেন সম্ভব।
গোল হজমের পর কেপ ভার্দে ভেঙে পড়েনি। আর্জেন্টিনাও চাপমুক্ত হতে পারেনি। ধাক্কাটা শেষ পর্যন্ত খেয়েই বসে আর্জেন্টিনা। ফাকুন্দো মেদিনার দুর্বল ক্লিয়ারেন্সের সুযোগ নিয়ে ৫৯ মিনিটে দেরয় দুয়ার্তে জীবনের অন্যতম সেরা গোলটি করেন।
ম্যাচ জিততে আর্জেন্টিনা আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। মেসি ডান দিক দিয়ে বারবার আক্রমণ করেন, কিন্তু ফল আসেনি। নিকো গনসালেসের সুযোগ, মোলিনার বিপজ্জনক ক্রস, মেসির ফ্রি-কিকও ভোজিনিয়া অসাধারণভাবে রুখে দেন। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, আর্জেন্টিনার গোলের দেখা পাচ্ছিল না। তাতে চাপ ক্রমশ বাড়ছিল মেসিদের। কেপ ভার্দে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ৯০ মিনিটে সমতা ধরে রাখে।
খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর দ্বিতীয় মিনিটেই আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কর্নার থেকে আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের ফ্লিকে বল পেয়ে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে জাল খুঁজে নেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস। কিন্তু কেপ ভার্দে যে এত সহজে হার মানার দল নয়!
১০৩ মিনিটে বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের দুর্দান্ত বাঁকানো শটে বল জড়ান সিডনি কাবরাল। এমি মার্তিনেসের কিছুই করার ছিল না। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলের দাবিদার এই গোল আবারও স্তব্ধ করে দেয় আর্জেন্টিনাকে।
আর্জেন্টিনার ক্লান্তি তখন স্পষ্ট। প্রতিবার বল হারানোর পর আফ্রিকানরা দ্রুত নিজেদের জায়গায় ফিরে যাচ্ছিল। বোঝা যাচ্ছিল, শারীরিকভাবে তারা মোটেও ভেঙে পড়েনি। আর্জেন্টাইনদের ভাবনাজুড়ে যখন ম্যাচের মোড় কীভাবে ঘোরানো যায়। শেষ পর্যন্ত সেটি ঘুরেছে, ঘুরিয়েছেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো বক্সে দুর্দান্ত এক হেড করে।
কেপ ভার্দের প্রতিটি কর্নার ছিল আর্জেন্টিনার হৃদ্যন্ত্রের কঠিন পরীক্ষা। পুরোটা ম্যাচে এক মুহূর্তের জন্যও মেসিদের স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি কেপ ভার্দে। মায়ামি দেখল, বিশ্বকাপে বড় দল, ছোট দল বলে কথা নেই। একটি খারাপ দিনই তারকাসমৃদ্ধ দলকেও বাড়ির পথ ধরিয়ে দিতে পারে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে পাওয়া শিক্ষাটা মঙ্গলবার মিসরের বিপক্ষে কাজে লাগিয়ে আর্জেন্টিনা ফিরতে চাইবে সরূপে।








