সরকারের বয়স চার মাস। এর মধ্যে জাতীয় সংসদের দুটো অধিবেশন হয়ে গেল। সাম্প্রতিক বাজেট অধিবেশনটি ছিল বেশ লম্বা। তবে আলোচনা সব সময় বাজেটকেন্দ্রিক থাকেনি। রাজনৈতিক কথাবার্তা ও বিতর্ক আলোচনার বেশির ভাগ অংশ দখল করে রেখেছিল।

বাজেট কী? এটি হলো এক বছরের আয় ও ব্যয়ের একটি আগাম পরিকল্পনা। এখানে অনেক সংখ্যার ব্যবহার আছে। তবে সংখ্যার পেছনে কিছু যুক্তি ও কল্পনা থাকে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, এটির বড়ই অভাব। অর্থনীতির ছাত্ররা বাজেট নিয়ে পড়াশোনা করেন। তাদের ভাষায় এটি হলো ‘পাবলিক ফাইন্যান্স’। সবাই তো আর অর্থনীতির ছাত্র নন। তাই বলে এটি কি জনজীবনে প্রাসঙ্গিক নয়?

আমরা যারা পরিবার চালাই, আমাদের মধ্যে যাদের ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে, আছে নানা সংগঠনের নামে কর্মকাণ্ড, আমাদের আয় ও ব্যয়ের হিসাব কষতে হয়। একটা দোকান দিতে, পত্রিকা চালাতে বা বাড়ি বানাতেও বাজেটের দরকার হয়। সুতরাং এটিকে অর্থনীতি শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের একচেটিয়া অধিকার হিসাবে দেখার জো নেই। সবাই এ নিয়ে কথা বলতে পারেন।

কেমন হলো বাজেট? এ নিয়ে সংসদে আমরা একাডেমিক বিতর্ক তেমন দেখিনি। কিছু গৎবাঁধা কথাবার্তা হয়েছে। সংসদের সব সদস্য এটি পড়ে দেখেছেন কি না বোঝা মুশকিল। তাদের কথাবার্তায় বাজেট পাঠের তেমন প্রতিফলন দেখা যায়নি। বাজেট বুঝতে হলে ন্যূনতম কিছু বিদ্যা লাগে। আর লাগে জানা ও শেখার আগ্রহ।

বাজেট অধিবেশনকে কেন্দ্র করে সরকারি দল আর বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে যেসব বিষয়ে বাহাস হয়েছে, তার বেশির ভাগই ছিল রাজনৈতিক। সেসব পুরোনো কথাবার্তা। অমুক দল স্বাধীনতাবিরোধী, তমুক দল স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রী বানিয়েছিল ইত্যাদি। বাজেট ছিল ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জন্য। অনেক সদস্য ১৯৭১ সালের কাসুন্দি ঘাঁটায় বেশি আগ্রহী ছিলেন। তারপরও একাত্তর নিয়ে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক হয়নি। কটাক্ষ, ব্যক্তি আক্রমণ ও দোষারোপের প্রবণতাই দেখা গেছে বেশি। এসব দেখে ও শুনে মনে হয়, অনেক সংসদ-সদস্য এখনো সাবালক হননি। অবশ্য এটাও ঠিক, বেশির ভাগ সদস্য সংসদে প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। তাই অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে অনভিজ্ঞ আচরণ, বাচালতা, পরিমিতিবোধের অভাব। আশা করি, তারা শিগ্গির পারঙ্গম হয়ে উঠবেন।

আমরা দীর্ঘকাল দেশে দ্বিদলীয় রাজনীতির চর্চা দেখেছি। দুটি দল পালা করে দেশ পরিচালনা করেছে। এর শুরু ১৯৯১ সালে। শেষ ২০১৪ সালে। এ সময় আমরা সংসদে দেখেছি সাংঘর্ষিক রাজনীতি। সরকারি দল কারণে-অকারণে বিরোধী দলের ওপর চড়াও হয়েছে। তাদের কথাবার্তায় মনে হতো, বিরোধিতা করাটাই পাপ! আর বিরোধী দল সরকারি দলের সবকিছুতেই ‘না’ বলত। ‘না’ বলতে না পারলে আবার কীসের বিরোধী দল! ফলে একটা মারমার-কাটকাট অবস্থা চলেছিল। এর মধ্যেই চলছিল যখন-তখন ওয়াকআউট আর লাগাতার অধিবেশন বর্জন। কখনো কখনো গণহারে পদত্যাগ। সংসদ হয়ে উঠেছিল অকার্যকর। আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।

এর মধ্যে দুটো ঘটনা ঘটে। ২০০৭-২০০৮ সালে সেনা হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে আমরা একটি ‘সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ দেখা পাই। এটিকে আমরা বলি এক-এগারোর সরকার। ওই সময় রাজনীতিতে কিছু ওলটপালট হয়। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কিছুটা ছন্নছাড়া হয়ে যায়। দুবছর পর দেশ আবার আগের নিয়মে ফিরে আসে। অনেকেই ভেবেছিলেন, রাজনীতিকরা এক-এগারো থেকে কিছু শিক্ষা নেবেন। সেটি দেখা যায়নি। আগের মতোই চলতে থাকে সাংঘর্ষিক রাজনীতি। ২০১৪ সালের পর দেশে চালু হয় একটি দলের একচেটিয়া শাসন। সেখানে সংসদের এক পাশের চেয়ায়ারগুলো আলো করে থাকে ‘গৃহহপালিত বিরোধী দল’।

২০২৪ সালে একটা প্রচণ্ড গণবিস্ফোরণ হয়। একচেটিয়া শাসনের পতন ঘটে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমরা একটি নির্বাচিত সংসদ ও সরকারের দেখা পাই। কোটি টাকার প্রশ্ন হচ্ছে, এ নতুন সংসদ পুরোনো ধারা থেকে কতটা বেরিয়ে আসতে পেরেছে?

সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই আমরা বিরোধী দলের একটি ওয়াকআউট দেখি। তারা রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করেন। তবে সেটি ক্ষণিকের জন্য। তারা সংসদে আবার ফিরে আসেন। অধিবেশনের পরের দিনগুলোয় বড় ধরনের কোনো ঝামেলা বাধেনি।

দ্বিতীয় অধিবেশনটি ছিল বাজেট নিয়ে। এ অধিবেশনের কয়েকটি দিক উল্লেখ করার মতো। আগে দেখা যেত, যেদিন বাজেট উপস্থাপন করা হতো, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা শেষ হওয়ার আগেই রাস্তায় ব্যানার হাতে মিছিল শুরু হয়ে যেত। বাজেট পেশ করার আগেই তৈরি হয়ে যেত ব্যানার। একদল বলত, এটা গরিব মারার বাজেট; এ বাজেট আমরা মানি না। আরেক দল বলত, এবারের মতো সুন্দর বাজেট অতীতে কখনো হয়নি; দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে আছে। যারা মিছিলে যেতেন, স্লোগান দিতেন, আমি হলফ করে বলতে পারি তারা কেউ কখনো বাজেট প্রস্তাবগুলো পড়ে দেখেননি। বছরের পর বছর আমরা এ তামাশা দেখেছি। এ বছর সেটি হয়নি।

বাজেট উপস্থাপনের পরের দিনগুলোয় দু-এক জায়গায় বাজেট নিয়ে আলোচনা-সেমিনার হয়েছে। সেখানে বক্তারা বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন। পত্রিকায় জনমতের প্রতিফলন দেখা গেছে। অধিবেশনের শেষদিকে এসে সরকারি দল নিজেরাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রস্তাবিত বাজেট পরিমার্জন করেছে। বিরোধী দল থেকে কোনো সংশোধনীর প্রস্তাব আসেনি। হতে পারে, পালটা প্রস্তাব দেওয়ার মতো যথেষ্ট হোমওয়ার্ক তাদের ছিল না। অথবা মোটা দাগে বাজেটটি মেনে নিতে তাদের কোনো অ্যালার্জি ছিল না। এ থেকে একটা ধারণা করা যায়, বাজেট নিয়ে সরকারি দল আর বিরোধী দলের মধ্যে ঝগড়া করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

বাজেট অধিবেশনের শেষ দিনে আমরা সংসদনেতা এবং বিরোধী দলের নেতার দীর্ঘ বক্তব্য শুনলাম। আমরা তো অনেকেই এ ধরনের কথা ওইসব চেয়ার থেকে শুনতে অভ্যস্ত নই। তাই একটু খটকা লাগে। কেউ কেউ এমন মন্তব্যও করেছেন, তাদের মধ্যে একটা অলিখিত আঁতাত আছে। আমি এটিকে খুব ইতিবাচক প্রবণতা হিসাবে দেখি। সংসদের দুই বেঞ্চই আগেকার মারদাঙ্গা সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে সংসদনেতার সঙ্গে বিরোধী দলের নেতার সৌজন্য বিনিময় আমাদের চিরাচরিত গালাগালি ও গলাবাজির রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।

সরকারের স্বাভাবিক মেয়াদ পাঁচ বছর। ১৯৯১ সালের আগে আমরা চারটি জাতীয় সংসদ দেখেছি। কোনোটাই স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। তাদের অকালমৃত্যু হয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত আমরা দেখেছি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচিত সংসদ। সেখানে একটি দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও বিরোধী দল ও জোটের ছিল প্রবল উপস্থিতি। এরকম হলে এক ধরনের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন ছিল যে, কেউ কাউকে সহ্য করতে পারতেন না। ফলে আমরা ভাবতে বসেছিলাম, সংসদ তো এরকমই হবে। বাজারি ফিল্মের মতো তাতে থাকবে ড্রামা, সাসপেন্স, অ্যাকশন, ভায়োলেন্স। চার মাস বয়সি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আমরা তেমনটি হতে দেখিনি। যারা সব সময় একটা মারদাঙ্গা অবস্থা দেখতে চান, তাদের কাছে এ পরিস্থিতি ব্যতিক্রমী, অনেকটা পানসে মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা যদি অতীতের সাংঘর্ষিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই, তাহলে কোথাও না কোথাও আমাদের থামতে হবে, নতুন করে শুরু করতে হবে।

সংসদে যে দলগুলোর প্রতিনিধি আছে, তাদের প্রতি আমার কোনো অনুরাগ বা বিরাগ নেই। তাদের মধ্যে কয়জন চাঁদাবাজ, লুটেরা, মিথ্যাবাদী, ঋণখেলাপি-সে কথা এখন থাক। এ দেশের নাগরিকদের সমষ্টিগত চিন্তাচেতনার যে মান ও পরিধি, তাদের প্রতিনিধিরাও হবেন সে রকম। তারা তো আর আসমান থেকে নাজিল হবেন না। আপাতত এ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে এবং আশায় বুক বাঁধতে চাই। আমি চাই, তারা কলতলার ঝগড়া থেকে বেরিয়ে আসুন। নাগরিকদের সমস্যা নিয়ে কথা বলুন।

সংসদের বয়স মোটে তো চার মাস। এ মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। একটা মূল্যায়ন করতে হলে আরও লম্বা সময় পাড়ি দিতে হবে। আমরা সামনের দিনগুলো দেখব।

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক