প্রিমিয়ার লিগ কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচগুলোয় আর্লিং হলান্ডকে প্রায় নিয়মিত ভালো খেলতে দেখা যায়। বিশ্বকাপেও সেই ধারা বজায় রেখেছেন। ইতিমধ্যে তিন ম্যাচে গোল করেছেন ৫টি। বিপক্ষ দলের বাঘা বাঘা ডিফেন্ডারদের রীতিমতো দুমড়েমুচড়ে গোল বের করে আনেন এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার। উচ্চতা, পেশি ও গতির এমন ‘ভয়ংকর’ মিশেল বিশ্ব ফুটবলে খুব একটা দেখা যায় না। তাঁকে অনেকেই ‘মেশিন’ বলে ডাকেন। কিন্তু এই মেশিনের জ্বালানি আদতে কী?
হলান্ড শুধু শারীরিক গঠনেই অন্যদের চেয়ে আলাদা নন, তাঁর জীবনযাপনের ধরনও বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো শর্টকাট নেই, নেই কোনো জাদুকরি কৌশল। প্রতিদিন শুধু কিছু মৌলিক নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তাঁর এই অতিমানবীয় ফিটনেস।
খাদ্যাভ্যাস ‘আদিম যুগের’
আধুনিক যুগের ফুটবলাররা যেখানে মেপে মেপে ক্যালরি হিসাব করে দামি সব সাপ্লিমেন্ট খান, হলান্ড সেখানে ভরসা রাখেন আদিম মানবের খাদ্যাভ্যাসে। তাঁর প্রতিদিনের ডায়েটের মূল উপাদান গরুর হৃৎপিণ্ড ও কলিজা।

পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় এসব সত্যিকারের ‘সুপারফুড’। পেশি গঠনে প্রয়োজনীয় ভিটামিন বি, আয়রন ও খনিজ উপাদানে ঠাসা থাকে এই অঙ্গগুলো।
পাশাপাশি হলান্ড খান ঘাস খেয়ে বড় হওয়া গরুর টমাহক স্টেক, সাওয়ারডো রুটির সঙ্গে ডিম আর একদম খাঁটি মধু। তাঁর খাবারের তালিকায় প্রক্রিয়াজাত কোনো উপাদানের জায়গা নেই। প্রকৃতির সবচেয়ে খাঁটি খাবারগুলোই তাঁর শক্তির মূল উৎস।
মুখে টেপ মেরে ঘুম আর চোখে রঙিন চশমা
হলান্ডের কাছে ঘুম হলো দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ঘুমকে রীতিমতো একটি বৈজ্ঞানিক ‘প্রটোকলে’ পরিণত করেছেন। রাত সাড়ে ১০টা বাজলেই তাঁকে বিছানায় যেতে হবে—এটি একপ্রকার অলিখিত নিয়ম।
তবে বিছানায় যাওয়ার তিন ঘণ্টা আগে থেকেই হলান্ড চোখে বিশেষ একধরনের ব্লু-লাইট ব্লকিং চশমা পরে নেন। স্মার্টফোন বা টিভির নীল আলো যেন তাঁর মস্তিষ্কের মেলাটোনিন বা ঘুমের হরমোন উৎপাদনে কোনো বাধা দিতে না পারে, সে জন্যই এ ব্যবস্থা।

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ঘুমানোর সময় মুখে একধরনের সার্জিক্যাল টেপ লাগিয়ে নেন! উদ্দেশ্য—মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে শুধু নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস ধরে রাখা।
নাক দিয়ে শ্বাস নিলে শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা বাড়ে। গভীর ঘুমের জন্য এটা অত্যন্ত কার্যকর। পুরো ঘুমের সময় তাঁর হার্ট রেট এবং শরীরের তাপমাত্রা নিখুঁতভাবে মাপার জন্য হাতের আঙুলে থাকে বিশেষ অরা রিং।
আশরাফ হাকিমি এত এত ব্যায়াম করেন যে সেসবের নাম মনে রাখাও কঠিনসকালের শুরুটা হয় প্রকৃতির সঙ্গে
ম্যানচেস্টারের আকাশ বেশির ভাগ সময়ই মেঘলা থাকে। কিন্তু হলান্ডের দিন শুরু হয় প্রকৃতির ছোঁয়া নিয়ে। ঘুম থেকে উঠেই অন্তত ১০ মিনিটের জন্য বাইরে হাঁটতে বের হন, ভোরের মিষ্টি রোদ সরাসরি চোখে লাগান।

এটা তাঁর শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা প্রাকৃতিক ঘড়িকে সচল রাখে। যেদিন ম্যানচেস্টারের আকাশে সূর্যের দেখা মেলে না, সেদিন তিনি রেড লাইট প্যানেলের সামনে দাঁড়ান। এই লাল আলো তাঁর শরীরের কোষগুলোয় শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।
বরফ-জল ও ঘামের খেলা
মাঠে ৯০ মিনিট দৌড়ানোর পর শরীরের যে ক্ষতি হয়, তা দ্রুত সারিয়ে তোলাটাই একজন অ্যাথলেটের আসল পরীক্ষা। হলান্ড সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন বরফ-ঠান্ডা পানির বাথটাবে নামেন এবং সনায় যান।
সনা এমন এক ঘর, যেখানে খুব গরম ও শুষ্ক পরিবেশ তৈরি করা হয়। এটি সাধারণত কাঠের ঘর হয় এবং ভেতরের তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৭০–১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

হলান্ড এই সনায় কিছু সময় বসে ঘাম ঝরান। তারপর গোসল করেন ঠান্ডা পানি দিয়ে। এই পদ্ধতিতে তাঁর পেশির ক্লান্তি দূর করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে।
এর বাইরে প্রতিদিন নিয়ম করে ২০ মিনিট হিপ ফ্লেক্সর, গ্রোইন ও হ্যামস্ট্রিংয়ের স্ট্রেচিং বা ফ্লেক্সিবিলিটির জন্য কাজ করেন। এমনকি হালকা অনুশীলনের সময়ও কড়াভাবে খেয়াল রাখেন যেন শ্বাসপ্রশ্বাস শুধু নাক দিয়েই চলে।
যে ৫ ‘জাদুমন্ত্রে’ এখনো তরুণ ৫৬ বছরের জেনিফার লোপেজশৃঙ্খলার চূড়ান্ত রূপ
হলান্ডের এই রুটিন দেখলে মনে হবে, তিনি যেন কোনো এক প্রাচীন ভাইকিং যোদ্ধা, যিনি ভুল করে আধুনিক যুগে চলে এসেছেন! প্রক্রিয়াজাত খাবার বা কৃত্রিম আলোর এই আধুনিক দুনিয়ায় তিনি জীবনযাপন করছেন একেবারে আদিম ও প্রাকৃতিক নিয়মে।

ছোট ছোট এসব প্রাত্যহিক অভ্যাসের ধারাবাহিকতাই তাঁকে আজকের এই বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারে পরিণত করেছে। আপনি তাঁর সব অভ্যাসের সঙ্গে একমত না-ও হতে পারেন; কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে—নিজের শরীরকে যত্ন করার এই যে চরম শৃঙ্খলাবোধ, এটাই হলান্ডকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর অ্যাথলেটে পরিণত করেছে।
সূত্র: রয়টার্স
ফুটবল বিশ্বকাপে নরওয়ে দল কেন ১ টনের বেশি খাবার যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছে







