এবারই প্রথম নয়। দ্বিতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আবজল আহমেদ। বড় বড় তারকাকে দেখছেন কাছ থেকে। ব্রাজিল বনাম মরক্কোর ম্যাচেও ‘হসপিটালিটি ভলান্টিয়ার’ হিসেবে কাজ করেছেন সিলেটের গোলাপগঞ্জের এই তরুণ। ফাইনালসহ আরও বেশ কয়েকটি ম্যাচে থাকবেন মাঠে। তাঁর কাজ মূলত নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের ভিআইপি অতিথি, সাবেক খেলোয়াড় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আতিথেয়তা দেওয়া, সহযোগিতা করা। এ ছাড়া ম্যাচ চলাকালে টিম লিডার ও ম্যানেজারদের নির্দেশনা অনুযায়ী আরও নানা দায়িত্ব পালন করতে হয়।
কীভাবে এ সুযোগ মিলল? বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করেছিলাম হোয়াটসঅ্যাপে।

যেভাবে এল সুযোগ
বেশ কয়েক বছর ধরেই কাতারে থাকেন আবজল। দেশে প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্য ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমেও যুক্ত হতে শুরু করেন। আবজল বলেন, ‘ফিফার সঙ্গে প্রথম কাজের অভিজ্ঞতা হয় ২০২১ সালে, আরব কাপের মাধ্যমে। এরপর ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজের সুযোগ পাই। সেই সময় প্রায় ২০ হাজার ভলান্টিয়ারের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যুক্ত একটি দলের সদস্য ছিলাম। আমার দায়িত্ব ছিল আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, যোগ্য প্রার্থী বাছাই এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ব্যবস্থাপনা টিমের কাছে তালিকা পাঠানো।’
‘মেসির সঙ্গে ছবি? নাহ, তুলব না’এবারের বিশ্বকাপে স্বেচ্ছাসেবক নেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল গত বছর। ফিফার কাছ থেকে খবর পেয়ে আগস্ট মাসে আবেদন জমা দেন আবজল। জানুয়ারিতে আসে ‘ট্রাইআউটের’ আমন্ত্রণ। আবজল বলছিলেন, ‘অনেকেই এটাকে (ট্রাইআউট) ইন্টারভিউ বলতে পারেন। তবে বাস্তবে এটা ছিল একটা গ্রুপ ব্রিফিং সেশন, যেখানে ফিফার প্রতিনিধিরা আমাদের ২০২৬ বিশ্বকাপ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দেন। কতজন আবেদন করেছে, কতজন ভলান্টিয়ার নির্বাচিত হবে, কোন স্টেডিয়ামে কতজন থাকবে, ভলান্টিয়ারদের কী কী সুবিধা দেওয়া হবে, ইউনিফর্ম, খাবার, পরিবহনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’
এরপর কয়েক দফা ই–মেইল চালাচালির পর স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজের নিশ্চয়তা পান আবজল।

যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা
৫ জুন নিউইয়র্কে নেমে বিমানবন্দর থেকেই সোজা ফিফা ভলান্টিয়ার ওয়ার্কফোর্স সেন্টারে চলে গিয়েছিলেন আবজল আহমেদ। ইউনিফর্ম ও অ্যাক্রিডিটেশন সংগ্রহ করেছেন সেখান থেকে। এখন আছেন নিউ জার্সির পেটারসনে।
আবজল বলছিলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিজ উদ্যোগে করতে হয়। তবে ম্যাচের দিন খাবারসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ফিফাই দেয়।’
এবারের বিশ্বকাপে ২১১টির বেশি দেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার আবেদন জমা পড়েছিল। তবে ভিসা ও অন্যান্য জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা তুলনামূলক সীমিত রাখা হয়েছে। আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর স্থানীয়রাই বেশি সুযোগ পেয়েছেন। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ১০ লাখ আবেদনকারীর মধ্য থেকে প্রায় ৬৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক নির্বাচন করা হয়েছে। আবজল বলছিলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাওয়া অত্যন্ত গর্বের। ভলান্টিয়ারিং মানুষকে নতুন অভিজ্ঞতা দেয়, আত্মোন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে, বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং সবচেয়ে বড় কথা—নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে।’
সত্যিই ফুটবলপ্রেমীদের বড় একটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছেন আবজল। গত বিশ্বকাপে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার পরই প্রায় ৫০০-৬০০ মানুষের একটা দলের অংশ হয়ে গেছেন তিনি। অনলাইনে নিয়মিত তাঁদের যোগাযোগ হয়। ১০-১২ জন বেশ ভালো বন্ধুও হয়ে গেছে।

এবারের অভিজ্ঞতা
তারকা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে দেখার সুযোগ আবজল গত বিশ্বকাপেও পেয়েছেন। তবে এবার হয়েছে একটা ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আরও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে ভিআইপি বক্সের ‘প্রিমিয়াম সুইটে’ বসে খেলা দেখেছেন তিনি। বলছিলেন, ‘সেনেগাল বনাম ফ্রান্সের ম্যাচে আমাদের এই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। যেখানে বসে খেলা দেখেছি, ওসব আসনের টিকিটের দাম প্রায় ২৫-৩০ হাজার ডলার। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে হয়তো এটা কখনোই আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। পাঁচ তারকা মানের সুযোগ-সুবিধা থাকে ওখানে। এই অভিজ্ঞতা আগে হয়নি।’
এত বড় আসরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা অনুপ্রেরণাদায়ী তো বটেই। আরও একটা ব্যাপার আবজলকে বেশ অনুপ্রাণিত করেছে। শুনুন তাঁর বয়ানে, ‘আগেরবার দেখেছিলাম, যাঁরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন, বেশির ভাগই তরুণ। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে একটা অদ্ভুত বিষয় দেখলাম। এমন অনেকে আছেন, যাঁদের বয়স ৬০-৭০। অবসরজীবন যাপন করছেন। ৮০ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবকও আছেন। আপনি যখন তাঁদের সঙ্গে কথা বলবেন, দেখবেন খুব মন দিয়ে তাঁরা আপনার কথা শুনবে। আমি বাংলাদেশি শুনে এক বৃদ্ধা যেমন খুব আগ্রহ নিয়ে আমার সঙ্গে ছবি তুলেছেন।’
যাঁরা ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের স্বেচ্ছাসেবক হতে চান, তাঁদের জন্য আবজলের পরামর্শ, ‘আগে কিছু ইভেন্টে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে ভালো হয়। শুধু বিশ্বকাপ না, ফিফা আরও অনেক টুর্নামেন্টেই স্বেচ্ছাসেবক নেয়। আগের অভিজ্ঞতা থাকলে বিশ্বকাপে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়।’
বিয়ে-জন্মদিনে ১০০ জনের বেশি অতিথি হলেই গুনতে হবে জনপ্রতি ২৫ টাকা







